Blog

  • আপেল: রস, স্বাদ, পুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের এক অনন্য উপহার, কেন খাবেন?

    আমরা সকলেই আপেলের সঙ্গে খুব ভালোভাবে পরিচিত আমরা অনেকেই আপেল সম্পর্কে জানি তবে কিছু তথ্য অজানাও থাকতে পারে। আমরা সকলেই আমাদের পরিচিত কোন কিছু সম্পর্কে। সামান্য তথ্য যদি অজানা থাকে তা জানার জন্য কৌতহলি হেও হয়ে উঠি। আজ আমরা আপেল নিয়ে আলোচনা করব ।

     আপেল খায়নি কিংবা আপেলের স্বাদ গ্রহণ করেনি এমন কেউ হয়তো আমাদের মধ্যে নেই। আচ্ছা, আমরা আমাদের স্মৃতির সেই সময়ে পৌঁছে যাই যখন আমরা আপেল খেয়েছিলাম। আর কল্পনা করুন , ভোরের কোমল আলোয় শিশিরভেজা একটি টুকটুকে লাল আপেল হাতে তুলে নিলাম। আপেলে একটি কামড় মারার সঙ্গে সঙ্গেই  কচকচে রসালো  হালকা মিষ্টি, সামান্য টক,  মুখে  মধ্যে যেন মুগ্ধ ময় স্বাদ ও সতেজতার এক ঢেউ সারাটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। আপেল কে শুধু একটি ফল বললে চলে না ; এটি প্রকৃতির দান করা এমন এক পুষ্টির ভাণ্ডার, যা স্বাদ, সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য— সবকিছুর অপূর্ব সমন্বয়।

    প্রাচীনকাল থেকেই আপেলকে সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইংরেজি একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে— “An apple a day keeps the doctor away”, অর্থাৎ প্রতিদিন একটি আপেল ডাক্তারকে দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

    আপেলের পরিচয়

    আপেল কে আমরা আপেল নামেই চিনি। কোন এক সময়ে পাঠ্যপুস্তকে পড়া আপেলের  বৈজ্ঞানিক নাম Malus domestica ভুলে গেছিলাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতের আপেল চাষ হলেও ভারতের কাশ্মীর প্রদেশের আপেল জগৎবিখ্যাত। এই আপেলে টক রস একেবারেই থাকে না অন্যান্য দেশের আপেলে টক রস থাকে। এই আপেল অন্যান্য প্রজাতির আপেলের তুলনায় বেশি দামে বাজারে বিক্রি হয়।

    আপেলের জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে:

    • Fuji Gala প্রজাতি
    • Red Delicious প্রজাতি
    • Honeycrisp প্রজাতি
    • Granny Smith প্রজাতি
    • ইত্যাদি 

    আপেলের পুষ্টিগুণ

    আপেলের মধ্যে ক্যালরির পরিমাণ 52 ক্যালোরি। প্রতি ১০০ গ্রাম খোসাসহ আপেলের মধ্যে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলো সর্বোচ্চ মাত্রা থেকে সর্বনিম্ন মাত্রার ক্রমানুসারে সাজিয়ে দেওয়া হলো :

      সামষ্টিক উপাদান ( ম্যাক্রো- নিউট্রিয়েন্টস ) : গ্রাম ( g ) এককে

    সামষ্টিক উপাদানের মধ্যে জল এবং কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে।  

    • জল ( Water ) :  85.56 গ্রাম ( সর্বোচ্চ উপাদান )
    • কার্বোহাইড্রেট ( Carbohydrates ) : 13.81 গ্রাম    
    • টোটাল সুগার/ শর্করা : 10.39 গ্রাম 
    • ডায়েটারি ফাইবার/ আঁশ : 2.4 গ্রাম
    • প্রোটিন ( Protein ) : 0.26 গ্রাম
    • ফ্যাট বা চর্বি ( Total Lipid/ Fat ) : 0.17 গ্রাম ( সর্বনিম্ন সামষ্টিক উপাদান )

    মিনারেলস বা খনিজ পদার্থ : মিলিগ্রাম ( mg )

     এককেশরীরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজগুলোর মধ্যে পটাসিয়ামের পরিমাণ আপেলে সবচেয়ে বেশি থাকে।

    • পটাসিয়াম ( Potassium ) : 107 মিলি গ্রাম  
    • ফসফরাস ( Phosphorus ) : 11 মিলিগ্রাম 
    • ক্যালসিয়াম ( Calcium ) : 6 মিলিগ্রাম 
    • ম্যাগনেসিয়াম ( Magnesium ) : 5 মিলি গ্রাম 
    • সোডিয়াম ( Sodium ) : 1 মিলি গ্রাম 
    • আয়রন ( Iron ) : 0.12 মিলি গ্রাম 
    • জিঙ্ক ( Zinc ) : 0.04 মিলি গ্রাম

    ভিটামিনসমূহ : মিলি গ্রাম ( mg ) ও মাইক্রোগ্রাম ( µg ) এককে

    ভিটামিনের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে। (নোট: ১ মিলিগ্রাম = ১০০০ মাইক্রোগ্রাম)।

    • ভিটামিন সি ( Vitamin C ) : 4.6 মিলি গ্রাম (সর্বোচ্চ ভিটামিন)
    • ভিটামিন ই ( Vitamin E ) : 0.18 মিলি গ্রাম 
    • ভিটামিন বি3 / নায়াসিন ( Niacin ) : 0.09 মিলিগ্রামভিটামিন বি6 ( Pyridoxine ) : 0.04 মিলি গ্রাম 
    • ভিটামিন বি2 / রিবোফ্লাবিন ( Riboflavin ) : 0.03 মিলি গ্রাম 
    • ভিটামিন বি1 / থায়ামিন ( Thiamin ) : 0.02 মিলি গ্রাম
    • ভিটামিন কে ( Vitamin K ) : 2.2 মাইক্রো গ্রাম ( µg ) 
    • ভিটামিন বি9 / ফোলেট ( Folate ) : 3 মাইক্রো গ্রাম ( µg ) 
    • ভিটামিন এ ( Vitamin A ) : 3 মাইক্রো গ্রাম ( µg )  

    এতে রয়েছে :

    • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
    • কোয়ারসেটিন
    • পলিফেনল
    • ফ্ল্যাভোনয়েড
    • পেকটিন
    • ক্যাটেচিন
    • ইত্যাদি

    আপেলের স্বাদ এত আকর্ষণীয় কেন?

    আপেলের মধ্যে প্রাকৃতিক ফ্রুক্টোজ থাকে যার থেকে  মিষ্টতা আসে। এর সঙ্গে হালকা অম্লীয় স্বাদ, যা জিভে এক মুগ্ধতা পূর্ণ অনুভূতি সৃষ্টি করে। কচকচে গঠন, রসালো শাঁস এবং মিষ্টি সুবাস এই সমস্ত গুণ আপেলকে পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

    আয়ুর্বেদে আপেলের গুরুত্ব

    প্রাচীন আয়ুর্বেদে আপেলকে শক্তিবর্ধক, রক্ত শোধনকারী ও হজমশক্তি উন্নতকারী ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে ।

    আয়ুর্বেদ মতে আপেল:

    শরীরকে শীতল রাখতে, পিত্ত দোষ নিয়ন্ত্রণে, রক্ত পরিষ্কার রাখতে, শক্তি ও প্রাণশক্তি বৃদ্ধিতে, অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করতে, আমাশয় এবং পেটের রোগে, রক্তাল্পতা, প্রবাল জ্বর, দুর্বলতা, মানসিক নিরাশা, আর্থাইটিস প্রভৃতি রোগে উপকার করে।

    এছাড়াও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে আপেলের উপকারিতা রয়েছে।

    আপেল সম্পর্কে চমৎকার কিছু তথ্য

    🍎 আপেলে প্রায় 25% বাতাস থাকার জন্য এটি জলে ভেসে থাকে।

    🍎 সারা বিশ্বে আপেলের প্রজাতির সংখ্যা 7000 এর ও বেশি।

    🍎 আপেল গাছ রোপনের পর ফলন পেতে সময় লাগে  সাধারণত ৪–৫ বছর।

    🍎 আপেল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া ফলগুলোর মধ্যে একটি।

    উপসংহার

    আপেল হলো এমন একটি ফল যা স্বাদ, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যরক্ষার ক্ষেত্রে এর উপকারিতা অসাধারণ। এর মিষ্টি-টক রসালো ভাব যেমন আমাদেরকে স্বাদের আনন্দ দিয়ে থেকে, তেমনি এতে থাকা আঁশ, ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে থাকে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক সুস্থতায় আপেল এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

    তবে অবশ্যই মনে রাখবেন , আপেল কোনো রোগের একক চিকিৎসা নয়। এটি একটি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য, যা সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে উপকার দেয়। 🍎 ✨

  • আম : ঘরোয়া উপাচার ও রোগ প্রতিরোধে আমের উপকারিতা

    আমরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন সময়ে আম খেয়ে থাকি কিন্তু আপনার কি জানেন? যে আম দিয়েও বিভিন্ন রোগের ঘরোয়া উপাচার করা যায়? আম কিভাবে আমাদেরকে রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে ?

    প্রাচীন সংস্কৃতে আমকে অমৃত ফল ও বলা হয়ে থাকে । আমের মধ্যে ভিটামিন A, ভিটামিন C এবং ভিটামিন E , ভিটামিন K ইত্যাদি অধিক মাত্রায় থাকে।

    আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে শুধু ফল নয়, আমে গাছের পাতা, ছাল, আমের ছাল, বীজ এবং মুকুলও বিভিন্ন ভেষজ চিকিৎসা তে ব্যবহার করা হয় থেকে।

    ভিটামিন A সমৃদ্ধ হওয়ায় আম চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। যারা দৃষ্টিশক্তিহীন এবং যাদের রাতে ভালোভাবে দেখতে অসুবিধা হয় অর্থাৎ রাতকানা সমস্যায় ভুগছেন তারা যদি টাটকা আমের শরবত করে খান যথেষ্ট উপকার পাবেন। আম চোখের লালচে ভাব এবং চোখের মনির অস্পষ্টতা দূর করতে সাহায্য করে।

    আমে অধিক পরিমাণে ভিটামিন C থাকে যা আমাদের শরীরে শ্বেত রক্ত কণিকার বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে এবং ভিটামিন C এর অভাবজনিত যে সমস্ত রোগ দেখা যায় সেই সব রোগে খুবই উপকার দেয়। এছাড়া বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। সর্দি-কাশি ও সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরকে শক্তিশালী করে।

    মুখের দুর্গন্ধ, দাঁতের যন্ত্রণা ও মাড়ির ব্যথায় আম খুব উপকারী। যাদের হৃদরোগ আছে তারা নিয়মিত আম খেলে খুবই উপকার পাবেন। কারণ এতে পটাশিয়ামের মতো খনিজ এর মাত্রা ও যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে যা হৃৎপিণ্ডকে সবল ও সচল রাখতে সাহায্য করে।

    আমের আটি ও ছাল খুব উপকারী। যাদের পা ফাটে তারা আমের ছাল ভালোভাবে বেটে ফাটায় লাগালে উপকার পাবেন। আমের রসের সঙ্গে দই মিশিয়ে লস্যি করে খেলে শরীরে শক্তি বৃদ্ধি হয়ে থাকে। অধিক গরমে সূর্যের তাপ জনিত রোগের হাত থেকে রক্ষার জন্য আম পুড়িয়ে আম পোড়ার শরবত করে খেলে সানস্ট্রোক হয় না ।

    কানের রোগ

    টাটকা সবুজ আম পাতা কে বেটে তার রসটুকু আলাদা করে নিয়ে যদি কানে দেওয়া যায় তা কানের রোগ দূর করতে সাহায্য করে।

    ত্বকের পরিচর্যা

    ভিটামিন A, C ও E ত্বকের কোষকে পুষ্টি দেয়। ত্বক উজ্জ্বল ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে। বছরে তিন চার মাস যদি নিয়মিত পরিমাণ মতো আম খাওয়া যায় ত্বকের সাধারণ সৌন্দর্য ফিরে আসে। নিয়মিতভাবে যদি আমের শরবত খাওয়া যায় তা ত্বকের খসখসে শুকনো ভাব দূর করে।

    ব্লাড সুগার

    ব্লাড সুগার দেখা দিলে আম ও জামের রস সমান মাত্রায় নিয়ে একসঙ্গে মিশিয়ে প্রতিদিন সেবন করলে দশ থেকে বারো দিনের মধ্যে সুগারের মাত্রা কমে যায়। তবে এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে করতে হবে।

    কৃমি রোগ

    আম টুকরো টুকরো করে কেটে খেলে কৃমিনাশ হয়।

    দুর্বলতায়

    পুষ্টিদায়ক উপাদান হিসেবে আমকে প্রধান স্থান দেওয়া যায়। যাদের দুর্বল ও রোগা দেহ তারা নিয়মিত আম সেবন করলে শরীর সবল ও সতেজ হয়ে থাকে।

    লিঙ্গ জনিত দোষে

    লিঙ্গে যদি কোন রকম দোষ দেখা দেয় বা যৌন রোগ দেখা দিলে আমের পাতার সঙ্গে হলুদ বেটে ওই মিশ্রণ এর প্রলেপ লিঙ্গে মাখালে উপশম হয়।

    নপুংসকতায়

    আমের রস 7 থেকে 8 ফোঁটা জলের সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে তা নপুংসতা দূর করতে সাহায্য করে। আম ও দুধের শরবত করে খেলে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাই এটি খুবই শক্তিবর্ধক ও বলোকারোক।

    হৃদপিন্ডের দুর্বলতায়

    পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং হৃদযন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। মিষ্টি আমের রস এর সঙ্গে এক চা চামচ আদার রস মিশিয়ে পান করলে হৃৎপিণ্ড সতেজ ও সবল হয়।

    অজীর্ণ রোগে

    আমের রস পান করলে অজীর্ণতা দূর হয়। হজমশক্তি উন্নত করে। আমের মধ্যে থাকা খাদ্য আঁশ বা ফাইবার খাবার হজম করতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

    রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক

    আমে ফলেট ও কিছু পরিমাণ লৌহ উপাদান থাকে, যা রক্ত তৈরির প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে থাকে।

    ক্যান্সার প্রতিরোধে সম্ভাব্য ভূমিকা

    আমের মধ্যে থাকা ম্যাঙ্গিফেরিন, কোয়ারসেটিন ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এটা যদিও ক্যান্সারের চিকিৎসা নয় তবুও এই রোগে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে উপকারী।

    আমের পাতা ও বীজের আয়ুর্বেদিক ব্যবহার

    আমপাতা

    আয়ুর্বেদে আমপাতার নির্যাস বিভিন্ন ভেষজ ঔষধ প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। কিছু গবেষণা তে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহায়ক প্রভাব নিয়ে আলোচিত হয়েছে।

    আমের বীজ

    আমের বীজের শক্ত অংশের ভিতরের শাঁস শুকিয়ে গুড়ো করে ঐতিহ্যগত ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিছু কিছু অঞ্চলে এটি হজমজনিত সমস্যায় লোকজ চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

    তবে এই সমস্ত উপাচার চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত নয়।

  • আম এর পুষ্টিগুন, কেনো খাবেন

    আম:

    ফলের রাজা, স্বাদের অনন্য জাদু

    ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ফল হল আম। সংস্কৃতে একে অমৃত ফল ও বলা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন কৃত্রিম উপায়ে বিভিন্নভাবে বারোমাস আম চাষ হওয়ার জন্য বারোমাস আম পাওয়া যায় তবে তা কিছুটা দুর্লভ।

    বিশেষ করে গ্রীষ্মের প্রচন্ড রৌদ্রে যখন আমাদের চারপাশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে , তখন প্রকৃতি ও আমাদের জন্য জন্য এক সবুজ সোনালী হলুদ বিভিন্ন রঙের উপহার নিয়ে আসে যা হলো সাধের এক অনন্য জাদু আম। পাকা আমের মিষ্টি সুগন্ধে ভরে ওঠে গ্রামাঞ্চলের আমবাগান বাড়ি এবং গ্রাম ও শহরের বাজার এলাকা । এই সুবাস নাকে এলেই জিভে জল চলে আসে। রসালো, কোমল ও মধুর স্বাদের এই ফলকে শুধু ফল বলা যায় না; এটি ভারতীয়দের আবেগ, স্মৃতি এবং গ্রীষ্মের মাঝে এক আনন্দ। পাকা আমের রস জিভে স্পর্শ করালেই তার গন্ধ ও স্বাদ এবং মিষ্টতার সঙ্গে হালকা টক রস একসঙ্গে ইন্দ্রিয়কে মুগ্ধ করে, মনটাও প্রশান্ত হয়ে ওঠে । তাই সেই ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান সময়েও আমকে বলা হয়। “ফলের রাজা”।

    আমের পুষ্টিগুণ

    আম শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টির ভাণ্ডারও। নিচে প্রতি 100 গ্রাম কাঁচা ও পাকা আমের প্রধান পুষ্টি উপাদানগুলোর সঠিক ও পরিমাণভিত্তিক একটি তালিকা সহজ ও সরল ভাবে দেওয়া হলো:—

    ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্টস (প্রধান উপাদানসমূহ)

    • ক্যালোরি : 60 – 65 কিলো ক্যালোরি
    • জল : 83.46 gram
    • কার্বোহাইড্রেট ( শর্করা ) : 15 gram
    • চিনি (Natural sugar ) : 13.7 gram
    • আঁশ (Dietary fiber): 1.6 gram
    • প্রোটিন : 0.82 gram
    • ফ্যাট ( চর্বি ) : 0.38 gram

    ভিটামিনের পরিমাণ

    • ভিটামিন C : প্রায় 36.4 মিলি গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 40% থেকে 50% )
    • ভিটামিন A ( বিটা-ক্যারোটিন ) : প্রায় 54 মাইক্রো গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 6% )
    • ভিটামিন B-9 ( ফোলেট ) : প্রায় 43 মাইক্রো গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 11% )
    • ভিটামিন B-6 : প্রায় 0.12 মিলি গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 9.2% )
    • ভিটামিন E : প্রায় 0.9 মিলি গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 6% )
    • ভিটামিন K : প্রায় 4.2 মাইক্রো গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 3.5%)

    মিনারেলস বা খনিজ লবণ 

    • পটাশিয়াম : 168 মিলি গ্রাম
    • ক্যালসিয়াম : 11 মিলি গ্রাম
    • ম্যাগনেসিয়াম : 10 মিলি গ্রাম
    • ফসফরাস : 14 মিলি গ্রাম
    • আয়রন ( লোহা ) : 0.16 মিলি গ্রাম

    আয়ুর্বেদে আমের গুরুত্ব:

    ভারতীয় প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আম কে অত্যন্ত মূল্যবান খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।আয়ুর্বেদ মতে—

    পাকা আম খেলে শরীর শক্তিশালী হয়।

    আম রক্তবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের দুর্বলতা কমায়।

    জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। 

    ক্রনিক রোগ ও ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে। 

    পেটের রোগ ও বদ হজম দূরীকরণে সাহায্য করে।

    শুক্রধাতু ও ওজন বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

    হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে।

    আম খাওয়ার সঠিক উপায় :

    অতিরিক্ত না খেয়ে পরিমিত পরিমাণে খান।

    ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করুন।

    তাজা ও পাকা আম বেছে নিন।

    আম খাওয়ার সঙ্গে সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন

    উপসংহার:

    রসালো আম শুধু মাত্র জিভের তৃপ্তিই দেয় না, শরীরের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টির যোগান দেয়। পাকা আম এক কামড় মুখে দিলেই যেন গ্রীষ্মের সমস্ত আনন্দ মনে প্রাণে জেগে ওঠে। তার মিষ্টি সুবাস, রসালো শাঁস এবং পুষ্টিগুণ একে সত্যিই ফলেদের মধ্যে ফলের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্বাদের আনন্দ এর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, চোখের যত্ন, হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ও হজমশক্তি উন্নত করার মতো বহু উপকারিতার কারণে আম আমাদের কাছে প্রকৃতির দেওয়া এক অনন্য উপহার। 🍋🥭 (তার নিজস্ব মিষ্টি মহিমায়)।

  • আনারস ব্যবহার করে ঘরোয়া উপাচার ও রোগ প্রতিরোধে আনারসের উপকারিতা

    আনারস আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এবং পছন্দযুক্ত একটি ফল । এর পাতা কিছুটা মোটা হয়ে থাকে। গ্রীষ্ম প্রধান দেশে উষ্ণ এবং আদ্রতা যুক্ত আবহাওয়ায় এর চাষ খুব ভালো হয়। ভারতবর্ষেও এর চাষ প্রচুর পরিমাণে হয়ে থাকে । বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কেরালায় আনারসের চাষ খুব ভালো হয়। 

    আনারস বেশ সুস্বাদু এবং অরুচি নাশক। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল (Ananas comosus)।

    হৃদপিন্ডের দুর্বলতা নাশক ফল এতে ভিটামিন সি আয়রন খনিজ দ্রব্য আছে। বিরেচক রূপে এটি কাজ করে পেট পরিষ্কার করে থাকে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মত রোগ দূর করে থাকে। এটি একটি টনিকের নেয় পুনর্জীবন দাতা ও বলা চলে আনারসের রস গর্ভাশয়ের সংকোচন করে সেই জন্য গর্ভবতী নারীকে দেওয়া উচিত নয়। 

    আয়ুর্বেদ অনুযায়ী আনারস:

    • রুচিবর্ধক
    • হজম শক্তি বর্ধক 
    • কফনাশক
    • তৃষ্ণানাশক
    • মূত্রবর্ধক
    • শরীরের ক্লান্তি দূরকারী

    আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আনারসকে পিত্ত ও কফ দোষের ভারসাম্য রক্ষাতে সহায়ক বলে বিবেচনা করা হয়, তবে এর অতিরিক্ত সেবন পিত্ত বৃদ্ধি করতে পারে।

    আনারসের স্বাস্থ্য উপকারিতা

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

    ভিটামিন সি শরীরের শ্বেত রক্তকণিকার বৃদ্ধি করে এবং কার্যক্ষমতা বাড়ায়। ফলে ঠান্ডা লাগা সর্দি-কাশি ও সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীর আরো শক্তিশালী হয়।

    হজমশক্তি উন্নত করে

    খাওয়ার পরে আনারস খেলে আনারসের মধ্যে থাকা ব্রোমেলিন খাদ্যের কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন ভাঙতে সাহায্য করে থাকে এবং বদহজম কমায়।

    হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী

    আনারসের মধ্যে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়।

    হাড় মজবুত করে

    আনারসের মধ্যে থাকা ম্যাঙ্গানিজ হাড়ের গঠনে ও শক্তি বৃদ্ধিতে খুবই সহায়ক।

    ত্বক উজ্জ্বল রাখে

    আনারসের মধ্যে থাকা ভিটামিন সি কোলাজেন উৎপাদনে সাহায্য করে, যা ত্বকের তারুণ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

    চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা

    আনারসের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে থাকে।

    রোগ প্রতিকারের আনারসের ব্যবহার

    জ্বর: 

    আনারসের রস খেলে জ্বর উপশম হয় 

    পেটের রোগে :

    আনারসের রস খেলে পেটের রোগে অত্যন্ত উপকার পাওয়া যায়। 

    জন্ডিস :

    এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আনারসের রস খাওয়ালে খুব উপকার পাওয়া যায় 

    কোষ্ঠকাঠিন্য :

    কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিলে পাকা আনারসের টুকরো খেলে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। 

    সকালে খালি পেটে পরিমিত আনারস খান।  আনারসে থাকা ফাইবার অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

    গোলক্ষত :

       পাকা আনারসের রস গোলক্ষত রোগের পক্ষে খুব ভালো কাজ দেয়।

    ডিপথেরিয়া :

    ডিপথেরিয়া রোগের আশঙ্কা দেখা দিলে পাকা  আনারসের রস খাওয়ালে প্রচুর উপকার পাবেন।  

    অজীর্ণ :

    আনারসের  টুকরোতে নুন ও মরিচ গুঁড়ো সহযোগে খেলে  অজীর্ণতা দূর হয়। 

    পাথুরী রোগ :

    আনারসের রস নিয়মিত খেলে পাথুরী রোগীদের  (যাদের কিডনি স্টোন এই ধরনের রোগ রয়েছে) খুব উপকার দেয়।

    পেটের ব্যথা :

    আনারসের রসে সাদা জিরের গুঁড়ো ও সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে খেলে পেট বেদনা কমে। 

    অরুচি দূর করতে :

    আনারসের টুকরোতে সামান্য বিট লবণ ও ভাজা জিরা গুঁড়ো ছিটিয়ে খেলে তা ক্ষুধা বাড়ায় এবং মুখের স্বাদ ফিরিয়ে আনে।

    বদহজমে :

    এক কাপ আনারসের রসের সঙ্গে সামান্য আদার রস মিশিয়ে পান করলে। এটি গ্যাস ও অম্বল কমাতে সাহায্য করে।

    গলা ব্যথায় :

    তাজা আনারসের রস জলে মিশিয়ে তা সামান্য ঈষদ উষ্ণ গরম করে পান করুন। এটি অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করবে।

    শরীরের ফোলা ও প্রদাহে :

    নিয়মিত পরিমাণ মতো পাকা আনারস খান। এতে আনারসের মধ্যে থাকা ব্রোমেলিন প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

    দুর্বলতা দূর করতে :

    এক কাপ আনারসের রসের সঙ্গে ৮ থেকে ১০ টা তুলসী পাতা একসঙ্গে খেলে দুর্বলতা দূর হয়।

            গ্রীষ্মকালে আনারসের শরবত নিয়মিত খেলে গ্রীষ্ম জনিত শ্রান্তি ক্লান্তি দূর হয়। আমাশয় ও যকৃতের দোষেও আনারস খুব উপকারী। এতে প্রস্রাব সরল রাখে।

    আনারস খাওয়ার সতর্কতা

    অতিরিক্ত আনারস খেলে অম্বল বা পেটের ব্যথা হতে পারে।

    আনারসে অ্যালার্জি থাকলে তারা এটি এড়িয়ে চলুন।

    ডায়াবেটিস রোগ থাকলে পরিমাণ মতো খাবেন।

    গর্ভাবস্থার সময় স্বাভাবিক পরিমাণে আনারস  নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত সেবনে সমস্যা হতে পারে। তাই আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন ।

    রক্ত পাতলা করার ওষুধ চলাকালীন অতিরিক্ত আনারস খেতে চান তবে আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

    ।