আঙুর: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ঘরোয়া উপাচার

আঙ্গুর হল প্রকৃতির একটি আশ্চর্য ফল। এই ফল খুব তাড়াতাড়ি ও খুব সহজেই শরীরকে সুস্থ সবল ও শক্তিশালী করে করে তোলার শক্তি রাখে। মিষ্টিও টক রসে ভরা ছোট্ট একটি আঙুরের মধ্যে লুকিয়ে আছে জল, প্রাকৃতিক শক্তি, খনিজ, ভিটামিন ও অসংখ্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভাণ্ডার। তাই স্বাদ এবং স্বাস্থ্যের  উপহার হিসেবে আঙুর প্রাচীনকাল থেকে মানুষের প্রিয় ফলগুলোর একটি। 

কালো ও বেগুনি আঙুরের খোসায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ সাধারণত সব থেকে বেশি এবং লাল আঙুরের খোসায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ মাঝারি। সাদা বা সবুজ আঙুরে তুলনায় একদমই কম। আঙুরের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তার খোসা ও বীজে কেন্দ্রীভূত থাকে। আঙুর প্রাচীনকাল থেকে খাদ্য, পানীয় এবং ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুকনো আঙুর অর্থাৎ কিশমিশে জলীয় অংশ কমে যাওয়ায় শক্তি (ক্যালরি) ও প্রাকৃতিক শর্করা অনেক বেশি ঘনীভূত হয়ে থাকে।

    আয়ুর্বেদে আঙুর দ্রাক্ষা নামেও পরিচিত। আয়ুর্বেদে বলা হয় “সঠিক পরিমাণে খাওয়া দ্রাক্ষা শরীরে পুষ্টি, স্নিগ্ধতা ও প্রশান্তি আনে”। তাই একে অনেক সময় “ফলের মধ্যে অমৃতসম” বলেও বর্ণনা করা হয়ে থাকে।

বিশেষ করে আঙুর এর খোসা এবং এর দানাতে বিভিন্ন মূল্যবান উপাদানের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। যা কোষকে মুক্ত মৌলের (Free Radical) ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক দেশে আঙুর পাতা রান্নায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে । আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় অনেক সময় আঙুর এর পাতা দিয়ে প্রস্তুত করা নির্যাস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আয়ুর্বেদে দ্রাক্ষার বিভিন্ন রূপ

আয়ুর্বেদে কেবল তাজা আঙুর নয় আঙুর এর আরও কয়েকটি রূপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে—

দ্রাক্ষা (তাজা আঙুর): শরীর শীতল রাখার জন্য।

শুষ্ক দ্রাক্ষা (কিশমিশ): দুর্বলতা ও কোষ্ঠকাঠিন্যে দূর করতে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত।

দ্রাক্ষাসব: এটি এক ধরনের প্রাচীন আয়ুর্বেদীয় প্রস্তুতি, যা নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এর ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন রোগে আঙুরের উপকারিতা 

শিশুদের দাঁত ওঠা 

এসব শিশুদের দাঁত ওঠার সময় খুব কষ্ট পায়। তাদের নিয়মিতভাবে আঙ্গুরের রস খাওয়ালে সহজেই দাগ উঠবে।

দাঁতের বেদনা 

 মাড়ি ফুলে গেলে, দাঁতের ব্যথা হলে, দাঁত নড়বড় হয়ে গেলে আঙুর চিবিয়ে খেলে খুব উপকার পাবেন। 

দেহের উজ্জ্বলতা কম হলে 

সারা বছরের মধ্যে যদি তিন মাস নিয়মিতভাবে আঙ্গুরের রস খাওয়া যায় তাহলে চেহারার উজ্জ্বলতা দেখা দেবে।

বৃক্ক শুল( Kidney Stone)

২০ গ্রাম আঙ্গুরের পাতা নিয়ে জল দিয়ে পিষে ঠান্ডা জল সহ গুলে মিশ্রণ তৈরি করে নিয়ে কাপড়ে ছেঁকে রোগীকে খাওয়ালে রোগ উপশম হয়। 

স্ত্রীরোগ 

প্রায়ই স্ত্রী লোকদের শ্বেতপ্রদর হয়ে থাকে। ফলে হজমের সমস্যা দেখা দেয়, দেহটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মাথার যন্ত্রণা হয়, পেট ফুলে যায়, ঠিক নিয়মিত কষ্ট পরিষ্কার হয় না 

        এই অবস্থায় প্রত্যেকদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিতভাবে এক চামচ আঙ্গুরের রস খেলে রোগ উপশম হয়। 

         গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে আঙ্গুরের রস অত্যন্ত উপকারী যদি কোন গর্ভবতী নারী নিয়মিতভাবে আঙুর খায়। তাহলে মূর্ছা, মাথা ঘোরা, দাঁতের ব্যথা, মাথার যন্ত্রণা প্রভৃতি উৎসর্গ দূর হবে এবং সেই সঙ্গে তার গর্ভস্থ সন্তানও ঠিকমতো বেড়ে উঠবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য

রাতের বেলা কিছু কিশমিশ জলের মধ্যে ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই জল ও কিশমিশ সহ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। এটি প্রচলন রয়েছে।

গলা শুকিয়ে যাওয়া ও কণ্ঠের কর্কশতা

যাদের গলা শুকিয়ে যায় ও কন্ঠের কর্কশতা দেখা দিলে তাদেরকে দ্রাক্ষার রস বা ভেজানো কিশমিশ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও শরীরের জ্বালা

অতিরিক্ত তৃষ্ণা পেলে কিংবা শরীর জ্বালা করলে দ্রাক্ষা শীতল প্রকৃতির হওয়ায় দ্রাক্ষার শরবত খেলে খুব ভালো উপকার দেয়।

দুর্বলতা ও অবসাদ

আঙুরের রস ও দুধের সংমিশ্রণ কিছু আয়ুর্বেদীয় পদ্ধতিতে শক্তিবর্ধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

অম্লতা বা হালকা পেটের জ্বালা

অম্লতা বা হালকা পেটের জ্বালার ক্ষেত্রে মিষ্টি আঙুর পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে তা অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়।

শুকনো কাশি

কিশমিশ সেদ্ধ জল বা আঙ্গুরের রস কে উষ্ণ গরম করে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়।

হৃদরোগে

আঙ্গুরের মধ্যে থাকা পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। হলে হৃদপিণ্ডের দুর্বলতা দূর হয়।

হজমে সহায়ক

রাতে ১৫–২০টি কিশমিশ জলে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে কিশমিশ ও সেই জল খান। এছাড়া তাজা আঙুর খোসা ও দানা শুদ্ধ খেলে এর মধ্যে থাকা ফাইবার ও প্রাকৃতিক জলীয় খাদ্য হজমের জন্য খুব উপকারী।

ত্বকের জন্য

আঙ্গুরের মধ্যে ভিটামিন C ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রচুর মাথায় থাকায়  ত্বকের স্বাভাবিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

চোখের জন্য

 আঙ্গুরের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান চোখের কোষকে অক্সিডেটিভ চাপ থেকে রক্ষা করতে  ভূমিকা রাখতে পারে।

আঙুরের ফেস প্যাক

আঙুরের রস, মধু ও সামান্য দই মিশিয়ে সেই মিশ্রণ ত্বকে ব্যবহার খুব উপকার দেয়।

Leave a Comment