জলপাই এবং জলপাই তেল এর পুষ্টিগুণ

জলপাই পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান ফল। এটি শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, স্বাস্থ্যরক্ষাকারী একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জলপাই থেকে স্বাস্থ্যকর ভোজ্য তেল উৎপাদিত হয়। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এর অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে জলপাই ও জলপাই থেকে উৎপাদিত তেলে বিদ্যমান বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং বিশেষ জৈব যৌগ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে জলপাইয়ের গুরুত্বও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।  বিশেষ করে ভারত এবং বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে “জলপাই”  আচার তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

জলপাইয়ের পরিচয়

জলপাই গাছ বহু বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে এবং প্রতি বছর ফল দেয়।  

জলপাই ফল ছোটো অবস্থায় সবুজ থাকে এবং পরবর্তীতে পুরুষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বেগুনি, লালচে বা কালো রঙ ধারণ করে। জলপাইয়ের বৈজ্ঞানিক নাম হল Elaeocarpus serratus। বর্তমানে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের অধিকাংশ জলপাই উৎপাদিত হয়। শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পেন, ইতালি, তুরস্ক, গ্রিস, তিউনিসিয়া, মরক্কো, পর্তুগাল। 

     এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, চিলি ও দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে কমবেশি জলপাই চাষ হয়। 

জলপাই এর মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান থাকায় নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে জলপাই বা জলপাই তেল  হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রদাহ হ্রাস, কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।USDA

এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা জলপাই তে প্রায় ১১৫ থেকে ১৪৫ ক্যালোরি থাকে।  নিম্নে প্রতি ১০০ গ্রাম জলপাই এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হল।

উপাদান পরিমাণ 

  • জল : প্রায় 75–81 গ্রাম 
  • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 4–8 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.4% )
  • খাদ্য আঁশ (ফাইবার) : প্রায় 3–4 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 12%  যা হজমে দারুণ উপকারী)
  • ফ্যাট : প্রায় 5–15.3 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 20% ) 
  • প্রোটিন : প্রায় 0.8–1.2 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)

ভিটামিন পরিমাণ

  • ভিটামিন E : প্রায় 1.5–3.8 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 25% , ত্বক ও চুলের জন্য সেরা)
  • ভিটামিন A (বিটা-ক্যারোটিন থেকে) :  প্রায় 17–40 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় ৮%, চোখের জন্য উপকারী)
  • ভিটামিন K : প্রায় 1–2 মাইক্রোগ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5% )
  • ভিটামিন C : প্রায় 0.5–1 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1% )
  • ভিটামিন B1 (থায়ামিন) : প্রায় 0.02– 0.03 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.5% )
  • ভিটামিন B2 (রিবোফ্লাভিন) : প্রায় 0.01–0.05 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় ৪%)
  • ভিটামিন B3 (নায়াসিন) : প্রায় 0.2–0.3 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5%)
  • ভিটামিন B-6 : 0.03 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
  • ভিটামিন B9 (ফোলেট) : প্রায় 3–5 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)

খনিজ পরিমাণ

  • পটাশিয়াম : প্রায় 40–60 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)
  • ক্যালসিয়াম : প্রায় 40–55 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4%, হাড় মজবুত করে)
  • ফসফরাস : প্রায় 4–15 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.5%)
  • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 4–11 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 3%)
  • আয়রন (লোহ) : প্রায় 0.5–1.6 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 3%, রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে)
  • জিঙ্ক : প্রায় 0.04–0.2 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.5%)
  • কপার (তামা) : প্রায় 0.1–0.12 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 13%)
  • ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.02–0.05 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট

জলপাইয়ের সবচেয়ে মূল্যবান শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে নিম্নে সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

ওলিওরোপেইন 

 কাঁচা জলপাইয়ের প্রধান তিক্ত স্বাদের কারণ হলো ওলিওরোপেইন। এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, ক্ষতিকর জীবাণুর বৃদ্ধি দমন করতে পারে এবং হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে।

হাইড্রক্সিটাইরোসোল 

হাইড্রক্সিটাইরোসোল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে পরিচিত। এটি কোষের DNA সুরক্ষা করে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়, বার্ধক্যজনিত কোষ ক্ষয়  কমাতে সাহায্য করে।

টাইরোসোল 

টাইরোসোল প্রদাহ কমাতে এবং কোষকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

স্কুয়ালিন 

জলপাইয়ের মধ্যে অল্প পরিমাণে স্কুয়ালিন থাকে।

এটি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং কোষ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। এছাড়া এটি প্রসাধনী শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

ফ্ল্যাভোনয়েড

জলপাইয়ের মধ্যে Quercetin, Luteolin, Apigenin ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে, যা শরীরের প্রদাহ কমায় এবং কোষকে মুক্ত মৌলের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। 

গুরুত্ব

জলপাই থেকে উৎপাদিত অন্যতম মূল্যবান কৃষিপণ্য গুলি হলো জলপাই তেল, টেবিল অলিভ, আচার, প্রসাধনী, সাবান, ঔষধি উপাদান ইত্যাদি। 

উপসংহার

জলপাই এমন একটি ফল, যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং এর মধ্যে থাকা অসাধারণ পুষ্টিগুণের জন্য সারা বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। জলপাইয়ের মধ্যে থাকা প্রধান পুষ্টি উপাদান হলো স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি, বিশেষ করে ওলেইক অ্যাসিড। এছাড়া এতে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন E, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, খাদ্য আঁশ এবং ওলিওরোপেইন, হাইড্রক্সিটাইরোসোল ও বিভিন্ন ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খাদ্যাভ্যাসে জলপাইয়ের ব্যবহার করলে তা আমাদেরকে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং সামগ্রিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

Leave a Comment