কুল এর পুষ্টিগুণ, কেন এটি অত্যন্ত ভালো?
শীতের কুয়াশা ভেজা সকালে, কুল গাছের পাশে থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় লোভ সামলানো মুশকিল। অনেক সময় দেখা যায় গাছের গোড়ায় ছোট থেকে বড় সবাইকে। গাছকে ধরে একটু নাড়া দিলেই গাছ থেকে টপটপ করে পড়তে থাকে শীতের কুয়াশায় ভেজা পাকা টকমিষ্টি কুল। চারিদিক একটা টক ঝাঁক যুক্ত অপূর্ব সুগন্ধে ভরে যায়। কিংবা হাটের এক কোণে বাঁশের ঝুড়িতে সাজিয়ে রাখা সবুজ, হলুদ, লালচে সুগন্ধে ভরা কুল দেখলেই জিভে জল এসে যায়। এটি কাঁচা অবস্থায় সবুজ টক ঝাঁঝ যুক্ত হয়, এবং পেকে যাওয়ার পরে হলুদ, লালবর্ণ ও টক-মিষ্টি মেশানো কোমল মোলায়েম শাঁসযুক্ত হয়ে থাকে। একটি কামড় মারলেই এর অপূর্ব সুস্বাদু স্বাদ যেন মনে হয় এক ফলের মধ্যে তিন ঋতুর আনন্দ সমাহিত।
গ্রামের ঘরের উঠোনে, পথের ধারে, কিংবা মাঠে চাষের জমির ধারে কাঁটায় ভরা গাছে ঝুলে থাকা কুল কে শুধু ফল বলবো না, এটি হল আমাদের শৈশবের এক আবেগ। এর আচার-চাটনির অমলিন স্মৃতিকে ভোলা যায় না। আর আয়ুর্বেদের ভাষায় এটি হলো এক শক্তিশালী ঔষধি ফল।
আমরা একে ফুল নামে চিনি তবে এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। কুলের বৈজ্ঞানিক নাম হল Ziziphus mauritiana। এটি Rhamnaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
কুলের উৎপত্তি ও পরিচয়
কুলের জন্ম দক্ষিণ এশিয়ায় হয়ে থাকলেও বর্তমানে এটি ভারত, বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান, আফ্রিকা সহ মধ্যপ্রাচ্যে এর চাষ ব্যাপকভাবে হয়ে থাকে।
কুলের বৈশিষ্ট্য:
এই গাছ কাঁটাযুক্ত হয়। উচ্চতায় ৫–১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই গাছ খরা সহনশীল, প্রচন্ড খরাতেও এই গাছ ফলন দিয়ে থাকে। কোনরকম যত্ন ছাড়াও এই গাছ খুবই দীর্ঘজীবী হয়।
কুলের স্বাদ
কুলের স্বাদ নির্ভর করে এর প্রজাতির উপর, মাটির গুণের উপর, আবহাওয়ার উপর এবং কুল পাকার উপরে।
কুলের প্রজাতি
আপেল কুল
এই প্রজাতির কুল সবচেয়ে জনপ্রিয়। এটি আকারে বড়, গোলাকার, মচমচে হয়ে থাকে। এর স্বাদ মিষ্টি ও হালকা টক হয়ে থাকে।
নারকেলি কুল
এই প্রজাতির কুল নারকেলের মতো শক্ত শাঁস যুক্ত হয়ে থাকে। এটি খুব মিষ্টি। এটিকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।
বাউ কুল
এই প্রজাতির কুল ছোট আকারের হয়ে থাকে। এটি তীব্র গন্ধযুক্ত এবং অতুলনীয় স্বাদের হয়ে থাকে।
বন কুল
এই প্রজাতির কুল প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। আকারে ছোট হলেও এটি ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ হয়ে থাকে।
থাই কুল
এই প্রজাতির কুল বড় আকৃতির হয়। এটি অত্যন্ত রসালো। বাজারে এই কুল এর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে থাকে।
কাশ্মীরি কুল
স্কুলের এই প্রজাতি টি ঠান্ডা অঞ্চলের প্রজাতি। এটি খুবই সুস্বাদু
বোম্বাই কুল
এই প্রজাতির কুল বড় এবং শক্ত হয়ে থাকে। এটি বাণিজ্যিকভাবে খুবই জনপ্রিয়।
গোলা কুল
এই প্রজাতি টি গোল প্রকৃতির হয়ে থাকে। এটি রসে ভরপুর হয়।
দেশি কুল
দেশি কুল ছোট হলেও অন্যান্য স্কুলের তুলনায় স্বাদের রাজা। তাই এই কুল অত্যন্ত জনপ্রিয়।
কুল এর পুষ্টিগুণ
USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা কূলে প্রায় 79 ক্যালোরি থাকে। নিম্নে প্রতি ১০০ গ্রাম কুল এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হল।
উপাদান পরিমাণ
- জল : প্রায় 77.86 গ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 20.23 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7%)
- খাদ্য আঁশ : প্রায় 1.2-2.6 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5%)
- প্রোটিন : প্রায় 1.2 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.5%)
- ফ্যাট : প্রায় 0.2 গ্রাম (একদম সামান্য)
ভিটামিন পরিমাণ
- ভিটামিন C : প্রায় 69 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 77%)
- ভিটামিন B3 (নিয়াসিন) : প্রায় 0.9 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5.6%)
