কুল: কুলের দ্বারা আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসা

আয়ুর্বেদে কুল ‘বন্দরী’ বা ‘বদর’  নামে পরিচিত, যা সেই পুরনো কাল থেকেই রোগ প্রতিরোধ এবং শরীর সুস্থ সবল রাখার একটি মহৌষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মহর্ষি চরক এবং সুশ্রুত তাঁদের সংহিতায় কুলের ফল, পাতা, বীজ এবং ছালের বহুমুখী ঔষধি গুণের বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

পাকা কুল মিষ্টি ও অম্ল রসযুক্ত। কাঁচা কুল কিছুটা কষাটে ও অম্ল রসযুক্ত হয়। এর প্রকৃতি ঠান্ডা, হজমে ভারী এবং স্নিগ্ধ হয়ে থাকে।

ত্রিদোষের উপর কুলের প্রভাব 

বাত ও পিত্ত নাশক: 

পাকা কুল এর মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদান শরীরে অতিরিক্ত ‘বাত’ এবং ‘পিত্ত’ দোষকে শান্ত করতে সাহায্য করে। এটি শরীরকে ঠান্ডা রাখে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কমাতে সাহায্য করে। 

কফ বর্ধক: 

অতিরিক্ত কাঁচা বা টক কুল খাওয়া উচিত নয়। এতে শরীরে ‘কফ’ বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই যাদের সহজে ঠান্ডা লাগে কিংবা যাদের কফজনিত রোগ আছে তাদেরকে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

কুল দ্বারা বিভিন্ন রোগ প্রতিকার ও ঘরোয়া চিকিৎসা 

অনিদ্রা ও মানসিক উৎকণ্ঠা 

কুলের বীজ বা মজ্জা স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করতে সাহায্য করে। কুলের বীজ ভেঙে তার ভেতরের মজ্জা গুঁড়ো করে নিতে হবে। ১-২ গ্রাম মজ্জা গুঁড়ো ঈষদ উষ্ণ গরম দুধ কিংবা হালকা গরম জলের সঙ্গে মিশিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে সেবন করলে অনিদ্রা দূর হয় এবং গভীর ঘুম আসে।

লিভারের সুরক্ষা ও রক্ত পরিশোধন 

 আয়ুর্বেদ মতে কুল শরীরের ‘টক্সিন’ (আম) দূর করে রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। নিয়মিত পাকা বা শুকনো কুল খেলে রক্ত পরিষ্কার হয়, জন্ডিস রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে এছাড়া লিভারের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

রক্তপিত্ত বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ 

  পিত্ত দোষের কারণে অনেক সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়ে বা নারীদের মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে কুল দারুণ ভাবে কাজ করে। পাকা কুলের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে তা শরীর ঠাণ্ডা করে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়।

জ্বর ও দাহ 

 কুলের পাতায় প্রাকৃতিকভাবে জ্বর কমানোর উপাদান রয়েছে। কুলের কচি পাতা পিষে তার রস বের করে নিতে হবে। ১০ মিলি পরিমাণে রস এর সঙ্গে অল্প মিছরি মিশিয়ে সেবন করলে শরীরের ভেতরের জ্বালাপোড়া ও তীব্র তৃষ্ণা দূর হয়ে থাকে। আবার এই পাতা বেটে কপালে প্রলেপ দিলে তা জ্বরের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।

হজম ও অরুচি 

 কুলের মধ্যে থাকা উপাদান মুখের স্বাদ ফেরাতে এবং পরিপাক ক্ষমতা সচল করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শুকনো কুল, গোলমরিচ, বিট লবণ এবং সামান্য জিরে একসাথে খেলে বা চাটনি বানিয়ে খেলে মুখের অরুচি দূর হয় এবং আমাশয় ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে আসে।

স্থূলতা বা ওজন কমানো  

কুলের বীজ গুঁড়ো করে হালকা গরম জলে মিশিয়ে খেলে এর মধ্যে থাকা উপাদান মেদ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এক গ্লাস জলে কুলের পাতা সারারাত  ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে সেই জল খেলে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে।

ক্ষত নিরাময় ও ত্বকের রোগ 

 কুলের ছাল ও পাতায় উচ্চ মাত্রায় কষায় রস থাকায় এটি দ্রুত চামড়া ও ক্ষত শুকাতে সাহায্য করে।চিকিৎসা: পুরোনো ক্ষত বা চর্মরোগে কুলের পাতা এবং ছাল খুবই উপকারী। কুলের পাতার পেস্ট তৈরি করে কিংবা কুলের ছালের ক্বাথ দ্বারা পুরোনো ক্ষতস্থান, চর্ম রোগের স্থান ধুয়ে দিলে দ্রুত নিরাময় হয়।

আয়ুর্বেদিক সতর্কতা 

  কাঁচা বা অত্যন্ত টক কুল অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয় এতে হজমের সমস্যা হয় এবং এটি কফ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর বীর্য অত্যন্ত শীতল হওয়ার তীব্র ঠাণ্ডা বা সর্দি-কাশি দেখা দিলে কুল খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো। শুকনো কুলে শর্করার পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে, তাই ডায়াবেটিস রোগীদের অতিরিক্ত কুল খাওয়া উচিত নয়। খেতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া উচিত।

Leave a Comment