আমড়া: একটি পুষ্টিগুণে ভরা ফল, কেন উপকারী?

আমড়া: একটি পুষ্টিগুণে ভরা ফল 

আমড়া এমন একটি ফল যা ভারতবর্ষ সহ দক্ষিণ এশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমরা একে আমড়া নামে চিনি তবে এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে, এর বৈজ্ঞানিক নাম (Spondias pinnata)। এর মধ্যে একটি বড় আঁটি থাকে। এর টক, কষযুক্ত এবং হালকা মিষ্টি স্বাদ জিভে জল আনিয়ে দেয়। এই ফলটি কাঁচা খাওয়া যায়। আবার, পাকা আমড়ার সুগন্ধ ক্ষুধা বাড়িয়ে তোলে। আমড়ার আচার, চাটনি, ভর্তা, ডাল, মোরব্বা কিংবা সরাসরি লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া—সেই পুরনো দিন থেকে খুবই জনপ্রিয়। 

        আমড়া আহারে রুচি বাড়িয়ে তোলে। আমড়ার আচার ভালো রাখতে মাঝে মাঝে তাকে রোদে দিতে হয়। আমড়া গাছ ১৫–২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। এর ফল, পাতা, ছাল ও শিকড়—সবকিছুই লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে এটি বর্ষাকালে প্রচুর পরিমাণে ফলে একটি জনপ্রিয় ফল।

আমরা সাধারণত দুই ধরনের আমড়া দেখতে পাই দেশি এবং বিলাতি আমড়া। 

দেশি আমড়া

দেশি আমড়া সাধারণত বিলাতি আমড়া থেকে ছোট আকারের হয়ে থাকে। দেশি আমড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটু টক হয়ে থাকে তবে পাকার পরে তা টক ও হালকা মিষ্টি স্বাদের হয়ে থাকে। ফলে এটি পেকে গেলে অনেকের কাছে বিলাতি আমড়ার থেকেও খুবই সুস্বাদু হয়ে থাকে। এটি দিয়ে আচার, চাটনি বা তরকারি রান্না করে বেশি খাওয়া হয়।

বিলাতি আমড়া

বিলাতি আমড়া দেশি আমড়ার থেকে আকারে বড় হয়ে থাকে। এতে মিষ্টি স্বাদের তুলনায় টক স্বাদের ভাগ খুবই কম বলে এটি কাঁচা অবস্থাতে খেতে খুব ভালো লাগে। তাই এটি কাঁচা অবস্থাতেই বেশি খাওয়া হয়। এর থেকে সুস্বাদু আচার ও জেলি তৈরি করা যায়।

উভয় আমড়া তে ভিটামিন সি, ফাইবার, ক্যালসিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রভৃতি পুষ্টিকর উপাদান প্রচুর মাত্রায় থাকে। তবে দেশি আমড়ায় অম্লতা বা টক ভাব বেশি থাকার কারণে এটি মুখে রুচি ফেরাতে এবং কফ দূর করতে বেশি সাহায্য করে থাকে।

পুষ্টিবিদদের মতামত অনুযায়ী, একটি আমড়ার মধ্যে প্রায় তিনটি আপেলের সমপরিমাণ পুষ্টি থাকে। একটি গোটা আমরা দৈনিক ভিটামিন সি এর চাহিদার ১০০% পূরণ করতে পারে। বিশেষ করে আপেলের চেয়ে আমড়াতে যে সমস্ত পুষ্টিকর উপাদান এর পরিমাণ অনেক বেশি এগুলি হল প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং আয়রন  ইত্যাদি 

আমড়ার পুষ্টিগুণ

১০০ গ্রাম আমড়া থেকে প্রায় ৬৬ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি বা এনার্জি পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য আমড়ায় আনুমানিক যে পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়,  ক্রমানুসারে নিচে দেওয়া হলো।

উপাদান পরিমাণ

  • জল : প্রায় ৮০–৮৬ গ্রাম
  • শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট : প্রায় ১৫ গ্রাম
  • খাদ্যআঁশ : প্রায় ২–৫ গ্রাম
  • প্রোটিন বা আমিষ : প্রায় ০.৫–১.১ গ্রাম
  • চর্বি বা ফ্যাট : প্রায় ০.১–০.৫ গ্রাম
  • অন্যান্য খনিজ পদার্থ : প্রায় ০.৫–১ গ্রাম

খনিজ পদার্থ

  • ক্যালসিয়াম : প্রায় ৫৫ মিলিগ্রাম (০.০৫৫ গ্রাম)
  • আয়রন বা লৌহ : প্রায় ৩.৯ মিলিগ্রাম (০.০০৩৯ গ্রাম)

এছাড়াও আমড়ার মধ্যে পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, কপার খনিজ পদার্থ থাকে

ভিটামিনসমূহ 

  • ভিটামিন C : ৯২ মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় ৩৯% – ৪৯%)
  • ভিটামিন B-1 (থায়ামিন): ০.২৮ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন A (ক্যারোটিন) : ৮০০ মাইক্রোগ্রাম বা ০.৮ মিলিগ্রাম
  • ভিটামিন B-2 ( রিবোফ্লাভিন ) : ০.০৪ মিলিগ্রাম

এছাড়াও ভিটামিন B-3 (নিয়াসিন), ভিটামিন B9 (ফলেট) অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়।

আমড়া খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা

খালি পেটে আমরা খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত লবণ ও মরিচ গুঁড়ো আমড়া তে মিশানো উচিত নয়। আমড়া খাওয়ার পরে ব্রাশ করা উচিত নয়।

অতিরিক্ত আমড়া খেলে গ্যাস, অম্বল, হতে পারে এবং দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে পারে। 

যে সমস্ত রোগীদের সতর্ক থাকা উচিত 

অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির রোগী, পাকস্থলীর আলসার রোগী, এবং যে সমস্ত ব্যক্তিদের দাঁত সংবেদনশীল তাদেরকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবে আমরা খাওয়া উচিত।

উপসংহার

টক, কষায় এবং মৃদু মিষ্টি স্বাদের সমষ্টি হল আমড়া। এটি শুধু মুখরোচক ফল নয়, এটি ভিটামিন C তে ভরপুর। এছাড়াও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজে সমৃদ্ধ পরিমাণে থাকায় এটি একটি পুষ্টির ভাণ্ডার। আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় ক্ষুধামন্দা, বদহজম, শরীরের অতিরিক্ত তাপ, সর্দি-কাশি, দুর্বলতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘদিন ধরে আমড়ার ব্যবহার হয়ে আসছে। পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত আমড়া খাওয়া শরীরের জন্য খুবই উপকারী।

Leave a Comment