টুকটুকে লাল কিংবা গাঢ় মেরুন, চকচকে আর রসাল চেরি ফল মুখে দেওয়া মাত্রই যেন স্বাদের এক স্বর্গীয় অনুভূতি ঘটে! হালকা কামড় দেওয়ার সাথেই পাতলা চামড়াটা ফেটে গিয়ে মুখের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মিষ্টি-টক মিশ্রিত স্বাদের অমৃত রস।এই ফল মাংসল আর তুলতুলে হয়ে থাকে। এই ফলের প্রতিটি কণা মনকে নিমেষেই চাঙ্গা করে তোলে। পায়েস, আইসক্রিম বা কেকের ওপর এই ফল এর ব্যবহার করা হয়। এর জুস বা জ্যামঅনেকেই খুব পছন্দ করে থাকেন। এই রাজকীয় ফলটি শুধু মাত্র দেখতেই সুন্দর নয়, এর গন্ধ এবং সুস্বাদু স্বাদ এতটাই লোভনীয় যে একবার খেলে বারবার খাওয়ার ইচ্ছে জাগে।
চেরি ফলের পরিচয়
চেরি ফল রোজাসি পরিবারের অন্তর্গত একটি ফল। এবং এটি বরই বা কুলের একটি দূরসম্পর্কীয় প্রজাতির ফল যার কারণে এর ভেতরের গঠন ও শক্ত আঁটি অনেকটা আমাদের চেনা কুলের মতোই। এটি সাধারণত ঠান্ডা অঞ্চলে বেশি জন্মায়। তুরস্ক, আমেরিকা, ইরান ও ইতালি বিশ্বের মধ্যে চেরি উৎপাদনে এগিয়ে।
চেরির প্রধান দুই ধরন:
Sweet Cherry – এটি মিষ্টি চেরি। তাই এটি সরাসরি খাওয়ার জন্য খুবই জনপ্রিয়
Sour/Tart Cherry – এটি টক চেরি। এটি জুস, জ্যাম ও ঔষধি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।
চেরির জনপ্রিয় প্রজাতি
- Bing Cherry – এটি গাঢ় লাল, এর রস খুব মিষ্টি হয়ে থাকে।
- Rainier Cherry – এটি হলুদ-লাল মিশ্রিত রঙের, এটি অত্যন্ত রসালো হয়।
- Lambert Cherry – এটি বড় আকারের হয়।
- Chelan Cherry – এটি দ্রুত পেকে যায়।
- Montmorency Cherry – এটি অত্যন্ত টক হয় তাই একে চেরির রাজা বলা হয়।
- Black Tartarian – এটি কালচে লাল মিশ্রিত রঙের এবং সুগন্ধি হয়।
- Stella Cherry – এটি অত্যন্ত ফলনশীল
চেরি ফল এর পুষ্টিগুণ
USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি 100 গ্রাম টাটকা চেরি ফলে প্রায় 63 ক্যালোরি থাকে। নিম্নে প্রতি 100 গ্রাম চেরি ফল এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হল।
প্রধান উপাদান
- জল : প্রায় 83 গ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 16 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5.8%)
- খাদ্য আঁশ : প্রায় 2.1 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7.5%)
- প্রোটিন : প্রায় 1.1-1.06 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.1%)
- চর্বি বা ফ্যাট : প্রায় 0.2 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.3%)
খনিজ উপাদান
- পটাশিয়াম : প্রায় 222 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.7%)
- ফসফরাস : প্রায় 21 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.7%)
- ক্যালসিয়াম : প্রায় 13 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.0%)
- ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 11 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.6%)
- লোহা বা আয়রন : প্রায় 0.36 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.0%)
- দস্তা বা জিংক : প্রায় 0.07-0.10 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.9%)
- তামা বা কপার : প্রায় 0.06 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 6.7%)
- ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.07 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.2%)
ভিটামিনসমূহ
- ভিটামিন C : প্রায় 7 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7.8%)
- ভিটামিন B3 : প্রায় 0.154 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.0%)
- ভিটামিন B5 : প্রায় 0.43 – 0.199 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.9%)
- ভিটামিন B6 : প্রায় 0.049 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.9%)
- ভিটামিন B2 : প্রায় 0.033 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.5%)
- ভিটামিন B1 : প্রায় 0.027 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.3%)
- ফোলেট বা ভিটামিন B9 : 4 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.0%)
- ভিটামিন A : 3 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.3%)
- ভিটামিন K : 2.1 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.8%)
চেরির ভেতরে থাকা বিশেষ জৈব উপাদান
চেরি ফলের জাদু শুধু খনিজ ও ভিটামিনে নয় এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু উদ্ভিদজাত উপাদান বা বায়োঅ্যাক্টিভ কম্পাউন্ডের।
চেরি ফলের মধ্যে থাকা প্রধান বিশেষ জৈব উপাদানগুলো নিচে দেওয়া হলো:
অ্যান্থোসায়ানিন
অ্যান্থোসায়ানিন চেরির মধ্যে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যা চেরির গাঢ় লাল টকটকে রঙের জন্য দায়ী। এটি খুবই শক্তিশালী একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা শরীরের ক্ষতিকর ‘ফ্রি র্যাডিক্যালস’ এর হাত থেকে কোষকে রক্ষা করে। এবং এটি প্রদাহ দূর করে থাকে। শরীরের যেকোনো ব্যথা ও ফোলা ভাব কমাতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
মেলাটোনিন
চেরির মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবে সরাসরি ‘মেলাটোনিন’ হরমোন পাওয়া যায়। মেলাটোনিন চেরির মধ্যে থাকা একটি বিশেষ জৈব উপাদান। যা আমাদের ঘুমের চক্র বা বায়োলজিক্যাল ক্লক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। চেরি খেলে রক্তের মধ্যে মেলাটোনিন হরমোন এর মাত্রা বাড়ে, যা প্রাকৃতিকভাবে অনিদ্রা দূর করতে সাহায্য করে।
কোয়ারসেটিন
চেরিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ফ্ল্যাভোনয়েড উপাদান থাকে। যা রক্তনালীকে শিথিল ও নমনীয় রেখে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক করে এবং উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এটি ফুসফুস ও হার্টের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী।
হাইড্রোক্সিসিনামিক অ্যাসিড
চেরিতে থাকা পলিফেনলের একটি বড় অংশ হল হাইড্রোক্সিসিনামিক অ্যাসিড। এই বিশেষ অ্যাসিডের বিভিন্ন ডেরিভেটিভস, যেমন—নিওক্লোরোজেনিক অ্যাসিড এবং ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড। যেগুলি মূলত লিভার বা যকৃতের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এবং শরীরের ডিএনএ (DNA) ড্যামেজ প্রতিরোধ করে।
সায়ানিডিন
সায়ানিডিন হল চেরির মধ্যে থাকা অ্যান্থোসায়ানিনের মূল ভিত্তি। গবেষণায় দেখা গেছে এটি ক্যানসার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দিতে সাহায্য করে। এটি মূত্রনালীকে উদ্দীপিত করে ইউরিক অ্যাসিড’ শরীর থেকে বের করে দেয় এতে গেঁটে বাতের তীব্র যন্ত্রণা দূর হয়।