আঙুর: রস, রূপ, পুষ্টির অমূল্য উপহার, কিভাবে উপকারী?

একটি টসটসে আঙুর মুখে দেওয়ার পরে অনুভব হয় মসৃণ পাতলা খোসার মৃদু টান, তারপর হালকা চাপে রসের বিস্ফোরণ। মিষ্টি ও হালকা টক স্বাদের সেই মিষ্টি ছোঁয়া মুহূর্তেই জিভ ভিজিয়ে দেয়। প্রচন্ড গরমের ক্লান্ত দুপুরে হোক বা শীতের শীতল অলস বিকেলে, মুঠো ভরা কিছু ঠান্ডা আঙুর যেন প্রকৃতির তৈরি ছোট্ট মধুর ভাণ্ডার। শুধু স্বাদের নয়, প্রাচীনকাল থেকেই আয়ুর্বেদেও আঙুরকে শক্তিবর্ধক ও রোগ প্রতিরোধে উপকারী ফল হিসেবে মূল্য দেওয়া হয়েছে।

আঙ্গুর আমাদের কাছে পরিচিত এবং অত্যন্ত পছন্দকর একটি ফল। আঙ্গুরের একটি বৈজ্ঞানিক নাম ও রয়েছে। আঙুরের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Vitis vinifera।

কালো, লাল, সবুজ—এই তিনটি রঙের আঙুর আমরা বাজারে দেখে থাকি। পুষ্টিগুণে ক্যালোরি, ফাইবার বা ভিটামিনের দিক থেকে খুব বেশি পার্থক্য থাকেনা, তবে রঙের ভিত্তিতে এদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টের মাত্রায় পার্থক্য থাকে। রঙের গাঢ়ত্ব অনুসারে পুষ্টির তারতম্য নিচে আলোচনা করা হলো :

কালো আঙুর (Black Grapes) —

 অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের রাজা- কালো বা গাঢ় বেগুনি রঙের আঙুরকে পুষ্টিগুণের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করা হয়। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর মাত্রা সর্বোচ্চ পরিমাণে থাকে। অ্যান্থোসায়ানিন (Anthocyanin) এবং রেসভেরাট্রল (Resveratrol) থাকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে। এই কারণেই এর রঙ কালো হয়ে থাকে।

উপকারিতা: মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধতে, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধতে এবং ক্যানসার প্রতিরোধ করতে সবচেয়ে কার্যকরী। রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে এবং ত্বককে বার্ধক্যের হাত থেকে রক্ষা করতে , হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে সব চেয়ে বেশি সাহায্য করে।

লাল আঙুর (Red Grapes) — 

লাল আঙুর পুষ্টির দিক থেকে কালো আঙুরের খুব কাছাকাছি এবং সবুজ আঙুরের থেকে এগিয়ে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্থোসায়ানিন (Anthocyanin) এবং রেসভেরাট্রল (Resveratrol) থাকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকলেও কালো আঙ্গুরের চেয়ে একটু কম। এতে কোয়ারসেটিন থাকে।

উপকারিতা: লাল আঙুর হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে  অত্যন্ত উপকারী। এটি ধমনীকে নমনীয় করে তোলে, রক্তচাপ কমায় এবং রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) এর মাত্রা কমাতে সহায়ক।

সবুজ আঙুর (Green Grapes) — 

ওয়ান ও এনার্জির উৎস সবুজ আঙুর খেতে টক-মিষ্টি মিশ্রিত স্বাদের হয়ে থাকে এবং এতে গাঢ় রঙের পিগমেন্টগুলো থাকে না। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মাঝারি পরিমানে থাকে। এতে রেসভেরাট্রল বা অ্যান্থোসায়ানিনের পরিমাণ একদমই কম বা থাকে না বললেই চলে। গাঢ় রঙের পিগমেন্টগুলো না থাকার কারণে এর রং সবুজ। তবে এতে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে এবং পটাশিয়াম ভালো পরিমাণে থাকে।

উপকারিতা: সবুজ আঙুরে জলের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে দারুণ ভূমিকা পালন করে। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে দারুণ সাহায্য করে এবং পরিপাকতন্ত্রের জন্য বেশ উপকারী।

সারকথা: যদি সর্বোচ্চ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বার্ধক্যরোধী উপকারিতা চান, তবে কালো ও লাল আঙুর সবচেয়ে ভালো। আর যদি গরমে শরীরকে সতেজ ও হাইড্রেটেড রাখতে চান, তবে সবুজ আঙুর দারুন ভূমিকা পালন করে।

বিভিন্ন গবেষণাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা আঙ্গুরে  সব থেকে বেশি পরিমাণে জল থাকে (প্রায় 80-81%) থেকে। প্রতি ১০০ গ্রাম আঙ্গুরে যে সমস্ত মূল পুষ্টি উপাদান, খনিজ এবং ভিটামিনগুলি থাকে পরিমাণগত ভাবে ক্রমানুসারে নিচে দেওয়া হলো :

উপাদানের আনুমানিক পরিমাণ

  • জল (Water ): প্রায় ৮০–৮১ গ্রাম
  • কার্বোহাইড্রেট (Carbohydrates): প্রায় ১৮–১৯ গ্রাম
  • প্রাকৃতিক শর্করা (Natural sugars): প্রায় ১৫–১৬ গ্রাম
  • খাদ্য আঁশ (Fiber): প্রায় ০.৮–১ গ্রাম
  • প্রোটিন (Protein): প্রায় ০.৬–০.৮ গ্রাম
  • ফ্যাট (Fat): প্রায় ০.১–০.২ গ্রাম

খনিজ পদার্থ (Minerals)

খনিজ এর আনুমানিক পরিমাণ

  • পটাশিয়াম (Potassium): প্রায় ১৯০–২০০ মিলিগ্রাম
  • ফসফরাস (Phosphorus): প্রায় ২০ মিলিগ্রাম
  • ক্যালসিয়াম (Calcium): প্রায় ১০ মিলিগ্রাম
  • ম্যাগনেসিয়াম (Magnesium): প্রায় ৭ মিলিগ্রাম
  • সোডিয়াম (Sodium): প্রায় ২–৩ মিলিগ্রাম
  • আয়রন (Iron): প্রায় ০.৩–০.৪ মিলিগ্রাম
  • জিঙ্ক (Zinc): প্রায় ০.০৭ মিলিগ্রাম
  • ম্যাঙ্গানিজ (Manganese): প্রায় ০.০৭ মিলিগ্রাম
  • কপার (Copper): প্রায় ০.১ মিলিগ্রাম

ভিটামিন (Vitamins)

  • ভিটামিন C: ৩.২ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ৪%)
  • ভিটামিন K: ১৪.৬ মাইক্রোগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১২ থেকে ১৪%)
  • ভিটামিন B6: ০.০৮৬ মিলিগ্রাম ( দৈহিক চাহিদার প্রায় ৭%)
  • থায়ামিন (B1): ০.০৬৯ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ৬%)
  • রিবোফ্লাভিন (B2): ০.০৭ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ৬%)
  • নিয়াসিন (B3): ০.১৮৮ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১%)
  • ফোলেট (B9): ২ মাইক্রোগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১ পার্সেন্ট)
  • ভিটামিন E: ০.১৯ মিলিগ্রাম  (পরিমাণ খুবই অল্প দৈহিক চাহিদার প্রায় 1%)
  • ভিটামিন A :৩ মাইক্রোগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১% এর থেকেও কম। বিটা-ক্যারোটিন আকারে খুবই অল্প পরিমাণে)

আঙুরের বিশেষ জৈব উপাদান

আঙুরের প্রকৃত শক্তি শুধু ভিটামিন নয়, এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেও আছে।

রেসভেরাট্রল (Resveratrol)

বিশেষ করে কালো, হালকা বেগুনি ও লাল আঙুরের খোসার মধ্যে থাকে। এটি কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

ফ্ল্যাভোনয়েড

আঙ্গুরের মধ্যে কুয়ারসেটিন, ক্যাটেচিন, অ্যান্থোসায়ানিন ইত্যাদি ফ্ল্যাভোনয়েড গুলি রয়েছে। এগুলো শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ট্যানিন

হজমশক্তি উন্নত করতে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতায় অবদান রাখে।

জৈব অ্যাসিড

আঙ্গুর এর মধ্যে টারটারিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড, সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে। এগুলি আঙুরের স্বাদে এবং হজমে ভূমিকা রাখে।

আঙুর খাওয়ার সময় সতর্ক থাকবেন করা ?

  • Type 2 Diabetes আক্রান্ত ব্যক্তিদের আঙুর খাওয়ার সময় পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে খাওয়া উচিত।
  • কিডনির কিছু রোগে পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে। তাই অতিরিক্ত আঙুর খেলে সমস্যা হতে পারে 
  • আঙুর ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া উচিত, কারণ আঙ্গুরের খোসায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে যা খালি চোখে দেখা যায় না।
  • ছোট শিশুদের গোটা আঙুর খাওয়ালে শ্বাসরোধের ঝুঁকির থাকতে পারে। শ্বাসরোধের ঝুঁকি এড়াতে আঙুর কেটে দেওয়া ভালো।

আঙুর খাওয়ার সেরা উপায়

  • ভালোভাবে ধুয়ে খোসা না ছাড়িয়ে দানা না ফেলে সরাসরি খাওয়া।
  • ফলের সালাদের মধ্যে আঙুর রাখতে অনেকেই খুব পছন্দ করেন।
  • দই বা ওটসের সঙ্গে আঙুর খাওয়া বেশ প্রচলিত।
  • ঠান্ডা করে ফ্রিজে রেখে আঙুর খাওয়া অনেকে পছন্দ করেন। 
  • অনেকেই আঙ্গুরের তাজা রস বের করে খেতে পছন্দ করেন।
  • কিশমিশ আকারে আঙুর খাওয়া বেশ প্রচলিত ।

একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সাধারণভাবে প্রতিদিন প্রায় ১৫০–২০০ গ্রাম আঙুর অথবা ১ কাপ আঙুর এর রস পরিমিত পরিমাণ হিসেবে ধরা হয়। তবে শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও বয়স অনুযায়ী এটি আলাদা হতে পারে।

উপসংহার

আঙুর এমন একটি ফল যাকে দেখলে মনে হবে যেন সবুজ, লাল বা বেগুনি রঙের ছোট ছোট রত্ন। গাছে পাকা প্রতিটি আঙুর এর ভেতরে জমা থাকে মিষ্টি ও টক স্বাদের মিশ্রিত রস যা মুখে দিলেই ক্ষণিকের মধ্যে শরীর ও মন সতেজ হয়ে ওঠে। এছাড়া এর মধ্যে রয়েছে অগণিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং হাজার বছরের ভেষজ ইতিহাস।

Leave a Comment