টমেটো: একটি পুষ্টিকর ফল

টম্যাটো এর উজ্জ্বল লাল রং, মসৃণ ত্বক এবং রসালো গঠন আমাদেরকে আকর্ষিত করে থাকে। কাকা টমেটো সরাসরি খাওয়া যায় আবার রান্নাঘরের সবচেয়ে পরিচিত সবজিগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম সবজি হলো টমেটো। উদ্ভিদবিজ্ঞানে টমেটো ফলের তালিকা ভুক্ত হলেও সারা পৃথিবীতে এটি সবজি হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়। সালাদ, স্যুপ, সস, চাটনি, তরকারি, আচার, জুস—প্রায় প্রতিটি খাদ্যতালিকায় টমেটোর উপস্থিতি এগুলিকে আরো সুস্বাদু করে তোলে।

গরম ভাতের সঙ্গে টমেটোর চাটনি, স্যান্ডউইচে টমেটোর স্লাইস, পাস্তার সসে টমেটোর গভীর স্বাদ কিংবা সালাদের সতেজতায় ভরা স্বাদ—সব ক্ষেত্রেই টমেটো খাদ্যকে আরও সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় করে তোলে। টমেটোর টক-মিষ্টি মিশ্রিত স্বাদ জিভে জল এনে দেয়। এর রসালো অংশ মুখে দিলেই এক ধরনের সতেজ অনুভূতি সৃষ্টি হয়, যা ক্ষুধা বাড়াতে সাহায্য করে।

কিন্তু টমেটোর আসল মূল্য শুধু স্বাদে নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য পুষ্টি উপাদান, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

টমেটোর পরিচয়

টমেটো এর বৈজ্ঞানিক নাম হল Solanum lycopersicum। এটি Solanaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি ফল বা সবজি।

টমেটোর উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ আমেরিকা হলেও পরে এটি মেক্সিকো হয়ে ইউরোপে পৌঁছায় এবং ধীরে ধীরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম টমেটো উৎপাদনকরি দেশগুলি হলো ভারত, চীন, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং মিশর। পাকা টমেটোর উজ্জ্বল লাল রং আমাদের চোখকে আকৃষ্ট করে, তার সঙ্গে এর টক ও মিষ্টির মিশ্রিত স্বাদ ক্ষুধা বৃদ্ধি করে এবং জিভকে আনন্দ দেয়। যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খাদ্যে পরিণত করেছে।

টমেটোর পুষ্টিগুণ

টমেটো তে জলীয় অংশ সব থেকে বেশি, তাই এটি  হাইড্রেশন দেয় ও শরীর ঠান্ডা রাখে। USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা টমেটোতে প্রায় যে পরিমাণ পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারে তালিকা দেয়া হলো। 

উপাদান পরিমাণ

টমেটো তে শতকরা 94 ভাগই জল, তাই এতে প্রোটিন ও ফ্যাটের পরিমাণ খুবই কম থাকে

  • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 3.9 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)
  • খাদ্যআঁশ (ফাইবার) :  প্রায় 1.2 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার পূরণ: 4%)
  • প্রোটিন : প্রায় 0.9 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)
  • ফ্যাট বা চর্বি : প্রায় 0.2 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.26%
  • ক্যালরি: মাত্র 18 কিলোক্যালরি। 

ভিটামিন ও খনিজ উপাদান 

  • ভিটামিন C : প্রায় 13.7 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 15%)
  • ভিটামিন K :  প্রায় 7.9 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7%)
  • পটাশিয়াম :  প্রায় 237 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5%)
  • ভিটামিন B6 (পাইরিডক্সিন) : প্রায় 0.08 মিলিগ্রাম 
  • (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5%)
  • ভিটামিন A (বিটা-ক্যারোটিন) : প্রায় 42 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5%)
  • ভিটামিন B9 (ফোলেট) : প্রায় 15 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4%)
  • ম্যাগনেশিয়াম : প্রায় 11 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 3%)
  • ফসফরাস : প্রায় 24 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
  • আয়রন (লোহা) : প্রায় 0.27 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5%)
  • ক্যালসিয়াম : প্রায় 10 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)

বিশেষ জৈব যৌগ

টমেটোর মধ্যে  যে সমস্ত জৈব যৌগ থাকে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান ও বিশেষ জৈব যৌগটি হলো লাইকোপেন । এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, এবং এটি ক্যারোটিনয়েড গোত্রের যৌগ, যার জন্য পাকা টমেটোর রং উজ্জ্বল লাল।

 এছাড়াও টমেটোতে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জৈব যৌগ ও প্রাকৃতিক অ্যাসিড থাকে। 

ক্যারোটিনয়েডস 

টমেটোতে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হলো এই গ্রুপের উপাদানগুলো

লাইকোপিন : 

     এটি টমেটোর মধ্যে থাকা অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রধান জৈব যৌগ। যা পাকা টমেটোর গাঢ় লাল রঙের জন্য দায়ী। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং প্রোস্টেট ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে অত্যন্ত কার্যকরী। কিন্তু একটি মজার বিষয় হলো, কাঁচা টমেটোর চেয়ে রান্না করা বা প্রসেসড টমেটোতে থাকা লাইকোপিন শরীর খুব সহজে বেশি শোষণ করতে পারে। 

বিটা-ক্যারোটিন : 

    এটি শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়ে থাকে, যা আমদের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে এবং চোখের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

লিউটিন এবং জেক্সানথিন :

এই যৌগগুলো চোখের রেটিনাকে ভালো রাখে। 

জৈব অ্যাসিড 

টমেটোর চমৎকার টক-মিষ্টি স্বাদের পেছনে দুটি জৈব অ্যাসিড প্রধান ভূমিকা পালন করে 

সাইট্রিক অ্যাসিড :

এটি টমেটোর মধ্যে থাকা প্রধান অ্যাসিড, যা টমেটোকে অম্লীয় বা টক স্বাদ প্রদান করে।

ম্যালিক অ্যাসিড :

সাইট্রিক অ্যাসিডের পাশাপাশি ম্যালিক অ্যাসিড ও টমেটোর স্বাদ নিয়ন্ত্রণে  ভূমিকা রাখে। 

ফেনোলিক যৌগ ও ফ্ল্যাভোনয়েড 

এগুলো উদ্ভিদের সেকেন্ডারি মেটাবোলাইট যা আমাদের শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে থাকে।

কোয়েরসেটিন ও কেমফেরল : 

    এই ফ্ল্যাভোনয়েডগুলো প্রদাহনাশক হয়ে থাকে, এবং উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।

নারিনজেনিন : 

   এটি সাধারণত টমেটোর খোসায় পাওয়া যায়, যা রক্তনালীর প্রদাহ দূর করতে সাহায্য করে থাকে।

ক্যাফেইক অ্যাসিড ও ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড:

ক্যাফেইক অ্যাসিড ও ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড হল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি ফেনোলিক অ্যাসিড। 

গ্লাইকোঅ্যালকালয়েড 

টোমাটিন : 

    কাঁচা বা সবুজ টমেটো এবং টমেটো গাছের পাতায় টোমাটিন বেশি থাকে। এটি উদ্ভিদের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক উপাদান যা ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে গাছকে রক্ষা করে। মানুষের জন্যও এটি অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল ও ইমিউন বুস্টার হিসেবে কাজ করে। টমেটো পাকার সাথে সাথে এর পরিমাণ ক্রমশ কমে যায়। 

Leave a Comment