আপেল: রস, স্বাদ, পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের এক অনন্য উপহার, কেন খাবেন?

Written by

in

আমরা সকলেই আপেলের সঙ্গে খুব ভালোভাবে পরিচিত আমরা অনেকেই আপেল সম্পর্কে জানি তবে কিছু তথ্য অজানাও থাকতে পারে। আমরা সকলেই আমাদের পরিচিত কোন কিছু সম্পর্কে। সামান্য তথ্য যদি অজানা থাকে তা জানার জন্য কৌতহলি হেও হয়ে উঠি। আজ আমরা আপেল নিয়ে আলোচনা করব ।

 আপেল খায়নি কিংবা আপেলের স্বাদ গ্রহণ করেনি এমন কেউ হয়তো আমাদের মধ্যে নেই। আচ্ছা, আমরা আমাদের স্মৃতির সেই সময়ে পৌঁছে যাই যখন আমরা আপেল খেয়েছিলাম। আর কল্পনা করুন , ভোরের কোমল আলোয় শিশিরভেজা একটি টুকটুকে লাল আপেল হাতে তুলে নিলাম। আপেলে একটি কামড় মারার সঙ্গে সঙ্গেই  কচকচে রসালো  হালকা মিষ্টি, সামান্য টক,  মুখে  মধ্যে যেন মুগ্ধ ময় স্বাদ ও সতেজতার এক ঢেউ সারাটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। আপেল কে শুধু একটি ফল বললে চলে না ; এটি প্রকৃতির দান করা এমন এক পুষ্টির ভাণ্ডার, যা স্বাদ, সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য— সবকিছুর অপূর্ব সমন্বয়।

প্রাচীনকাল থেকেই আপেলকে সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইংরেজি একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে— “An apple a day keeps the doctor away”, অর্থাৎ প্রতিদিন একটি আপেল ডাক্তারকে দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

আপেলের পরিচয়

আপেল কে আমরা আপেল নামেই চিনি। কোন এক সময়ে পাঠ্যপুস্তকে পড়া আপেলের  বৈজ্ঞানিক নাম Malus domestica ভুলে গেছিলাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতের আপেল চাষ হলেও ভারতের কাশ্মীর প্রদেশের আপেল জগৎবিখ্যাত। এই আপেলে টক রস একেবারেই থাকে না অন্যান্য দেশের আপেলে টক রস থাকে। এই আপেল অন্যান্য প্রজাতির আপেলের তুলনায় বেশি দামে বাজারে বিক্রি হয়।

আপেলের জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • Fuji Gala প্রজাতি
  • Red Delicious প্রজাতি
  • Honeycrisp প্রজাতি
  • Granny Smith প্রজাতি
  • ইত্যাদি 

আপেলের পুষ্টিগুণ

আপেলের মধ্যে ক্যালরির পরিমাণ 52 ক্যালোরি। প্রতি ১০০ গ্রাম খোসাসহ আপেলের মধ্যে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলো সর্বোচ্চ মাত্রা থেকে সর্বনিম্ন মাত্রার ক্রমানুসারে সাজিয়ে দেওয়া হলো :

  সামষ্টিক উপাদান ( ম্যাক্রো- নিউট্রিয়েন্টস ) : গ্রাম ( g ) এককে

সামষ্টিক উপাদানের মধ্যে জল এবং কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে।  

  • জল ( Water ) :  85.56 গ্রাম ( সর্বোচ্চ উপাদান )
  • কার্বোহাইড্রেট ( Carbohydrates ) : 13.81 গ্রাম    
  • টোটাল সুগার/ শর্করা : 10.39 গ্রাম 
  • ডায়েটারি ফাইবার/ আঁশ : 2.4 গ্রাম
  • প্রোটিন ( Protein ) : 0.26 গ্রাম
  • ফ্যাট বা চর্বি ( Total Lipid/ Fat ) : 0.17 গ্রাম ( সর্বনিম্ন সামষ্টিক উপাদান )

মিনারেলস বা খনিজ পদার্থ : মিলিগ্রাম ( mg )

 এককেশরীরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজগুলোর মধ্যে পটাসিয়ামের পরিমাণ আপেলে সবচেয়ে বেশি থাকে।

