খেজুর: মরুভূমির মিষ্টি আশীর্বাদ এবং পুষ্টিগুনে ভরপুর ফল।
খেজুর এমন একটি ফল আমরা খুবই সহজেই পেয়ে থাকি। আমাদের ভারতবর্ষে প্রায় সর্বত্র জায়গাতেই কমবেশি খেজুর উৎপাদন হয়ে থাকে। বল্ক, আরব, মিশর, প্রভৃতি পশ্চিমী অঞ্চলে আকারে বড় খেজুর উৎপাদন হয়ে থাকে যা বিশ্বে দারুণভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এটিকে মরুভূমির সোনালি মধু বললেও চলে কারণ মরুভূমির প্রচন্ড গরমে যেখানে জলের অভাবে অন্য কোন গাছ জন্মায় না সেখানে এমন একটি ফলের গাছ জন্মায়। খেজুর পেতে যাওয়ার পরে হালকা শুকিয়ে যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত জমিয়ে রেখে খাওয়া যায়। এটি একটি ছোট্ট বাদামি ফল, বাইরে সামান্য কুঁচকানো, কিন্তু এর ভেতরে যেন জমে থাকে গাঢ় মধুর রস, ক্যারামেলের নরম কোমলতা এবং প্রকৃতির শক্তি। খেজুর হলো প্রকৃতির দেওয়া এক জাদুকরি উপহার। একটি কামড়ে মুখে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয় মুগ্ধ করা স্বর্গীয় স্বাদ। এটি মোলায়েম মিষ্টি, মুহূর্তেই শরীরের শক্তি জাগায়, আর মনে দেয় তৃপ্তি। শুধু মাত্র স্বাদেই নয়, খেজুর হল “প্রাকৃতিক এনার্জি প্যাকেট”।
আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে খেজুর সুপারফুডের মর্যাদা পেয়েছে। USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা ও শুকনো খেজুরে থাকা উপাদান এর পরিমাণ এবং উপাদানগুলি দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারে সাজানো হলো :
- জলীয় অংশ : প্রায় 15-21 গ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 75–80 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 25%)
- মোট চিনি : প্রায় 63 গ্রাম
- খাদ্যআঁশ (ফাইবার): প্রায় 7-8 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 27%)
- প্রোটিন : প্রায় 2-2.5 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4%)
- ফ্যাট বা চর্বি (অল্প পরিমাণ) : মাত্র 0.2-0.5 গ্রাম
খনিজ পদার্থ
- পটাশিয়াম : প্রায় 657 – 864 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 20%)
- ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 43 – 90 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 14%)
- ক্যালসিয়াম : প্রায় 39-68 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 6%)
- ফসফরাস : প্রায় 62 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 6%)
- আয়রন ( লোহা ) : প্রায় 0.9 – 1.5 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 5%)
- জিঙ্ক : প্রায় 0.44 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 4%)
- কপার: প্রায় 0.36 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 18% যা অত্যন্ত সমৃদ্ধ)
- ম্যাঙ্গানিজ: প্রায় 0.30 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 15%)
- সেলেনিয়াম: প্রায় 0.7 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 1%)
ভিটামিনসমূহ
- ভিটামিন B3 ( নিয়াসিন ) : প্রায় 1.6 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 10%)
- ভিটামিন B5 ( প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড ) : প্রায় 0.8 মিলিগ্রাম
(দৈনিক চাহিদার 12%) - ভিটামিন B6 ( পাইরিডক্সিন ) : প্রায় 0.2 মিলিগ্রাম
(দৈনিক চাহিদার 12%) - ভিটামিন B2 ( রিবোফ্লাভিন ) : প্রায় 0.06 মিলিগ্রাম
(দৈনিক চাহিদার 5%) - ভিটামিন B1 ( থায়ামিন ) : প্রায় 0.05 মিলিগ্রাম
(দৈনিক চাহিদার 4% ) - ভিটামিন A : প্রায় 10 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 3%)
- ভিটামিন K : প্রায় 2.7 মাইক্রোগ্রাম
(দৈনিক চাহিদার 3%) - ভিটামিন B9 : প্রায় 1.5 মাইক্রোগ্রাম
(দৈনিক চাহিদার 5%) - ভিটামিন C: অত্যন্ত সামান্য
খেজুরের মধ্যে থাকা মূল রাসায়নিক উপাদান গুলি হলো
- গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ প্রভৃতি ন্যাচারাল সুগার বা প্রাকৃতিক চিনি থাকে। এগুলো দ্রুত শক্তির জোগান দেয়।
- খেজুরে ফ্লাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড, ফেনোলিক অ্যাসিড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। যা শরীরের কোষকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার:
এটি প্রকৃতির এক অমৃত ফল। বলা যায় যে খেজুর কেবলমাত্র একটি সুস্বাদু এবং মিষ্টি ফলই নয়, এটি একদিকে শক্তি, পুষ্টি এবং রোগ নিরাময়ের এক অনন্য ভাণ্ডার। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের তথ্য থেকে শুরু করে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সবখানেই খেজুরের ঔষধি গুণ এবং শারীরিক উপকারিতার বর্ণনা পাওয়া যায়। আয়ুর্বেদের ভাষায় এটি একটি অনন্য “ওজঃবর্ধক ” খাদ্য। এটি ফ্যাট ও কোলেস্টেরল–মুক্ত। এই ফলটি কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম ও ফাইবারের চমৎকার উৎস। অন্যদিকে এটি শরীরের বাত ও পিত্ত দোষ নাশ করে। জীবনী শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। কৃত্রিম চিনি বা ক্ষতিকর এনার্জি ড্রিংকসের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে যদি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাত্র ৪ থেকে ৫ টি খেজুর অন্তর্ভুক্ত করা যায় আমরা খুব সহজেই দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা লাভ করতে ও শরীরে কর্মক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে পারি।