জাম আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এবং পছন্দ করে একটি ফল। ঠিক বর্ষার শুরুতেই গাঢ় বেগুনি-কালো রঙের ছোট ছোট জামে গাছ ভরে যায়, যেন সবুজের মাঝে বেগুনি কালো ছোঁয়া। অপূর্ব এক সৌন্দর্য। সঙ্গে মিষ্টি-টক সুগন্ধে আশেপাশে চারিদিকে ভরে যায়। জাম খাওয়ার অনুভূতি খুবই অতুলনীয়। জাম মুখে পড়ে হালকা চাপ দিলেই মুখে ছড়িয়ে পড়ে কষ-মেশানো টক-মিষ্টি রস, জিভে হালকা ঝাঁঝ অনুভূতি হয়, আর ঠোঁট, মুখ ও জিভ বেগুনি রঙে রঙে যায়।
তাই যারা কোন সময় জাম খেয়েছেন জাম দেখলে তাদের জিভে জল আসতে বাধ্য। জামের পরিচয় শুধু স্বাদের জন্য নয়—এটি একটি প্রাকৃতিক “ঔষধি ফল”।
আয়ুর্বেদে একে রাজফল বলা হয়, কারণ এর ফল, বীজ, পাতা, ছাল—সবই বিভিন্নভাবে আমাদেরকে উপকার করে থাকে।
জামের পুষ্টিগুণ
জামে জলীয় অংশ সব থেকে বেশি, তাই এটি হাইড্রেশন দেয় ও শরীর ঠান্ডা রাখে। USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা জামে প্রায় যে পরিমাণ পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারে তালিকা দেয়া হলো।
উপাদান পরিমাণ
- জল : প্রায় 83.13–90 গ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 14–19 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.6% )
- প্রাকৃতিক শর্করা : প্রায় 6–15 গ্রাম
- খাদ্য আঁশ (Fiber) : প্রায় 0.90–3.5 গ্রাম (দৈনিক আঁশের চাহিদার প্রায় 3.6%)
- প্রোটিন : প্রায় 0.70–0.7 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 1.2%)
- খনিজ লবণ (Minerals) : প্রায় 0.40–1 গ্রাম
- ফ্যাট/চর্বি : প্রায় 0.23-0.3 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.3%)
খনিজ পদার্থ
- পটাশিয়াম : প্রায় 55-79 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.2% )
- ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 35 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 8.7% )
- ফসফরাস : 15–16 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.1% )
- ক্যালসিয়াম : 8–15 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5%)
- আয়রন : প্রায় 1– 1.41 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7.8%)
- সোডিয়াম : প্রায় 26.2 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.1% )
কপার : প্রায় 0.23 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 11.5%)
ভিটামিনসমূহ
- ভিটামিন C : প্রায় 14.3-40 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 24%)
- ভিটামিন B3/নিয়াসিন : প্রায় 0.26 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.6% )
- ভিটামিন B1/থায়ামিন : প্রায় 0.006 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.5%)
- ভিটামিন B2/রিবোফ্লাভিন : প্রায় 0.006 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.4%)
- ভিটামিন A : প্রায় ৪৮ µg মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.3%)
জামের বিশেষ বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান
অ্যান্থোসায়ানিন
জামে সায়ানিডিন ডিগ্লুকোসাইড এবং ডেলফিনিডিন নামক অ্যান্থোসায়ানিন থাকে। যা জামের গাঢ় বেগুনি বা কালো রঙের জন্য দায়ী। এটি শরীরের ‘ফ্রি রেডিক্যাল’ বা ক্ষতিকর অণু গুলিকে ধ্বংস করে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করে।
জাম্বোলিন এবং জাম্বোসিন
এই দুটি হল বিশেষ অ্যালকালয়েড এবং গ্লুকোসাইড উপাদান। এই দুটি সাধারণত জামের বীজে পাওয়া যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাম্বোলিন রক্তে থাকা শ্বেতসার বা স্টার্চ কে চিনিতে রূপান্তরিত হতে বাধা দেয়। ফলে খাবার খাওয়ার পর রক্তে হঠাৎ ব্লাড সুগার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
পলিফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েড
জামে পলিফেনলিক যৌগ প্রচুর পরিমাণে থাকে, যার মধ্যে মাইরিসেটিন এবং কোয়ারসেটিন অন্যতম। মাইরিসেটিন সরাসরি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে দেয়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়া এগুলি শরীরে অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে থাকে।
হাইড্রোলাইজেবল ট্যানিন
জাম খাওয়ার সময় যে কষকষে ভাব অনুভূতি হয়, তা এই ট্যানিনের কারণে ঘটে। জামে গ্যালিক অ্যাসিড এবং এলাজিক অ্যাসিড নামক ট্যানিন থাকে। এলাজিক অ্যাসিড এবং গ্যালিক অ্যাসিড শক্তিশালী অ্যান্টি-ক্যান্সার ও অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান হিসেবে কাজ করে এছাড়া এগুলি লিভারকে ক্ষতিকর টক্সিন এর হাত থেকে রক্ষা করে এবং পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ করতে সাহায্য করে।
জৈব অ্যাসিড
জামের মধ্যে ম্যালিক অ্যাসিড, অক্সালিক অ্যাসিড এবং সাইট্রিক অ্যাসিড ইত্যাদি প্রাকৃতিক অ্যাসিড থাকে। যা জামের টক-মিষ্টি স্বাদের মূল কারণ। এই অ্যাসিডগুলো শরীরের হজম রস বা পরিপাক এনজাইমগুলোকে উদ্দীপিত করে ফলে বিপাক ক্রিয়া উন্নত হয় এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে জামের গুরুত্ব
আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রে জামকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘মহৌষধি’ ফল হিসেবে মানা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই জাম, জামের পাতা, ছাল এবং বীজ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদ মতে, জাম হলো ‘কফ’ ও ‘পিত্ত’ নাশক, এবং রক্তশোধক। তবে এটি সামান্য ‘বাত’ বর্ধক।
উপসংহার :
বলা যায় যে, জাম শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালের একটি পুষ্টিকর, আকর্ষণীয় ও জিভে জল আনা সুস্বাদু ফলই নয়, বরং এটি মানবদেহের উপকারকারী প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। এর মিষ্টি-অম্ল-কষাটে শাঁস থেকে শুরু করে এর পাতা, ছাল এবং বীজ এর প্রত্যেকটি অংশে লুকিয়ে রয়েছে বিপুল পুষ্টি ও ঔষধি গুণাগুণ। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে, রক্তস্বল্পতা দূর করতে, হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা এবং লিভারকে সুস্থ রাখতে চমৎকারভাবে ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে থাকা ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তাই জাম কে আমাদের দৈনিক খাদ্য তালিকায় রাখলে সুস্থ দীর্ঘায়ু জীবন লাভ করা যায়।