কলা: আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যবহার।

Written by

in

কলা একটি উৎকৃষ্ট ফল। পৃথিবীর সর্বত্রই সবথেকে বেশি খাওয়া হয়ে থাকা ফল হলো কলা। কলার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, শর্করা, নাইট্রোজেন, আয়োডিন, লবণ, কার্বোহাইড্রেট পদার্থ আছে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে যে পরিমাণ আয়োডিন প্রয়োজন হয় তা কলা থেকে খুব সহজেই পাওয়া যায়।

     কলার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট আর লবণ থাকে। তার ফলে বৃক্ক রোগে এটি অত্যন্ত উপকারী। স্বপ্নদোষ ও প্রমেহ রোগী কলা অসাধারণ উপকার করে।

    কলার মধ্যে বেশি পরিমাণে নাইট্রোজেন থাকায় এটি শরীরে মাংস বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে। এর ভেতরে সেবটোনিন নামক পদার্থ থাকে যা মানুষের মানসিক শান্তি কমাতে সহায়ক।  

     মাথার চুল কালো করতে কলার ভূমিকা ও অদ্বিতীয়। দুধ আর কলা একসঙ্গে যদি প্রতিদিন খাওয়া যায় মাথার চুল দীর্ঘদিন কালো থাকে। কলার মধ্যে যে সমস্ত পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে সেগুলি শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, খেলোয়াড় থেকে শুরু করে অসুস্থ ব্যক্তিদেরও পুষ্টি সাধনে সাহায্য করে থাকে। তাই এটি রোগ প্রতিরোধে ফলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান দখল করে আছে।

কলা— ঘরোয়া চিকিৎসায় এর ব্যবহার

মানসিক রোগ 

মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতিদিন কলা খাওয়া উচিত। কারণ কলার মধ্যে সেবোটোনিন নামক পদার্থ রয়েছে তা মানসিক শান্তি বজায় রাখে। 

দাস্ত রোগ 

এই রোগে কলা খুব উপকার দেয়। একটি পাত্রে সামান্য গাওয়া ঘি গরম করুন তাতে দু-তিন টুকরো লবঙ্গ দিন। ধোনে, হলুদ, সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে দিন। পরিমাণ মতো জল দিন। 

      এবার অপর একটি পাত্রে কলার টুকরো রেখে গরম করুন। পরিমাণ মতো জল দিন। এবার ওই দুটি মিশ্রণকে একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ দাস্ত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাওয়ালেন খুবই উপকার পাওয়া যায়। 

দাদ ও একজিমা 

এই জাতীয় চর্ম রোগ মানুষের মনকে অশান্ত করে তোলে। এই রোগে কলার ব্যবহার খুবই উপকারী হয়ে থাকে। আমরা সকলেই কলা খেয়ে তার খোসা ফেলে দিই কিন্তু কলার খোসা এই রোগে খুবই উপকার করে। আসুন জেনে নেওয়া যাক এর ব্যবহার—

       একটি তাজা কলার খোসা ছাড়িয়ে দেহের দাদ ও একজিমার ক্ষতস্থানে চামড়ায় বেঁধে রাখুন। এইভাবে তিন থেকে চার দিন ক্ষতস্থানের উপরে একইভাবে বাঁধলে ক্ষতস্থানের জীবাণু গুলি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসবে। তখন ওই স্থানে মলম লাগালে দ্রুত উপশম হয়ে থাকে। 

সম্ভোগে দুর্বলতা 

যে সমস্ত নরনারী সম্ভোগজনিত দুর্বলতা রয়েছে তারা  সম্ভোগের আগে দুই থেকে তিন টুকরো কলা খেয়ে হালকা ঈষদুষ্ণ দুধ খাবেন। এতে দেহে শক্তি আসবে, সম্ভোগে আনন্দ লাভ হবে।

মধুমেহ 

মধুমেহ রোগাক্রান্ত রোগীদের জন্য কলা অত্যন্ত উপকারী একটি ফল। প্রথমে একটি পাকা কলা নিন। কলা থেকে কলার ছাল ছাড়িয়ে একে চটকে একটি মন্ড তৈরি করুন। মন্ডের সঙ্গে পরিমাণ মতো আতপ চালের ভুষি মিশিয়ে নেবেন। ওই মিশ্রণটিকে একটি পাত্রতে করে নিয়ে দুই থেকে তিন দিন কোন গরম জায়গায় রেখে দিতে হবে। চতুর্থ দিনের মাথায় পাত্রটি কে এমনভাবে হালকা কাত করে রাখবেন যাতে করে কলার রস মিশ্রণ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই রসের সেবনে মধুমেহ রোগের উপশম হয়ে থাকে। 

শিশুদের পেটের কৃমি 

অধিকাংশ শিশুই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই রোগে শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে যায়। শরীরে ঠিকমতো পুষ্টি লাভ হয় না, শরীর ক্রমশ রুগ্ন হয়ে যায়। এই রোগে কলা ব্যবহার করলে তা চমৎকারভাবে কৃমি ধ্বংস করে এবং এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 

     কলা ভালোভাবে পরিষ্কার জলে ধুয়ে নিয়ে কলার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে ওই ছাল রৌদ্রে ভালো করে শুকিয়ে হামান দিস্তায় বা মিকচার মেশিনে নিখুঁতভাবে গুঁড়ো করে নিতে হবে। এই পূর্ণ ২ গ্রাম পরিমাণে নিয়ে গরম জলে মিশিয়ে ভালো করে গুলে নিন। হালকা গরম জলে গোলা এই মিশ্রণ শিশুকে খাওয়ালে পেটের কৃমি মলের সঙ্গে বেরিয়ে যাবে। নতুন করে আর কৃমির জন্ম হবে না। 

হৃদরোগ 

বর্তমানে শুধু ভারতে নয় সমস্ত দেশেই কেউ না কেউ হৃৎপিণ্ড জনিত কোন না কোন রোগে ভুগছেন। এক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে কলা খেলে হৃদরোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 

       কলা কে যেকোনো তাপে ভালো করে গরম করে নিন তারপর খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দিয়ে চলার সঙ্গে গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাওয়ালে আক্রান্ত ব্যক্তি তাৎক্ষণিক চমৎকারভাবে আরাম পাবেন।

শ্বেত প্রদর

প্রায় অধিকাংশ স্ত্রীলোক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েন, চোখের কোন কালো হয়ে যায়, দেবী লাবণ্য থাকে না। 

      দুই একটি গলা ছাড়িয়ে নিয়ে দুধের সঙ্গে চটকে মিশ্রণ তৈরি করে নিতে হবে। ওই মিশন কিছুদিন নিয়মিত খেলে রোগ উপশম হয়। 

দুর্বলতা 

নিয়মিত কলা খেলে দুর্বলতা দূর হয়। এছাড়া কলা দুধ ও মধু সহযোগী খেলে দুর্বলতা দূর হয়ে থাকে।

কলা ছাড়াও এর ফুল (মোচা), থোড় (ভেতরের নরম কাণ্ড) এবং পাতাতেও অসাধারণ ওষধি গুণ রয়েছে। রোগ প্রতিরোধে কলার বিভিন্ন অংশের ব্যবহার ও কার্যকরী ঘরোয়া কিছু উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:

কলার মোচা (কলার ফুল)

কলার মোচায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং আয়রন থাকে যা ভিন্নভাবে আমাদেরকে উপকার করে থাকে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: 

মোচার নির্যাস রক্তেতে শর্করার মাত্রা বা ব্লাড সুগার কমাতে সাহায্য করে। মোচা সেদ্ধ করে হালকা মশলা দিয়ে রান্না করে খেলে খুবই উপকার পাওয়া যায়।

ঋতুস্রাবের ব্যথা (ঘরোয়া টোটকা): 

পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ব্যথা হলে কলার মোচা এই সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে। কলার মোচা সেদ্ধ করে টক দইয়ের সাথে খেলে শরীরের মধ্যে প্রোজেস্টেরন হরমোন বাড়ে। এতে এই কষ্ট উপশম হয়ে থাকে।

কলার থোড় বা মজ্জা

থোড় বা কলার ভেতরের কাণ্ডতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম এবং ফাইবার থাকে, যা শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার করে থাকে।

ডিটক্সিফিকেশন ও কিডনির পাথর

থোড়ের রস হলো প্রাকৃতিক ডাইইউরেটিক, যা প্রস্রাবের বেগ বাড়াতে এবং কিডনি পরিষ্কার রাখতে সহায়ক। কিডনিতে পাথর পড়লে এটি কিডনির ছোট পাথর গলাতেও সাহায্য করে থাকে। 

ওজন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ : 

ওজনের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা যাদের রয়েছে তাদের জন্য কলার থোর খুব উপকারী। থোড়ের মধ্যে থাকা হাই-ফাইবার ওজন কমাতে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে অত্যন্ত কার্যকরী।

ডিটক্স ড্রিংক (ঘরোয়া টোটকা) : 

কাঁচা থোড় ভালো করে পিষে থোড়ের রস ছেঁকে নিন।  ওই রসের সঙ্গে সামান্য লেবুর রস ও লবণ মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খেলে তা পেট পরিষ্কার করে এবং শরীর ডিটক্স করে।

কাঁচা কলা 

পেটের গোলযোগ ও ডায়রিয়া: 

ডায়রিয়া রোগে কাঁচা কলা চমৎকারভাবে উপকার করে থাকে। কাঁচা কলা সেদ্ধ করে নিয়ে ভাতের সাথে  খেলে ডায়রিয়া ও আমাশয় দ্রুত ভালো হয়। কাঁচা কলার ঝোল খেলে ও ডায়রিয়া ও আমাশয় ভালো হয়ে থাকে। এটি অন্ত্রের ভেতরের দেয়াল কে সুরক্ষিত রাখতে খুবই কার্যকরী।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *