আতা (শরিফা বা সীতাফল) — প্রকৃতির মিষ্টি উপহার
আমাদের কাছে আতা ফল খুবই পরিচিত একটি ফল। হিন্দিতে এটি সীতাফল বা শরিফা নামে পরিচিত। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এটি এমন একটি সুস্বাদু ফল যাকে দেখা মাত্রই জিভে জল এসে যায়। এটি সবুজ খসখসে খোলস যুক্ত হয়ে থাকে, আর এই খোলসের ভিতরে থাকে দুধের সরের মতো নরম, সুগন্ধি ও মধুর স্বাদের শাঁস যা খুবই সুস্বাদু। এই ফলের বীজ এবং মাঝের শিরাটি বিষাক্ত। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ এর দ্বারা সুপ তৈরি করা হয়। আমেরিকাতেও এর মিষ্টি স্বাদের সুপ তৈরি করা হয়। আতা গাছের কাঠ থেকে কর্ক তৈরি করা হয়। এর দ্বারা জলীয় তৈরি করা হয়। এই ফল ক্লান্তি নাশক এবং তাপ অপহারক। আতা শক্তি ও ক্যালোরির সেরা উৎসগুলির একটি। পাকা আতার সুগন্ধ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পাকা আতার সুগন্ধ নাকে এলে এর লোভ থেকে বাঁচা সহজ নয়। এর মিষ্টি সুস্বাদু স্বাদ, মাখনের মতো নরম গঠন এবং এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ একে ফলের জগতে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
আতা আমাদের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত হলেও এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Annona squamosa। এটি উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়া অঞ্চলে প্রচুর জন্মায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সেই পুরনো শতাব্দি থেকে খাদ্য ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে আতা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
USDA এবং পুষ্টি বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আতার প্রধান পুষ্টি উপাদানগুলো– ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট, খনিজ, ভিটামিন ইত্যাদি এবং এগুলি দৈনিক চাহিদার কতটুকু পূরণ করতে পারে ক্রমানুসারে নিম্নে দেওয়া হলো:
উপাদান পরিমাণ
- জল : প্রায় ৭১.৫–৭৫ গ্রাম
- কার্বোহাইড্রেট : প্রায় ২৩–২৫.২ গ্রাম (৯% থেকে ১৯% পূরণ করে)
- প্রাকৃতিক চিনি : প্রায় ১৮–২০ গ্রাম (২১% পূরণ করে)
- খাদ্য আঁশ (ফাইবার) : প্রায় ২.৪–৫ গ্রাম (৯% পূরণ করে)
- প্রোটিন : প্রায় ১.৫–২.৫ গ্রাম (৩% থেকে ৪% পূরণ করে)
- ফ্যাট : প্রায় ০.৪–০.৭ গ্রাম (১% পূরণ করে)
খনিজ পদার্থ
- পটাশিয়াম : প্রায় ২৪০–৩৮২ মিলিগ্রাম (৮% পূরণ করে)
- ক্যালসিয়াম : প্রায় ২০–৩০ মিলিগ্রাম (২% পূরণ করে)
- ফসফরাস : প্রায় ২০–২৫ মিলিগ্রাম. (২% পূরণ করে)
- ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় ১৮–২২ মিলিগ্রাম (৪% থেকে ৫% পূরণ করে)
- আয়রন : প্রায় ০.৫–১.০ মিলিগ্রাম. (৪% পূরণ করে)
- সোডিয়াম : প্রায় ৪–১০ মিলিগ্রাম. (অতি সামান্য)
ভিটামিন সমূহ
- ভিটামিন C : প্রায় ১৫–২০ মিলিগ্রাম (২১% পূরণ করে)
- ভিটামিন B6 : প্রায় ০.১৫–০.২৫ মিলিগ্রাম (১৩% থেকে ১৫% পূরণ করে)
- ভিটামিন B3 : প্রায় ০.৯ মিলিগ্রাম (৬% পূরণ করে)
- ভিটামিন B1 : প্রায় ০.০৮–০.১২ মিলিগ্রাম. (৯% পূরণ করে)
- ভিটামিন B2 : প্রায় ০.০৫–০.১১ মিলিগ্রাম (৮% পূরণ করে)
- ভিটামিন B9 : প্রায় ১৪ মাইক্রোগ্রাম (৪% পূরণ করে)
- ভিটামিন A : প্রায় ২ মাইক্রোগ্রাম (খুবই সামান্য পরিমাণ)
আতার মাঝের শিরাটি এবং বীজ খাওয়া উচিত নয় কেন?
কারণ :
আতার বীজে বিষাক্ত উপাদান থাকে। ফলে বমি, পেটব্যথা, স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে।
আতার বীজ বা বীজের গুড়ো চোখে গেলে মারাত্মক জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।
আতার মাঝের শিরাটি বিষাক্ত তাই এটিও কোন প্রকারে খাওয়া উচিত নয়।
এছাড়া আতা গাছের পাতাও খুবই বিষাক্ত হয়ে থাকে।
আতা খাওয়ার সময় সতর্ক থাকবেন কারা?
ডায়াবেটিস রোগীদের অতিরিক্ত আতা খাওয়া ঠিক নয়। আতায় প্রাকৃতিক চিনি থাকে। তাই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে খাওয়া উচিত।
অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত আঠা খেলে ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে। কারণ আতাতে ক্যালোরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাই সীমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো।
কিডনি রোগীরা পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রিত খাদ্য খেয়ে থাকলে আতা খাওয়ার ইচ্ছা হলে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
উপসংহার
আতা শুধু যে একটি সুগন্ধি সুস্বাদু ফল তা নয়, এটি হলো শক্তি, ভিটামিন, খনিজ, আঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সমৃদ্ধ পুষ্টির ভাণ্ডার। এর সুগন্ধি, মিষ্টি, মাখনের মতো নরম শাঁস শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবার মন জয় করে নেয়। আয়ুর্বেদে এটি শক্তি দায়ক, পুষ্টিকর ও দেহপোষক ফলের মধ্যে একটি। তবে এর বীজ কখনো খাওয়া উচিত নয় এবং এতে মিষ্টি থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের কে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। সঠিকভাবে পরিমিত পরিমাণে আতা খেলে, আতার মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদান শরীরকে বিভিন্নভাবে উপকার করে।।
ribhat