কাঁঠাল: পুষ্টিগুণ সম্পন্ন, গন্ধেই ক্ষুধা জাগে।
আমাদের ভারতবর্ষে সর্বত্রই কাঁঠাল পাওয়া যায়। সব থেকে বেশি ভালো লাগে যখন কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল পেকে তার সুগন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এমনিতেই জিভে জল চলে আসে। কাঁঠাল পেকে গেলে তা সবুজ থেকে সোনালি-হলুদ রং ধারণ করে। পাকা সুগন্ধময়, নরম রসালো, মধুর মতো মিষ্টি মিশ্র স্বাদে ভরপুর এই ফলটি একসঙ্গে অনেকগুলি ফলের স্বাদের অনুভূতি দিয়ে থাকে।, বলা যায় যে কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়, এটি আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। কাঁচা অবস্থাতে কিংবা কাঁঠালের দানা দিয়ে বহুমুখী রান্না হয়ে থাকে। কাঁচা অবস্থাতে রান্না করলে এটি স্বাদ অনেকটা মাংসের মত হয়ে থাকে তাই একে “গাছের মাংস” বলা হয়। অনেক সময় একে “গাছ পাঁঠা” বা নিরামিষ মাংসও বলা হয়ে থাকে। উত্তর ভারতে কাঁচা কাঁঠালের তরকারি খুবই জনপ্রিয় আবার দক্ষিণ ভারতে কাঁঠালের চিপস বাস খুবই জনপ্রিয়। পাকা, কাঁচা উভয় অবস্থায় এবং কাঁঠালের দানা তে প্রচুর পুষ্টিকর উপাদান থাকে।
আমাদের ভারতবর্ষে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠালের চাষ হয়ে থাকে এর সব থেকে উল্লেখযোগ্য স্থান হলো পশ্চিমঘাট পর্বতমালা অঞ্চল। এছাড়াও বেশ কিছু রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠালের চাষ হয়ে থাকে যেমন তামিলনাড়ু, কেরালা, ওড়িশা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং উত্তর প্রদেশের কিছু অংশে । আদ্র ও উষ্ণ প্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে এর ফলন খুব ভালো হয়ে থাকে। কাঁঠাল ভারতের দুটি অঙ্গরাজ্যের অফিশিয়াল রাজ্য ফল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus heterophyllus
পাকা কাঁঠালের পুষ্টিগুণ
USDA) এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য পাকা কাঁঠালে যে পুষ্টি উপাদান রয়েছে এবং তার দৈনিক চাহিদার কতটুকু পূরণ করতে পারে নিম্নে সাজানো হলো:
- জল : প্রায় 72–94 গ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 16–25 গ্রাম.(দৈনিক শর্করার চাহিদার প্রায় 8% থেকে 9% )
- খাদ্য আঁশ (ফাইবার) : প্রায় 1.5–3.0 গ্রাম.(দৈনিক ফাইবারের চাহিদার প্রায় 6% পূরণ করে)
- প্রোটিন : প্রায় 1.2–2.0 গ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 3% থেকে 4% পূরণ করে)
- ফ্যাট : প্রায় 0.1–0.64 গ্রাম. (1% এরও কম)
খনিজ উপাদান
- পটাশিয়াম : প্রায় 200–450 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 10% থেকে 13%)
- ফসফরাস : প্রায় 20–38 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 3% থেকে 5%)
- ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 25–37 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 7% থেকে 8%)
- ক্যালসিয়াম : প্রায় 20–40 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 2% থেকে 3%)
- সোডিয়াম : প্রায় 2–4 মিলিগ্রাম. (1% এর থেকেও কম)
- আয়রন : প্রায় 0.2–0.23 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5% থেকে 2%)
- জিঙ্ক : প্রায় 0.1–0.13 মিলিগ্রাম.(1% এর থেকেও কম)
- কপার : প্রায় 0.04 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)
- ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.043 মিলিগ্রাম সামান্য (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
ভিটামিনসমূহ
- ভিটামিন C : প্রায় 13–15 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 15% থেকে 23%)
- ভিটামিন A (বিটা-ক্যারোটিন) : 100–120 IU ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 4%)
- ভিটামিন B6 : প্রায় 0.33 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদা 25%)
- নিয়াসিন (B3) : প্রায় 0.92 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 6% থেকে 9%)
- রিবোফ্লাভিন (B2) : প্রায় 0.06- 0.1 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5% থেকে 8%)
- থায়ামিন (B1) : প্রায় 0.03- 0.07 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 4% থেকে 5% )
- ফলেট (B9) : প্রায় 24 মাইক্রোগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 6%)
- ভিটামিন E : মাত্র 0.34 মিলিগ্রাম.(1% এর ও কম)
- ভিটামিন K : মাত্র 0.5 মাইক্রোগ্রাম. (1% এর ও কম)
কাঁঠালের বিশেষ জৈব উপাদান
কাঁঠালে ভিটামিন-খনিজ ছাড়াও, আরও কিছু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে:
- ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
- পলিফেনল
- ফ্ল্যাভোনয়েড
- ক্যারোটিনয়েড
- স্যাপোনিন
- লিগন্যান
- ট্যানিন
এই সমস্ত উপাদান শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতি থেকে কোষকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
আয়ুর্বেদে কাঁঠালের গুরুত্ব
আয়ুর্বেদ মতে কাঁঠাল শরীরে বল বৃদ্ধি করে, ধাতু পুষ্ট করে, বীর্যবর্ধক, ওজন বৃদ্ধিতে সহায়ক,বাত ও পিত্ত প্রশমক, ক্লান্তি দূর করে, হৃদপিণ্ডকে শক্তিশালী করে, রক্ত পুষ্ট করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। আবার অতিরিক্ত সেবনে কফ বৃদ্ধি করতে পারে।
উপসংহার:
সর্বোপরি বলা যায়, কাঁঠাল শুধুমাত্র একটি সুগন্ধি রসালো ও সুস্বাদু গ্রীষ্মকালীন ফলই নয়, এটি একদিকে পুষ্টির ভাণ্ডার এবং প্রকৃতির দেওয়া এক অনন্য মহৌষধ। এর প্রতিটি কোয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে ভিটামিন, খনিজ এবং শক্তিশালী সব ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট, যা আমাদের শরীরকে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষা দেয়। অন্যদিকে, প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বর্ণনা অনুযায়ী এর ‘বাত’ ও ‘পিত্ত’ প্রশমনকারী গুণ এটি কে ঔষধি গুণে ভরা ভেষজের তালিকাভূক্ত করেছে। কাঁচা অবস্থায় ‘এঁচোড়’, নিরামিষ রান্নায় মাংসের পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে। পাকা অবস্থায় মিশ্র স্বাদে ভরা মিষ্টি ফল এবং তার পুষ্টিকর বিচি অর্থাৎ দানা মানবদেহের জন্য পরম উপকারী।