আতা (শরিফা বা সীতাফল): রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ঘরোয়া উপাচার

আতা একটি অত্যন্ত সুস্বাদু, মিষ্টি ও পুষ্টিতে ভরপুর ফল।এটি সাধারণত গ্রীষ্মকালে হয়ে থাকে। এটি আমাদের দেশে অত্যন্ত পরিচিত এবং পছন্দ কর একটি ফল। এর চমৎকার পুষ্টিগুণের জন্য এটি স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। আতা ফল ছাড়াও এর দানা, পাতা এবং ছাল আমাদের শরীরের স্বাস্থ্য সমস্যায় ও রোগ প্রতিরোধে  ঘরোয়া উপাচার হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

আতা ফল এবং এর বিভিন্ন অংশের ঘরোয়া উপাচার

আতা গাছের ফল, পাতা, বীজ এবং ছাল সবকিছুই বিভিন্ন উপায়ে ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যবহার করা

 উকুন ও খুশকি দূর করতে : 

আতার বীজ পরিষ্কার করে ধুয়ে, শুকিয়ে ভালো করে গুঁড়ো করে নিন। এই গুঁড়োর সাথে সামান্য নারকেল তেল (অভাবে জল) মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন।  

ব্যবহার: পেস্টটি মাথায় চুলের গোড়ায় ভালো করে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট  রাখার পর ধুয়ে ফেলুন। এটি মাথার উকুন ও খুশকি দ্রুত দূর করতে খুবই কার্যকরী। 

সতর্কতা:– আতার বীজ খুবই বিষাক্ত। তাই এটি ব্যবহারের সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন পেস্টটি যেন কোনোভাবেই চোখে না লাগে। চোখে লাগলে তীব্র জ্বালাপোড়া হতে পারে।

ফোড়া পাকাতে ও ঘা শুকাতে : 

আতা গাছের টাটকা পাতা পরিষ্কার করে ধুয়ে বেটে নিন।

ব্যবহার: ফোড়া বা কোনো ঘা তাড়াতাড়ি পাকাতে কিংবা ভেতরের জমে থাকা পুঁজ বের করতে এই পাতার বাটা সামান্য লবণের সঙ্গে মিশিয়ে ফোড়া বা কোনো ঘা এর স্থানে প্রলেপ হিসেবে লাগান। এতে ব্যথা ও যন্ত্রণা কমে এবং দ্রুত উপশম হয়।

আমাশয় ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে : 

আতা গাছের ছাল অথবা কাঁচা আতা ফল পরিষ্কার করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে নিন।

ব্যবহার: এই গুঁড়ো সামান্য হালকা গরম জলের সাথে মিশিয়ে খেলে তা পেটের পুরনো আমাশয় এবং ডায়রিয়ার সমস্যা দূর করে। আতার ছাল পেটের ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে।

রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করতে : 

শরীরে রক্তের ঘাটতি দেখা দিলে বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ হ্রাস পেলে নিয়মিত পাকা আতা ফল খাওয়া খুবই উপকারী। এতে থাকা আয়রন রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি করে ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর করে। রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করতে সাহায্য করে।

বাতের ব্যথা বা জয়েন্টের উপশম : 

পরিষ্কার আতা পাতা বেটে পেস্ট তৈরি করে নিয়ে তা হালকা গরম করে নিন।

ব্যবহার: বাতের ব্যথা বা হাড়ের জয়েন্টের ব্যথার জায়গাতে এই হালকা গরম গরম পাতার পেস্ট এর প্রলেপ দিলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং ব্যথার তীব্রতা কমে আসে।

গর্ভবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায়:

আতা ফল গর্ভবতী নারীদের জন্য খুবই উপকারী বলে বিবেচিত হয়। এটি গর্ভাবস্থায় গর্ভপাতের ঝুঁকি কমাতে, ভ্রূণের বিকাশে, প্রসবকালীন ব্যথা কমাতে, এবং প্রসবের পর মায়ের স্তনদুগ্ধ বাড়াতে সাহায্য করে।

দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে: 

আতা ফলের মধ্যে  লুটেইন (Lutein) নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। এটি বয়সকালীন চোখের সমস্যা এবং ছানি পড়া প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে: 

আতার  মধ্যে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে।

ওজন বৃদ্ধিতে সহায়ক:

যাদের ওজন কম, তারা যদি  ১টি পাকা আতার শাঁস ১ গ্লাস দুধ এর সঙ্গে মিশিয়ে শরবত তৈরি করে পান করে শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পায় ও ওজন বেড়ে।

ত্বকের পরিচর্যায়

ফেসপ্যাক:  আতার শাঁস এর সাথে কাঁচা দুধ ও মধু মিশিয়ে মুখে ১৫ মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বক কোমল হয় ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়।

আতার মধ্যে থাকা মূল্যবান পাঁচটি উপাদান সমূহ

আতার সমস্ত উপাদানসমূহের মধ্যে প্রধান ৫টি উপাদান আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  বাড়াতে এবং রোগমুক্ত রাখতে সরাসরি কাজ করে থাকে, তা নিচে দেওয়া হলো:

ভিটামিন C (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড)— ভিটামিন সি প্রাথমিক ভাবেই আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এটি রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে থাকে। যা আমাদের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর যেকোনো ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। বাইরের ক্ষতিকর জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করে। এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

ভিটামিন B6 (পাইরিডক্সিন)— ভিটামিন বি৬ রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার রাসায়নিক সমতা বজায় রাখে। শরীরে সংক্রমণ বা রোগজীবাণু প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। আমাদের ইমিউন সিস্টেমের প্রধান যোদ্ধা ‘টি-সেল’ এর কার্যক্ষমতা সচল রাখতে এই ভিটামিন অত্যন্ত অপরিহার্য।

পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম — এই দুটি খনিজ উপাদান হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে এবং সামগ্র শরীরের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক রেখে পরোক্ষভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক চাপ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ুকে শান্ত করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে  মানসিক চাপ কমায়।  

খাদ্য আঁশ (ফাইবার)— আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রায় ৬০ – ৭০% নির্ভর করে আমাদের অন্ত্র বা পেটের স্বাস্থ্যের ওপর। আতার ফাইবার অন্ত্রের মধ্যে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো  কে শক্তিশালী করে তোলে। ফলে ক্ষতিকর জীবাণু পেটে সংক্রমণ ছড়াতে পারে না।

ফাইটোকেমিক্যালস (অ্যাসিটোজেনিন ও লুটেইন)— আতায় থাকা কিছু বিশেষ উদ্ভিজ্জ উপাদান সরাসরি রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে। এই উদ্ভিজ্জ উপাদান গুলি ‘অ্যাসিটোজেনিন’ শরীরে ক্ষতিকর ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল দূর করে শরীরকে ক্যান্সার প্রতিরোধী করে এবং লিভার বা ফুসফুসের কোষের অস্বাভাবিক ক্ষতি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

Leave a Comment