আনারস: রস, সুবাস ও পুষ্টির ভাণ্ডার। আনারস ফলটি আমাদের সকলের কাছেই খুবই পরিচিত এবং খুব প্রিয়। কিছুটা অতীতে গিয়ে দেখলেই মনে পড়ে সেই সময় যখন আমরা আনারস খাচ্ছিলাম । গ্রীষ্মের দুপুরে একটি পাকা আনারস কেটে তার সোনালি-হলুদ রসালো মিষ্টি ও হালকা টক স্বাদের অপূর্ব মেলবন্ধনে ভরা শাঁস মুখে দিতেই মনমাতানো সুগন্ধ আর রসের ঝর্ণাধারা। মনে পড়লেই মুহূর্তেই জিভে জল এনে দেয়। আনারস শুধু যে একটা সুস্বাদু ফল তা নয়, এটি প্রকৃতির দেওয়া এক অসাধারণ পুষ্টি-ভাণ্ডার, যা আমাদের শরীরকে সতেজ রাখার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের উপকার প্রদান করে ।
আনারসের পরিচয়
আমরা সকলে আনারসকে আনারস নামে চিনলেও এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। আনারসের বৈজ্ঞানিক নাম হল Ananas comosus। এটি উষ্ণ ও আদ্রতা যুক্ত আবহাওয়া অঞ্চলে ভালো জন্মায়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ও আনারস চাষ বিপুল পরিমাণে হয়ে থাকে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কেরালায় আনারসের চাষ খুব ভালো হয়।
(USDA) এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা আনারসে সব থেকে বেশি পরিমাণে জল থাকে (প্রায় ৮৬%) এবং এর থেকে প্রায় ৫০ কিলো ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম আনারসে যে সমস্ত মূল পুষ্টি উপাদান, খনিজ এবং ভিটামিনগুলি থাকে পরিমাণগত ভাবে ক্রমানুসারে নিচে দেওয়া হলো :
মূল পুষ্টি উপাদান ( Macronutrients ) — গ্রাম ( g ) এককে
ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট বা প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে জলীয় অংশের পর কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ সবথেকে বেশি।
- জল ( Water ) : প্রায় 86.00 গ্রাম ( আনারসের সিংহভাগই হলো জল )।
- কার্বোহাইড্রেট ( Carbohydrates ) : প্রায় 13.1 গ্রাম ( এর মধ্যে প্রায় 9.8 গ্রামই প্রাকৃতিক চিনি বা সুগার যেমন— ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ ও গ্লুকোজ )।
- খাদ্য আঁশ ( Dietary Fiber ) : 1.40 গ্রাম ( হজমশক্তি বাড়াতে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে )।
- প্রোটিন ( Protein ) : 0.54 গ্রাম ( খুবই সামান্য পরিমাণে থাকে )।
- চর্বি বা ফ্যাট ( Total Fat ) : 0.12 গ্রাম ( ফ্যাটের পরিমাণ প্রায় নেই বললেই চলে।, তাই ওজন বাড়ে না)।
খনিজ উপাদান ( Minerals ) — মিলি গ্রাম (mg) এককে
আনারসে ভরপুর মাত্রায় খনিজ উপাদান রয়েছে। তার মধ্যে পটাশিয়ামের মাত্রা সবচেয়ে বেশি, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে থাকে।
- পটাশিয়াম ( Potassium ) : প্রায় 109 – 115 মিলি গ্রাম (হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে)।
- ক্যালসিয়াম ( Calcium ) : প্রায় 13 -18 মিলি গ্রাম (যা হাড় ও দাঁতকে মজবুত করে তোলে )।
- ম্যাগনেসিয়াম ( Magnesium ) : প্রায় 12 গ্রাম (মাংসপেশি ও স্নায়ু কে সচল রাখে )।
- ফসফরাস ( Phosphorus ) : প্রায় 8 মিলি গ্রাম (কোষের শক্তি উৎপাদন করতে সাহায্য করে )।
- ম্যাঙ্গানিজ (Manganese ) : 0.927 মিলি গ্রাম (মানুষের দৈনিক প্রয়োজনীয় ম্যাঙ্গানিজের প্রায় 44% পর্যন্ত পূরণ করে ও হাড়ের গঠনে এটি অত্যন্ত জরুরি )।
- আয়রন বা লৌহ ( Iron ): প্রায় 0.28 মিলি গ্রাম (রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া এর মত রোগ দূর করতে সাহায্য করে )।
- জিংক ( Zinc ) : প্রায় 0.10 মিলি গ্রাম ( রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে )।