  • পটাসিয়াম ( Potassium ) : 107 মিলি গ্রাম  
  • ফসফরাস ( Phosphorus ) : 11 মিলিগ্রাম 
  • ক্যালসিয়াম ( Calcium ) : 6 মিলিগ্রাম 
  • ম্যাগনেসিয়াম ( Magnesium ) : 5 মিলি গ্রাম 
  • সোডিয়াম ( Sodium ) : 1 মিলি গ্রাম 
  • আয়রন ( Iron ) : 0.12 মিলি গ্রাম 
  • জিঙ্ক ( Zinc ) : 0.04 মিলি গ্রাম

ভিটামিনসমূহ : মিলি গ্রাম ( mg ) ও মাইক্রোগ্রাম ( µg ) এককে

ভিটামিনের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে। (নোট: ১ মিলিগ্রাম = ১০০০ মাইক্রোগ্রাম)।

  • ভিটামিন সি ( Vitamin C ) : 4.6 মিলি গ্রাম (সর্বোচ্চ ভিটামিন)
  • ভিটামিন ই ( Vitamin E ) : 0.18 মিলি গ্রাম 
  • ভিটামিন বি3 / নায়াসিন ( Niacin ) : 0.09 মিলিগ্রামভিটামিন বি6 ( Pyridoxine ) : 0.04 মিলি গ্রাম 
  • ভিটামিন বি2 / রিবোফ্লাবিন ( Riboflavin ) : 0.03 মিলি গ্রাম 
  • ভিটামিন বি1 / থায়ামিন ( Thiamin ) : 0.02 মিলি গ্রাম
  • ভিটামিন কে ( Vitamin K ) : 2.2 মাইক্রো গ্রাম ( µg ) 
  • ভিটামিন বি9 / ফোলেট ( Folate ) : 3 মাইক্রো গ্রাম ( µg ) 
  • ভিটামিন এ ( Vitamin A ) : 3 মাইক্রো গ্রাম ( µg )  

এতে রয়েছে :

  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
  • কোয়ারসেটিন
  • পলিফেনল
  • ফ্ল্যাভোনয়েড
  • পেকটিন
  • ক্যাটেচিন
  • ইত্যাদি

আপেলের স্বাদ এত আকর্ষণীয় কেন?

আপেলের মধ্যে প্রাকৃতিক ফ্রুক্টোজ থাকে যার থেকে  মিষ্টতা আসে। এর সঙ্গে হালকা অম্লীয় স্বাদ, যা জিভে এক মুগ্ধতা পূর্ণ অনুভূতি সৃষ্টি করে। কচকচে গঠন, রসালো শাঁস এবং মিষ্টি সুবাস এই সমস্ত গুণ আপেলকে পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আয়ুর্বেদে আপেলের গুরুত্ব

প্রাচীন আয়ুর্বেদে আপেলকে শক্তিবর্ধক, রক্ত শোধনকারী ও হজমশক্তি উন্নতকারী ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে ।

আয়ুর্বেদ মতে আপেল:

শরীরকে শীতল রাখতে, পিত্ত দোষ নিয়ন্ত্রণে, রক্ত পরিষ্কার রাখতে, শক্তি ও প্রাণশক্তি বৃদ্ধিতে, অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করতে, আমাশয় এবং পেটের রোগে, রক্তাল্পতা, প্রবাল জ্বর, দুর্বলতা, মানসিক নিরাশা, আর্থাইটিস প্রভৃতি রোগে উপকার করে।

এছাড়াও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে আপেলের উপকারিতা রয়েছে।

আপেল সম্পর্কে চমৎকার কিছু তথ্য

🍎 আপেলে প্রায় 25% বাতাস থাকার জন্য এটি জলে ভেসে থাকে।

🍎 সারা বিশ্বে আপেলের প্রজাতির সংখ্যা 7000 এর ও বেশি।

🍎 আপেল গাছ রোপনের পর ফলন পেতে সময় লাগে  সাধারণত ৪–৫ বছর।

🍎 আপেল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া ফলগুলোর মধ্যে একটি।

উপসংহার

আপেল হলো এমন একটি ফল যা স্বাদ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যরক্ষার ক্ষেত্রে এর উপকারিতা অসাধারণ। এর মিষ্টি-টক রসালো ভাব যেমন আমাদেরকে স্বাদের আনন্দ দিয়ে থেকে, তেমনি এতে থাকা আঁশ, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে থাকে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক সুস্থতায় আপেল এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে অবশ্যই মনে রাখবেন , আপেল কোনো রোগের একক চিকিৎসা নয়। এটি একটি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য, যা সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে উপকার দেয়। 🍎 ✨

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *