আমলকী: এর আয়ুর্বেদিক ব্যবহার।

আমলকি আমাদের প্রত্যেকের কাছে খুবই পরিচিত একটি ফল । ট্রেন থেকে শুরু করে বাসে বিভিন্ন জায়গায় আমলকি বিক্রি হয়ে থাকে । কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা যে আমলকি কেন এত বিখ্যাত।

একটি আমলকিতে একটি কমলা লেবুর চেয়েও অত্যন্ত বেশি মাত্রায় ভিটামিন C থাকতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো আমলকির মধ্যে থাকা ভিটামিন C রান্না করার পর বা শুকানোর পরও তুলনামূলক ভাবে অনেকটা কার্যকর হয়ে থাকে, কারণ এর মধ্যে থাকা ট্যানিন ভিটামিন C-কে রক্ষা করতে করে থাকে।

আয়ুর্বেদের বিখ্যাত ত্রিফলার তিনটি উপাদানের একটি হলো আমলকি।

টাটকা আমলকি শরীরকে শান্তি প্রদান করে থাকে অত্যন্ত পরিশ্রমে ক্লান্তি দূর করে। অনেকে আমলকি মধুর সঙ্গে খায়। এটি অনেকের কাছে আমলা বলেও পরিচিত।

প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা আমলকির মধ্যে প্রায় ২০০ থেকে ৯০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়। পরিমাণের ভিত্তিতে এতটা বেশি মাত্রায় ভিটামিন সি আর অন্য কোন ফলে পাওয়া যায় না। এটি দামেও সস্তা এবং স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী, যারা ভিটামিন সি এর অভাবে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তাদের জন্য আমলকি হল অমৃত ফল।

যাদের খেতে ভালো লাগে না কিংবা কম খিদে পায়, আমলকি তাদের ক্ষুধা বৃদ্ধি করে। হৃদপিন্ডের সমস্ত রোগের জন্য এটি খুবই উপকারী। আমলকি মানসিক চিন্তা দূর করতে সাহায্য করে।

পৌরুষ শক্তির অভাব দেখা দিলে ও দৃষ্টিশক্তি হীন হলে নিয়মিত আমলকির ব্যবহার করবেন। রাত্রিবেলা আমলকি জলে ভিজিয়ে রাখবেন পরদিন সকালে সেই জল দিয়ে চোখে ঝাপটা দিন। আমলকি মানুষের পাচনতন্ত্র মাংস পেশি ও স্নায়ু মন্ডলীর উপর ভালো প্রভাব ফেলে ।

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ঘরোয়া ভাবে আমলকির দ্বারা উপাচার।

চোখের জ্যোতি ও চুলের উপকার

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আমলকিতে একটি অমৃত ফলের তুল্য বলে মনে করা হয়। একে তুলসির সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। আমলকি ও তুলসী একত্রে মিশ্রণ তৈরি করে ব্যবহার করলেন সেটি মানবদেহের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।

একটি আমলকি শুকানোর পর ভিতরের বীজ অর্থাৎ দানা বাদ দিয়ে টুকরো করে কেটে চূর্ণ তৈরি করে কাপড় ছেঁকে নিন। এর সঙ্গে ছয় থেকে আটটি তুলসী পাতা দিয়ে পিশিয়ে নিন, এই মিশ্রণ অল্প জলের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়মিতভাবে সেবন করলে চোখের সমস্যার মত শারীরিক দুর্বলতা থাকে না।

যারা মাথায় চুল ওঠার সমস্যায় ভুগছেন , মাথায় খুশকি দেখা দিলে, চুল পাতলা হয়ে গেলে, এমন অবস্থায় আমলকী ও তুলসী পাতার মিশ্রণ চুলে লাগাবেন দুই থেকে তিন দিন অন্তর। নিয়মিতভাবে এটি চুলে লাগালে চুল তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পায় । চুলের গোড়া শক্ত হয়, খুশকি আর থাকে না।

অসময়ে চুলপাকা

বার্ধক্য জনিত কারণ ছাড়া যদি চুলের রং সাদা হতে থাকে তাহলে রাত্রে আমলকি জলে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সকালে সেই জলে চুল ধুলে চুল রেশমের মতো কোমল এবং সুন্দর কালো হয়ে উঠবে ।

ঘরোয়া হেয়ার প্যাক

২ চামচ আমলকি রস অন্যথা গুঁড়ো ২ চামচ দই এর সঙ্গে একত্র মিশিয়ে সেই মিশ্রণ ৩০ মিনিট মাথায় লাগিয়ে রাখার পর ধুয়ে ফেলুন।

দাঁতের রোগ

আমলকি কেটে তার ভেতরের বীজ অর্থাৎ দানা ফেলে দিয়ে শুকনো করে চূর্ণ তৈরি করবেন, প্রতিদিন রাত্রে গরম জলের সঙ্গে কিংবা গরম দুধের সঙ্গে এক চা চামচ এই চূর্ণ মিশিয়ে খেলে পেটের রোগ এবং দাঁতের রোগ দূর হয়।।

শ্বেতপ্রদর রোগ

নিয়মিতভাবে একমাস যাবত জলের সঙ্গে এক চা চামচ পরিমাণ আমলকির চূর্ণ খেলে শ্বেতপ্রদর এর পরিমাণ কমে যায় এবং রোগ দূর হয়।

সহজ প্রসব

প্রসবকালীন অধিকাংশ নারী খুব কষ্ট পেয়ে থাকেন এবং অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন এই অবস্থায় আমলকী ম্যাজিক এর মত কাজ করে। ২৫ গ্রাম জলের সঙ্গে ১০ গ্রাম টাটকা আমলকি অথবা পরিবর্তে শুকনো আমলকি মিশিয়ে ফুটিয়ে নিন এবার ওতে ৮০ মিলি জল মিশিয়ে ছেঁকে নিয়ে খাইয়ে দিন। এতে প্রসব যন্ত্রণা লাঘব হয়। সহজে প্রসব হয়, তেমন কোন কষ্ট হয় না।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

আমলকি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। ঘরোয়া উপায়ে ২০-৩০ মি.লি. আমলকির রস এবং ১ চা চামচ করলার বা উচ্ছের রস একসাথে মিশিয়ে সকালে খাওয়া হয়। ( চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয় )।

হৃদরোগ

প্রতিদিন টাটকা আমলকি চিবিয়ে খেলে তা হৃদপিন্ড এর শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এতে হৃদপিন্ডের রোগ দমন থাকে। কারণ আমলকি কোলেস্টেরলের পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

১৯৮৮ সালের ৭ ই এপ্রিল মুম্বাইতে অনুষ্ঠিত এক অধিবেশনে বিহারের খ্যাতিমান ডাক্তার মোহন মিত্র যে গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছিলেন তার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে আমলকি কোলেস্টেরল এর বিনাশক রূপে কাজ করে।

যদি প্রতিদিন 50 গ্রাম মাত্রায় টাটকা আমলকি খাওয়া যায় তাহলে এক মাস পরে দেখা যাবে যে কোলেস্টেরলের পরিমাণ ৩১% ভাগ কমে গেছে।

আধকপালি

এটি মাথার একটি রোগ, অনেক সময় দেখা যায় মাথার অর্ধেক অংশ অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। এরূপ অবস্থায় যদি আমলকি খাওয়া যায় তাতে উপকার পাবেন।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

নিয়মিত আমলকি খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ে। এতে সর্দি-কাশি, ভাইরাস সংক্রমণ, ইত্যাদি রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

হজমশক্তি উন্নত

আমলকি গ্যাস, অম্বল, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রভৃতি রোগ থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে এছাড়া ক্ষুধা বাড়ায়।ঘরোয়া উপায়ে এক চামচ আমলকি গুঁড়ো ঈষদ উষ্ণ অর্থাৎ একদম হালকা গরম জলে মিশিয়ে রাতে পান করুন।

ত্বকের সৌন্দর্য

আমলকি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, এবং বার্ধক্যের লক্ষণ ধীর করতে সহায়ক।

সর্দি-কাশি

সর্দি কিংবা কাশিতে আমলকির দুই চামচ রসের সঙ্গে এক চামচ মধু মিশিয়ে দিনে দুইবার খেলে উপকার পাওয়া যায়।

গলা ব্যথা

শুকনো আমলকি সিদ্ধ করে সেই জল দিয়ে গার্গল করলে উপকার পাওয়া যায়।

এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ, অম্ল রোগ, সেপটিক জ্বর, পিত্তশুল, অনিদ্রা, বমি, শুষ্ক কাশি, প্রস্রাব বা প্রোস্টেট গ্রন্থি সম্পর্কিত বিকার প্রভৃতি রোগে আমলকির রস নিয়মিত পান করলে জাদু মন্ত্রের মতোই কাজ দেয়।

সতর্কতা:- কারা কেনো আমলকি খাবেন না?

যারা রক্ত পাতলা করার জন্য ওষুধ খাচ্ছেন তারা আমলকি খেলে রক্ত আরো পাতলা হয়ে গিয়ে রক্ত স্রাব ঘটতে পারে। যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা খুব কম অর্থাৎ যাদের লো সুগার রয়েছে তারা আমলকি খেলে তাদের সুগার আরো কমে যেতে পারে এতে মাথা ঘোরা দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাদের কিডনি দুর্বল কিংবা কিডনির বিশেষ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, তারা যদি আমলকি সেবন করে, তবে তার কিডনিতে স্টোন করার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অস্ত্রপাচার এর আগে কিংবা পরে আমলকি খেলে তা রক্তস্রাব ঘটাতে পারে।

Leave a Comment