- কপার বা তামা (Copper) : প্রায় 0.18 মিলি গ্রাম ( যা দৈনিক চাহিদার প্রায় 20% )।
- সোডিয়াম ( Sodium ) : প্রায় 1 মিলি গ্রাম ( এর পরিমাণ অত্যন্ত কম)।
ভিটামিন সমূহ ( Vitamins ) — মিলি গ্রাম ( mg ) ও মাইক্রো গ্রাম ( µg ) এককে
আনারসের মধ্যে যে সমস্ত ভিটামিন রয়েছে তার মধ্যে ভিটামিন সি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে, যা মানুষের দৈনিক চাহিদার অর্ধেকের ও বেশি।
- ভিটামিন C ( Vitamin C ): প্রায় 47.8 মিলি গ্রাম (এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ত্বক ভালো রাখে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে )।
- ভিটামিন B-3 / নিয়াসিন (Niacin): প্রায় 0.489 মিলি গ্রাম (হজম প্রক্রিয়াতে সাহায্য করে)।
- ভিটামিন B-5 / প্যান্টোথেনিক ( pantothenic ) অ্যাসিড : প্রায় 0.205 মিলি গ্রাম ( লিভারে ফ্যাট বা লিপিড বিপাকে অংশ নেয় )।
- ভিটামিন B-1 / থায়ামিন ( Thiamin ) : প্রায় 0.079 গ্রাম ( কার্বোহাইড্রেট থেকে শক্তিতে রূপান্তর করে )।
- ভিটামিন B-6 / পাইরিডক্সিন(Pyridoxine) : প্রায় 0.110 মিলি গ্রাম ( মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রেখে এবং স্নায়ুকোষের সুরক্ষা প্রদান করে)।
- ভিটামিন B-2 / রিবোফ্লাভিন (Riboflavin) : প্রায় 0.025 মিলি গ্রাম (ত্বক ও চোখের জন্য খুবই উপকারী)।
- ভিটামিন B-9 / ফোলেট ( Folate ) : প্রায় 18 মাইক্র গ্রাম ( µg ) (নতুন কোষ তৈরিতে এবং রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে)।
- ভিটামিন A ( Vitamin A / RAE ) : প্রায় 3.00 মাইক্রো গ্রাম ( µg ) (চোখের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে)।
এছাড়াও ভিটামিন K এবং ভিটামিন E এর মাত্রা অত্যন্ত সামান্য ।
আনারসের সমস্ত উপাদানের মধ্যে একটি মূল্যবান উপাদান হলো ব্রোমেলিন। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি বিভিন্নভাবে শরীরকে সুস্থ সবল রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
আনারস খাওয়ার সতর্কতা
আনারস বিভিন্নভাবে আমাদেরকে উপকার করলেও এটি বেশি মাত্রায় খেলে আমাদের ক্ষতিও হতে পারে।
অতিরিক্ত আনারস খেলে অম্বল বা পেটের ব্যাথা হতে পারে।
অনেকেরই আনারসের এলার্জি থেকে থাকে তাই যাদের আনারসে অ্যালার্জি আছে তারা আনারস এড়িয়ে চলুন।
ডায়াবেটিস রোগীরা বেশি পরিমাণে আনারস খেলে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই পরিমিত পরিমাণে খাবেন।
গর্ভাবস্থার সময় স্বাভাবিক পরিমাণে আনারস নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয় তাই খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
যারা রক্ত পাতলা করার ঔষধ সেবন করছেন তারা কম মাত্রায় আনারস সেবন করবেন । অতিরিক্ত আনারস সেবনে রক্ত আরো পাতলা হয়ে গিয়ে রক্তপাত ঘটতে পারে। তাই আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে আনারস সেবন করবেন।
উপসংহার
আনারস, রসে ভরা এমন একটি ফল, যার প্রতিটি কামড়ে এক অত্যন্ত রসালো মিষ্টি স্বাদ এবং মনভোলানো হালকা সুবাস এবং অসংখ্য পুষ্টিগুণ পেয়ে থাকি। ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, ফাইবার ছাড়াও ব্রোমেলিনের মত মূল্যবান উপাদানের উপস্থিতি আনারসকে শুধু মাত্র সুস্বাদু ফল নয়, এটিকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যে পরিণত করেছে যাও অত্যন্ত কার্যকর। প্রতিদিন পরিমাণ মতো আনারস খেলে শরীর তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়, আর মনটা এক অনন্য সতেজতায় ভরে ওঠে।🍍