- ভিটামিন B6 : প্রায় 0.08 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.8%)
- ভিটামিন B2 : প্রায় 0.04-0.06 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.6%)
- ভিটামিন B1 : প্রায় 0.02 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.7%)
- ভিটামিন A : খুবই অল্প পরিমাণ
খনিজ পরিমাণ
- পটাশিয়াম : প্রায় 250 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5.3%)
- ফসফরাস : প্রায় 23 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
- ক্যালসিয়াম : প্রায় 21 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
- ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 10 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.4%)
- সোডিয়াম : প্রায় 3 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.1%)
- আয়রন : প্রায় 0.48 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.7%)
- জিঙ্ক : প্রায় 0.05 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.5%)
- কপার : প্রায় 0.09- 0.07 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 10.2%)
- ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.08 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 3.7%)
কুলের মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ফাইটোকেমিক্যাল যা কুলকে বিশেষ করে তোলে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো
ট্রাইটারপেনিক অ্যাসিড
এটি কুলের মধ্যে থাকা অন্যতম প্রধান শক্তিশালী উপাদান। বেটুলিনিক অ্যাসিড ও ওলেনোলিক অ্যাসিড যা বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কাজ করে। কুলের এই যৌগগুলো শরীরে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিতে বাধা দিতে দারুণ কার্যকর। এটি প্রাকৃতিকভাবে শরীরের প্রদাহ দূর করতে এবং লিভার বা যকৃৎ সুরক্ষিত রাখতে দারুণ কাজ করে।
স্যাপোনিন
স্কুলের মধ্যে স্যাপোনিন থাকে যা রাতে ভালো ঘুমের জন্য বা দুশ্চিন্তা কমাতে দারুন ভাবে কাজ করে। কুলের বীজে এবং মাংসে প্রচুর জুজুবোসাইড থাকে যা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে রাখে।
ফ্ল্যাভোনয়েডস
কুলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েডস থাকে যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।সোয়ার্টিশিন, রুটিন এবং ক্যারেটিন এই সমস্ত উপাদানগুলো শরীরে ফ্রি র্যাডিক্যালের মত ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। এটি রক্তনালীকে শিথিল করতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
পলিস্যাকারাইড
কুলের মধ্যে থাকা পলিস্যাকারাইড বা জটিল শর্করা শরীরের একদম ভেতর থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে। এটি শরীরের শ্বেত রক্তকণিকাকে উদ্দীপিত করতে সাহায্য করে, যার ফলে আমাদের শরীর যেকোনো ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণকে খুব সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে।
ফেনোলিক অ্যাসিড
কুলের মধ্যে থাকা ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড এবং ক্যাফেইক অ্যাসিড বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করে। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খুবই সহায়ক। এছাড়া এটি লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে দেয় না।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে কুল শুধু ফল নয়— এটি শীতের পরিচিত গন্ধ, গ্রামের মাটি, শৈশবের হাসি আর পুষ্টিকর সুস্বাদু স্বাদের প্রকৃতির এক আশীর্বাদ। কাঁচা কিংবা পাকা যে কোন অবস্থায় এটি খেলে যেমন জিভে জল আসে, তেমনি শরীরকে দিয়ে থাকে ভিটামিন, খনিজ, শক্তি আর সুস্থতার অমূল্য উপহার।
এই ছোট্ট কুলের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সুস্বাস্থ্যের রহস্য তাই এটিকে অবহেলা করা একদমই উচিত নয়। তাই আমাদের খাদ্য তালিকায় কুলকে রাখা খুবই বুদ্ধিমানের হবে।