আমড়া: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ঘরোয়া প্রতিকার

Written by

in

আমড়া আমাদের কাছে খুবই পরিচিত একটি ফল। আমরা একে অতটা গুরুত্ব না দিলেও এর বেশ গুরুত্ব রয়েছে। এটি টক, কষযুক্ত এবং হালকা মিষ্টি স্বাদের হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম (Spondias pinnata)।এটি কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতে খেতে খুব ভালো লাগে। এটি দিয়ে আচার, জেলি, চাটনি ইত্যাদি তৈরি হয়ে থাকে। এছাড়া তরকারি রান্না করা হয়ে থাকে।  এর ফল, পাতা, ছাল ও শিকড়—সবকিছুই লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

এটি পাচনতন্ত্রকে সবল সতেজ করে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। পিত্ত বৃদ্ধি হলে লু লাগলে গ্রীষ্মের ক্লান্ত হয়ে পড়লে গা বমি বমি করা প্রভৃতি রোগ উপশম হয়।

 আমড়ার মধ্যে ভিটামিন C অনেক বেশি মাত্রায় থাকে। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শরীরে কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, ত্বক সুন্দর রাখে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। অনেক ক্ষেত্রে আমড়ার ভিটামিন C এর পরিমাণ কমলা লেবুতে থাকা ভিটামিন C এর সমান বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

আমড়ার মধ্যে ভিটামিন A থাকে যা চোখের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে, রাতকানা প্রতিরোধে সাহায্য করে, ত্বক সুস্থ রাখে।

আমড়ার মধ্যে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ থাকে। যা বিভিন্নভাবে  আমাদেরকে উপকার করে থাকে।

   বিশেষ করে আয়রন, ক্যালসিয়ামআয়রন – রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক। ক্যালসিয়াম – হাড় ও দাঁত কে শক্তিশালী করে তোলে। 

   আরও কিছু খনিজ উপাদান থাকে । পটাশিয়াম – রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে সহায়ক। ফসফরাস – কোষের বৃদ্ধিতে ও শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে থাকে। ম্যাগনেসিয়াম – স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়ক। জিঙ্ক – রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কপার – রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। 

    আমড়ার মধ্যে কিছু রাসায়নিক উপাদান রয়েছে – ফ্ল্যাভোনয়েড, পলিফেনল, ট্যানিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ, ক্যারোটিনয়েড, জৈব অ্যাসিড ইত্যাদী। এগুলো শরীরকে ফ্রি-র‍্যাডিক্যালের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে থাকে।

ত্বকের জন্য আমড়া

আমড়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন C কোলাজেন তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকরী। যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, বলিরেখা কমাতে সহায়তা করে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।

চুলের জন্য আমড়া

আমড়ার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান সমূহ — চুলের গোড়া শক্ত করে থাকে, চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে, মাথার ত্বক ভালো রাখে। 

আয়ুর্বেদে আমড়ার ব্যবহার

অরুচি দূর করতে

কাঁচা আমড়া সামান্য বিট লবণ, ভাজা জিরা গুঁড়ো সহযোগে খেলে অরুচি দূর হয়, ক্ষুধা বাড়ায়।

বদহজমে

পরিমিত পরিমাণে আমড়ার চাটনি খেলে তা খাবার হজমে সাহায্য করে।

কোষ্ঠকাঠিন্যে

একটি পাকা আমড়া নিয়মিত খেলে এর মধ্যে আঁশ সমৃদ্ধ হওয়ায় তা মল নরম করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। 

রক্তশূন্যতায়

আমড়ার রসের সঙ্গে গুড় খেলে আয়রন শোষণ বাড়ে এবং এটি রক্তশূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে।

আতিরিক্ত গরমে

গরমকালে আমড়ার শরবত উপকারী। এটি শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমায়।

বমিভাব কমাতে

বমি বমি ভাব দেখা দিলে কিংবা বমি হলে আমড়া তা দূর করতে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থায় অনেক নারী টক স্বাদের কারণে আমড়া খেয়ে স্বস্তি পেয়ে থাকেন।

মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে

আমড়া চিবিয়ে খেলে মুখে লালা নিঃসরণ বাড়ে এবং মুখ পরিষ্কার থাকে। এবং এটি মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। 

স্কার্ভি প্রতিরোধে

ভিটামিন C এর অভাব দেখা দিলে স্কার্ভি হয় তাই নিয়মিত আমড়া খেলে এর ঝুঁকি কমে।

সর্দি-কাশিতে

আমড়ার রস মধু সহযোগে খেলে সর্দি-কাশির থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় 

উচ্চ ভিটামিন C শরীরে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে। ফলে বিভিন্ন রোগে লড়াই করার শক্তি বৃদ্ধি পায়।

বিশেষ সতর্কতা 

আমড়ার মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদান উপকারী হলেও অতিরিক্ত আমড়া খেলে শরীরের বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। পেট খালি থাকলে আমড়া খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত আমড়া খেলে যে সব সমস্যা হতে পারে — 

অম্বল বা বুক জ্বালাপোড়া :— আমড়াতে প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে। অতিরিক্ত পরিমাণে আমড়া খেলে এই অ্যাসিড পাকস্থলীতে অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এতে বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর বা অম্বল হতে পারে।

গ্যাস ও পেট ফাঁপা :— আমড়ার থাকা উচ্চ ফাইবার হজমে সহায়তা করলেও অতিরিক্ত আমড়া খেলে তা পেটের মধ্যে অম্লীয় উপাদান বাড়িয়ে তোলে এবং হজমে গোলমাল পাকায়। ফলে গ্যাসের সমস্যা হতে পারে এবং পেট ফাঁপা ও পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

দাঁতের এনামেল ক্ষয় :– আমড়ার তীব্র টক ভাব বা অ্যাসিড থাকে। যা দাঁতের সুরক্ষাকবচ ‘এনামেল’ কে নরম করে দেয়। অতিরিক্ত আমড়া চিবিয়ে খেলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে গিয়ে দাঁত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আমড়া খাওয়ার পরই শুধুমাত্র পরিষ্কার জল দিয়ে ভালো করে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। কিন্তু ব্রাশ করবেন না। খাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট পর ব্রাশ করুন।

অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির রোগে:– যে সমস্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত গ্যাস্ট্রিক বা হাইপার-অ্যাসিডিটির সমস্যা হয়ে থাকে, তাদেরকে খালি পেটে বা অতিরিক্ত পরিমাণে টক আমড়া খাওয়া উচিত নয়। 

পাকস্থলীর আলসার রোগে :– যে সমস্ত ব্যক্তিদের আলসার বা পেটে ঘা আছে আমড়ার মধ্যে থাকা অ্যাসিড সেই ক্ষতকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এতে পেটে প্রচন্ড ব্যথা বা তীব্র জ্বালাপোড়া হতে পারে।

সংবেদনশীল দাঁতের সমস্যা:– যাদের দাঁত শিরশিরানীর সমস্যা আছে বা ঠান্ডা-গরম লাগলে দাঁতের সমস্যা হয়, তারা আমড়া খাওয়ার পর অবশ্যই ভালো করে কুলকুচি করে মুখ ধুইবেন এবং দাঁতের মাজন ব্যবহার না করে ব্রাশ করে নেবেন, নাইলে শিরশিরানি আরও বাড়বে।

লবণ ও মরিচ ব্যবহারে সতর্কতা:–  আমড়া কাটার পর প্রচুর পরিমাণে লবণ ও কাসুন্দি বা মরিচ মিশিয়ে খেলে অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *