Blog

  • খরমুজ: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসা।

    গ্রীষ্মকালে এই ফলটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এই ফলটির মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে প্রোটিন ভিটামিন এবং লবণ আছে। কয়েক টুকরো খরমুজ প্রতিদিন খেলে দেহের শক্তি বৃদ্ধি পায় কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। খরমুজ খাওয়ার সঙ্গে দুধ খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে। ভরপেট খাওয়ার পরে কম করে দুই ঘন্টা পরে খরমুজ খাওয়া যায়। খালি পেটে এটি খাওয়া উচিত নয়। 

    খরমুজ খেলে স্নায়বিক দুর্বলতা, মূত্রদোষ, শুক্রদোষ, হিস্টিরিয়া প্রভৃতি রোগের ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক ফল পাওয়া যায়। ডিহাইড্রেশন, অ্যাসিডিটি, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির স্বাস্থ্য, হৃদরোগ প্রতিরোধ, চোখের সমস্যা, ত্বকের সমস্যা, রক্তস্বল্পতায় ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রেও খরমুজ উপকার করে থাকে। 

    দেহের লাবণ্য বা সৌন্দর্য রক্ষায় 

    তরমুজের খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে রোদে ভালো করে শুকনো করে তা চূর্ণ করে নিতে হবে। এরপর প্রয়োজন মত জলের সঙ্গে এই চূর্ণ মিশিয়ে সেই মিশ্রণ সারা দেহের মাখতে হবে। এতে দেহের সৌন্দর্য স্থায়ী হয়। 

    এছাড়া খরমুজের বীজ অর্থাৎ দানা শুকনো করে তা চূর্ণ করে সেই চূর্ণ জলে মিশিয়ে দেহে মাখলে ত্বকের কমলতা ও স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। 

    বৃক্ক শূল (কিডনির পাথরের ব্যথা)

     সাধারণ মানুষ একে সরাসরি কিডনিতে পাথরের তীব্র ব্যথা হিসেবেই চেনে।

    খরমুজের ছাল ভালো করে রোদে শুকিয়ে তার চূর্ণ করে নিতে হবে । এই চূর্ণ 10 গ্রাম পরিমাণে নিয়ে 30 মিলিলিটার জলে মিশিয়ে আগুনে গরম করতে হবে। এরপর মিশ্রণটি ভালোভাবে ছেঁকে নিয়ে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যা বেলায় চা চামচের অর্ধেক পরিমাণ রোগীকে খাওয়াতে হবে। এতে রোগী ভালো ফল পেতে পারে। 

    পেটের গ্যাস ও পেট ফাঁপা 

      খরমুজের দানা ভালো করে শুকনো করে গুড়ো করে নিতে হবে। এরপর 3 গ্রাম খরমুজের বীজের গুঁড়োর সাথে সামান্য পরিমাণে আদার রস বা পরিবর্তে শুকনো আদার গুঁড়ো মিশিয়ে ইষদ উষ্ণ গরম জল সহ সেবন করুন। এটি অন্ত্রের বায়ু দূর করতে সাহায্য করে এবং পাচনতন্ত্র সচল করে।।

    সতর্কতা

    খরমুজ খাওয়ার যে সমস্ত ভুলগুলো করলে উপকারের পরিবর্তে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে – 

    •  খরমুজ খাওয়ার পর কোনোভাবেই জল পান করা উচিত নয়। এতে হজমপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নষ্ট হতে পারে, তীব্র পেট খারাপ হতে পারে, বমি বা কলেরার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
    •  একদম খালি পেটে খরমুজ খাওয়া খুবই ক্ষতিকর, কারণ এর কারণে হজম হতে দেরি হয় এবং পেট ফাঁপা হতে পারে। 
    • খরমুজ এবং দুধ একসঙ্গে খাওয়া উচিত নয়। এটি ‘বিরুদ্ধ আহার’ । এটি শরীরে টক্সিন তৈরি করে চর্মরোগের জন্ম দেয়।

  • খরমুজ এর পুষ্টিগুণ

    খারমুজ — গ্রীষ্মের মিষ্টি রসে ভরা শীতল ফল খারমুজ একে ইংরেজিতে Muskmelon বা Cantaloupe বলা হয়। যারা আগে কখনও খারমুজ খেয়েছেন এর নাম শুনলেই  ঠান্ডা, রসালো, সুগন্ধি এক মিষ্টি স্বাদের  সেই পুরনো স্মৃতির কথা মনে পড়ে যায়। গরম দুপুরে  এক টুকরো খারমুজ মুখে দিলেই যেন শরীর-মন দুটোই ঠান্ডা ও তাজা হয়ে যায়। এর সোনালি-কমলা রঙ, মোলায়েম নরম শাঁস, আর হালকা মধুর মতো মিষ্টি গন্ধ জিভে জল এনে দেয়। শুধু স্বাদেই নয়, এটি প্রকৃতির এক পূর্ণাঙ্গ পুষ্টির গুণে ঠাসা প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। 

    এই ফলটিকে আমরা খরমুজ, খারমুজ, খর্বুজ বা বাঙ্গি নামে চিনি। খারমুজের বৈজ্ঞানিক নাম হল Cucumis melo। এটি Cucurbitaceae  পরিবারভুক্ত ফল। আয়ুর্বেদের মতে এটি তৃষ্ণা নিবারণকারী, শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমায়, প্রস্রাব পরিষ্কার রাখে।

    USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা খরমুজে  প্রায় 34 ক্যালোরি থাকে। এটিতে ভিটামিন ‘সি’ এবং ভিটামিন ‘এ’-প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। নিম্নে প্রতি ১০০ গ্রাম খরমুজের পুষ্টিগুণ এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারে তালিকা দেয়া হলো। 

    খরমুজের পুষ্টিগুণ

    • জল : 89–90.2 গ্রাম
    • কার্বোহাইড্রেট : 8–8.16 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 3%)
    • প্রাকৃতিক চিনি : 7–8 গ্রাম 
    • ফাইবার : 0.8–1 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 4%)
    • প্রোটিন : 0.84 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 2%)
    • ফ্যাট : 0.19–0.2 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 0.5%)

    ভিটামিনসমূহ 

    • ভিটামিন C : 36-55 mg (দৈনিক চাহিদার 41-61%)
    • ভিটামিন A ( Beta-carotene ) : 160–232 mcg (দৈনিক চাহিদার 113%)
    • ভিটামিন B9 (ফোলেট) : 21 মাইক্রোগ্রাম  (দৈনিক চাহিদার 5%)
    • ভিটামিন  K : 2.5 মাইক্রো গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 2%)
    • ভিটামিন  B6 : 0.07 মিলি গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার 4%)

    এছাড়াও ভিটামিন B3 (Niacin) , ভিটামিন B1 , ভিটামিন B2 ভিটামিন অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়।

    খনিজ উপাদান 

    • পটাশিয়াম :  267 mg (দৈনিক চাহিদার 6% থেকে 8%)
    • ম্যাগনেসিয়াম :  12 mg (দৈনিক চাহিদার 3%)
    • ক্যালসিয়াম :  9 mg (দৈনিক চাহিদার 1%)
    • সোডিয়াম : 16 mg (দৈনিক চাহিদার 1%)
    • আইরন : 0.2-0.4 mg (দৈনিক চাহিদার 1%)

    এছাড়াও ফসফরাস 15 mg, জিংক 0.18 mg, কপার 0.08 mg অতি অল্প পরিমাণে পাওয়া যায় যা দৈনিক চাহিদার 1% এর থেকেও কম।

    আয়ুর্বেদে খারমুজের গুরুত্ব

    আয়ুর্বেদ গ্রন্থে খরমুজকে ‘খরবুজম’ বলা হয়ে থাকে।এবং এটি “গ্রীষ্ম ঋতুর অমৃত” বলে বিবেচিত। আয়ুর্বেদ মতে খারমুজ অতিরিক্ত পিত্ত  এবং বাত  দোষের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। শরীর ঠান্ডা রাখে, রক্ত শুদ্ধ করে, এটির মূত্রবর্ধক উপাদান  মূত্রথলি পরিষ্কার রাখে এবং প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া কমাতে খুবই উপযোগী। এটি শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায় এবং তীব্র তৃষ্ণা দূর করে থাকে। 

    উপসংহার

    পরিশেষে বলা যায় যে, খরমুজ শুধুমাত্র গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে শরীর শীতল করা, প্রাণ জুড়ানো একটি সুস্বাদু ফল ছাড়াও এটি একটি পুষ্টির ভাণ্ডার এবং প্রকৃতির এক মহৌষধ। এর মধ্যে থাকা উচ্চ জলীয় অংশ, শক্তি, ভিটামিন এবং খনিজের প্রাচুর্য জীবজন্তুকে সুস্থ সবল রাখে, শরীরের শক্তি যোগায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। কিডনিকে সুস্থ সবল রাখতে এবং শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে একে পিত্তনাশক, শীতল এবং মূত্রজনিত রোগ নিরাময়ে এক অন্যতম চমৎকারি ফল হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।   এই গরমে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় টাটকা খরমুজ রাখা সুস্থ ও দীর্ঘায়ু জীবনের এক সহজ পদক্ষেপ।

  • কমলালেবু: পুষ্টিগুণে ভরা একটি ফল

    কমলালেবু সাধারণত শীতকালীন একটি ফল। অন্য সময়ও এটি পাওয়া যায় তবে তুলনামূলকভাবে কম। কমলালেবু কমলা রঙের জন্য দেখতে খুবই আকর্ষণীয় আমাদের চোখকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে।নামটা শুনলেই চোখের সামনে খুব সহজে ভেসে ওঠে আর জিভে জল এনে দেয়।শীতের অলস দিনে কমলালেবুর খোসা ছাড়ালেই চারদিকের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সেই চনমনে সুবাস! তার কমলা রঙের কোয়াগুলো মুখে দিয়ে হালকা কামড় দিলেই একঝলক ঠান্ডা, মিষ্টি এবং হালকা টক রসের মুগ্ধ করা স্বাদে মুখটা ভরে যায়। শুধু স্বাদের জন্যই নয়, এটি শরীরকে ভিতর থেকে সজীব রাখার জন্যও প্রকৃতির এক অনন্য উপহার।

    কমলালেবু হলো সাইট্রাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল Citrus sinensis। এটি  রসালো, পুষ্টিকর উপাদানে ভরা, ভিটামিনসমৃদ্ধ এবং রোগপ্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

    কমলালেবুর পুষ্টি উপাদান: 

    কমলালেবুর মধ্যে কোন উপাদানটি ঠিক কতটা পরিমাণে থাকে, এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারে ক্রমানুসারে নিচে সাজানো হলো:

    • জল : 86.75 গ্রাম
      কমলালেবুর সিংহভাগই প্রাকৃতিক জলীয় অংশ। 
    • শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট : 11.75 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 4%)
    • ডায়েটরি ফাইবার বা আঁশ : 2.4 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 9%)
    • প্রোটিন : 0.94 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 2%)
    • ফ্যাট বা চর্বি : 0.12 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 0.3%)

    প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান :

    • পটাশিয়াম : 181 মিলিগ্রাম (দৈনিক জায়গা 4%)
    • ক্যালসিয়াম : 40 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 4%)
    • ম্যাগনেসিয়াম : 10 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 2.5%)
    • ফসফরাস : 14 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 1.5%)

    ভিটামিনসমূহ :

    • ভিটামিন C : 53.2 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 86% – 92%)
    • ভিটামিন B-9 বা ফোলেট : 30 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 8%)
    • ভিটামিন A : 11 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 1%)

    এছাড়া যে সমস্ত ভিটামিন সামান্য পরিমাণে থাকে সেগুলি হল ভিটামিন B1 (থায়ামিন), B2 (রিবোফ্লাভিন) এবং B3 (নিয়াসিন)

    আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে কমলালেবুর গুরুত্ব 

    আয়ুর্বেদে কমলালেবুকে একটি মহিমান্বিত এবং বহু গুণসম্পন্ন ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে।আয়ুর্বেদে কমলালেবুকে বলা হয় “নারঙ্গ” ।এটি শরীরকে পুষ্ট করে তোলে এবং মনের ক্লান্তি দূর করে থাকে। পাকা কমলালেবু মিষ্টি ও সামান্য টক হয়, যা মুখের রুচি ফিরিয়ে আনে। এছাড়া বিভিন্ন রোগে বিভিন্নভাবে আমাদেরকে রোগ প্রতিরোধের সাহায্য করে থাকে।

    আয়ুর্বেদ মতে কমলালেবু পিত্ত দমন করে, অতিরিক্ত গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে, অগ্নি জাগায়, হজমশক্তি বাড়ায়, রক্তশোধন করে, ত্বকের রোগে উপকারী, তৃষ্ণা নিবারণ করে, জ্বরের সময় অত্যন্ত উপকারী, ক্লান্তি দূর করে, দুর্বল রোগীদের শক্তি দেয়।

    আয়ুর্বেদিক সতর্কতা: 

    আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, কমলালেবু কখনো অতিরিক্ত রাতে কিংবা খালি পেটে খাওয়া উচিত নয়। এটি বিকালে বা দুপুরে খাওয়ার কিছুক্ষন পর খাওয়া শরীরের জন্য খুবই উপকারী। 

    উপসংহার :

    সর্বোপরি বলা যায়, কমলালেবু কেবল শীতকালীন একটি সুস্বাদু ফলই ছাড়াও, এটি প্রকৃতির দেওয়া এক জাদুকরী সঞ্জীবনী। এর মধ্যে থাকা উপাদানের বিন্যাস—প্রচুর জলীয় অংশ, প্রয়োজনীয় শর্করা, খাদ্যআঁশ এবং ভিটামিন সি-এর উপস্থিতি পুষ্টিবিজ্ঞানের মানদণ্ডে অত্যন্ত উপকারী। একই সাথে, প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে একে ত্রিদোষ নাশক এবং জঠরাগ্নি প্রদীপক বলা হয়। এটি শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ সবল রাখতে এবং মনকে সতেজ রাখতে কার্যকরী।

     শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা এবং ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখা—সবক্ষেত্রেই কমলালেবু অত্যন্ত চমৎকারী। তবে এর সম্পূর্ণ সুফল পেতে হলে সঠিক সময়ে এবং পরিমিত পরিমাণে খাওয়া দরকার। প্রতিদিন একটি করে কমলালেবুর রস খেলে আমরা খুব সহজেই সুস্থ, সবল এবং দীর্ঘায়ু জীবন লাভ করতে পারি।

  • কমলালেবু: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসা

    এটি শীতকালে প্রচুর পরিমাণে হয়ে থাকে। অন্য সময়েও পাওয়া যায় তবে তা তুলনামূলক ভাবে কম। আমাদের ভারতবর্ষে প্রচুর পরিমাণে কমলালেবু চাষ হয়ে থাকে। ভারতের নাগপুরে প্রচুর পরিমাণে কমলালেবু চাষ হয়ে থাকে তাই একে কমলালেবুর শহর বলা হয়ে থাকে। দার্জিলিং এ চাষ হয়ে থাকা কমলালেবু খুবই উৎকৃষ্ট। কমলালেবুর রস মনকে পরিতৃপ্ত করে, প্রসন্নতা এনে দেয়। কমলালেবুর রস যে কোনো রোগীকে দেওয়া যেতে পারে। তাই কমলালেবু প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। 

    যাদের ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। আহারে রুচি থাকে না তারা যদি এক ভাগ কমলালেবুর রসের সঙ্গে তিন ভাগ জল মিশিয়ে খেলে খুবই উপকার পাবেন। ক্ষুধা বৃদ্ধি পাবে, আহারে রুচি আসবে।

    আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসা

    চোখের কোণে কালো দাগ 

    অনেক নারী বা পুরুষের চোখের কোণে কালো দাগ পড়তে দেখা যায়। চোখের কোণের ওই কালো দাগ যুক্ত স্থানে কয়েক মাস যাবত প্রতিদিন কমলালেবুর রস লাগিয়ে রাখলে চোখের কোণের কালো দাগ দূর হয়।

    বদহজম 

    অনেক সময় আহারের পর বদহজম হয়ে থাকে। এমনাবস্থায় কমলালেবুর রস পান করলে উপকার পাওয়া যায়। 

    কৃমি 

    টাটকা কমলালেবুর খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে দুই কাপ জলে এমন ভাবে ভিজিয়ে রাখুন যাতে খোসার সমস্ত অংশ ভালোভাবে জল পেয়ে নরম হয়। এরপর ওই খোসাগুলো থেকে রস বের করে নিয়ে এর সাথে এক গ্রাম পরিমাণে হিং মেশাতে হবে। এই মিশ্রণ প্রতিদিন সকাল, দুপুর, ও সন্ধ্যা এই তিন টাইম এক চা চামচ করে খেলে কৃমি নাস হয়।

    সাধারণ জ্বর 

    যে কোনও সাধারণ জ্বরে কমলালেবুর রস পান করলে জ্বর হ্রাস পায়। পায়খানা ও প্রস্রাব ঠিক হয়। শরীরে শক্তি ও শ্রীবৃদ্ধি হয়। এছাড়া তৃষ্ণা দূর হয়ে থাকে। 

    ত্বকের উপর দাগ

    ত্বকের উপর যে কোনও পুরোনো দাগ তুলতে কমলালেবু চমৎকার ভাবে উপকারী। কমলালেবুর খোসা রোদে শুকিয়ে গোলাপ জলে ওই খোসা ভিজিয়ে রাখতে হবে। খোসা নরম হয়ে গেলে তা পিষে  গোলাপ জলের সঙ্গে মিশ্রণ তৈরি করে ত্বকের যে স্থানে দাগ আছে ওই স্থানে কিছু দিন যাবত লাগাতে হবে। লাগালে দাগ দূর হয়।

    উদর শূল 

    যারা এই রোগে ভুগছেন তারা প্রতিদিন যদি নিয়মিত ভাবে ২৫ মিলিঃ বা তার বেশি রস পান করে। এই রোগের হাত থেকে পরিত্রাণ পায়।

    গর্ভবতী মহিলাদের রোগ

    গর্ভবতী অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে বা কোনো রকম উপসর্গ দেখা দিলে প্রতিদিন দুটি করে কমলালেবুর রস পান করলে তা অত্যন্ত উপকারী হয়ে থাকে। কমলালেবুর রস মধু কিংবা মিছরি সহযোগে দিনে তিন থেকে চার বার খেলে আরও ভালো হবে। এতে গর্ভবতী মহিলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং গর্ভের সন্তানের ও উপকার হয়।। 

    দাঁত ওঠার রোগ 

    শিশুদের দাঁত ওঠার সময় যেসব অসুখ হয়ে থাকে তা থেকে নিরাময় পেতে কামড়ালেবুর রস বিশেষভাবে কার্যকর। তাই প্রতিদিন শিশুটিকে একটি করে কমলালেবুর রস পান করতে দিতে হবে। 

    খুশকি 

    মাথায় খুশকি হলে কমলালেবুর খোসা শুকনো করে হামান বিস্তায় চূর্ণ করে অথবা জলের সঙ্গে বেঁটে মিশ্রণ তৈরি করুন। ওই মিশ্রণ মাথায় লাগালে খুশকি থাকে না। তবে এইভাবে এক মাস যাবত করতে হবে। 

    চর্মরোগ 

    অনেকেরই চর্মরোগ হয়ে থাকে। শরীরের যেই স্থান এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে সেখানে কমলালেবুর খোসা জলের সঙ্গে বেটে মিশ্রণ তৈরি করে সেই মিশ্রণ রোগাক্রান্ত স্থানে কিছুদিন প্রলেপ দিলে চর্মরোগ দূর হয়। 

    শিশুদের স্বাস্থ্য 

    শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষার্থে কমলালেবুর রস খুবই উপকারী হয়ে থাকে। নিয়মিতভাবে মিষ্টি কমলালেবুর রস খাওয়ালে শিশুদের দেহের পুষ্টি সাধন হয় 

    ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা 

    এই রোগটি সর্দি কাশি থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকে। এতে সারা দেহে যন্ত্রণা হয়। নিয়মিতভাবে কমলালেবুর রস পান করলে তা ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগ থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে।

    পাইওরিয়া

    এটি হলো দাঁতের কষ্টকর একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি প্রতিদিন একটি করে কমলালেবুর রস পান করেন এবং সেই সঙ্গে শুকনো কমলালেবুর খোসা চূর্ণ করে মাজনের সঙ্গে মিশিয়ে দুবেলা দাঁত মাজলে এই রোগ দূর হয়। 

    যেকোনো চর্মরোগ 

    ত্বকের যেকোনো রোগে, মাথায় খুশকিতে, একজিমায় কমলালেবুর খোসা বেটে রোগাক্রান্ত স্থানে প্রয়োগ করলে খুবই উপকার দেয়।

    ব্রনোরোগ 

    কমলালেবুর খোসা শুকনো করে গুঁড়ো করে সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। ব্রণ হলে কিছু শুকনো খোসা নিয়ে তা কমলালেবুর রসের সঙ্গে মিশ্রণ তৈরি করতে হবে।  ওই মিশ্রণ ব্রনোর উপরে প্রলেপ দিলে ব্রণ দূর হয় এবং ত্বকের যেকোনো রোগ দূর করতে সাহায্য করে। 

    মশা তাড়ানো 

    কমলালেবুর খোসা ছাড়িয়ে একটা শুকনো করে নিতে হবে। ওই শুকনো খোসা জ্বালিয়ে তার ধোঁয়া দিলে মশা ঘর ছেড়ে পালায়।

  • কাঁঠাল: রোগ প্রতিরোধ ও আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসা

    কাঁঠাল খুবই সুস্বাদু একটি ফল। যা খুবই মিষ্টি এবং সরস। সকালে খালি পেটে ২ –৩ টি কোয়া খাওয়া ভালো। হজম শক্তি ভালো হলে আরো ২–৩ টি বেশি খাওয়া বেশি খাওয়া যেতে পারে। কাঁঠালের মধ্যে অনেক পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে। কাঁচা অবস্থায় কি চোর বলা হয়। এই ফল কাঁচা অবস্থাতে রান্না করে খাওয়া হয়ে থাকে। কাঁঠাল গাছের ডালে, মূল কাণ্ডে, শিকড়ে, মাটির ভেতরেও হয়ে থাকে। 

    বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ পাওয়া গেছে কাঁঠালের দানা আলুর চেয়েও বেশি পুষ্টিকর। যাদের অগ্নিমান্দ্য রোগ আছে তাদের কাঁঠাল না খাওয়াই ভালো। সর্দি কাশি হলে এই ফল কফ বসিয়ে দেয় তাই সর্দি কাশির ক্ষেত্রেও কাঁঠাল খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের এই ফল খাওয়া কোনভাবেই উচিত নয় কারণ এতে গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

    কাঁঠালের ব্যবহারে আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসা

    বিষাক্ত ফোড়া 

    কাঁঠালের বীজ অর্থাৎ দানা কাঁচা অবস্থায় ভালো করে ঘষে কিংবা শুকনো বীজ হালকা জলে ঘষে নিয়ে তার সঙ্গে পায়রার মল মিশিয়ে গারো একটি মিশ্রণ তৈরি করতে হবে। রাত্রে ঘুমানোর আগে বিষাক্ত ফোঁড়ার উপরে সেই মিশ্রণের প্রলেপ দিতে হবে। সকাল পর্যন্ত বিষাক্ত ফোঁড়া ভালোভাবে পেকে যাবে এবং সামান্য চাপ পড়লেই ঘোড়ার ভিতরের পুঁচ বেরিয়ে যাবে। 

    সর্প দংশন 

    কোন ব্যক্তিকে সাপে কামড়ালে তৎক্ষণাৎ কাঁঠালের বীজ অর্থাৎ দানা আগুনে ভালো করে পুড়িয়ে নিয়ে গুঁড়ো করে জলের সঙ্গে খাওয়াতে হবে। খাওয়ার পর সাপে কামড়ানো ব্যক্তির বিশেষ প্রভাব অনেকখানি কমে যাবে। এরপরই অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে । 

    যৌন রোগ 

    এই রোগ পুরনো হয়ে গেলে কাঁঠালের কাঠ চূর্ণ করে প্রতিদিন এক থেকে দুই গ্রাম পরিমাণে নিয়মিত একমাস সেবন করলে রক্ত শুদ্ধ হবে তার ফলে যৌন রোগের হাত থেকে মুক্তি পাবেন।

    মুখের আলসার বা ঘা:

    মুখের ভিতরে আলসার কিংবা ঘা হয়ে থাকলে কাঁঠালের কষ সরাসরি ওই ক্ষতস্থানে লাগালে এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান দ্রুত আলসার কিংবা ঘায়ের ক্ষত নিরাময় করে।

    ত্বকের সংক্রমণ ও ডায়াবেটিস:

    কাঁঠাল এর পাতায়  অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভোনয়েড প্রচুর পরিমাণে থাকে। ১৪-১৫ গ্রাম শুকনো বা কচি কাঁঠালের পাতা ৩-৪ গ্লাস জলে ভালো করে ফুটিয়ে ক্বাথ তৈরি করুন। এই ক্বাথ দিনে ২-৩ কাপ পান করুন। এই প্রক্রিয়া নিয়মিত করলে তা রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, চর্মরোগ দূর করে এবং রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে থাকে।

    কাশি ও হাঁপানি প্রতিরোধ:

    কাঁঠাল গাছের ছালের টুকরো, চিরতা এবং সামান্য জিরে একসাথে ফুটিয়ে ক্বাথ তৈরি করে সেই ক্বাথ সেবন করলে বুকের মধ্যে জমে থাকা কফ সরল হয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদি কাশি ও হাঁপানির কষ্ট কমে থাকে।

    কাঁঠালের স্বাস্থ্য উপকারিতা

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

    কাঁঠালের মধ্যে ভিটামিন C থাকে যা শ্বেত রক্তকণিকার কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে শরীর বিভিন্ন রোগ সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হয়।

    হৃদরোগ প্রতিরোধ

    কাঁঠালের মধ্যে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমতে সাহায্য করে।

    হজম শক্তি বৃদ্ধি

    কাঁঠালের মধ্যে থাকা ফাইবার অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখে। কোষ্ঠকাঠিন্য, অম্বল, গ্যাসের সমস্যা দুর করতে সাহায্য করে।

    চোখের সুরক্ষা 

    কাঁঠালের মধ্যে থাকা বিটা-ক্যারোটিন চোখের রেটিনাকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। রাতকানা, বয়সজনিত দৃষ্টিক্ষয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

    ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি

    কাঁঠালের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে এবং ত্বকের বার্ধক্য ধীর করে। 

    হাড় মজবুত করে

    কাঁঠালের মধ্যে থাকা ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করে।

    রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক

    কাঁঠালের মধ্যে থাকা আয়রন ও ভিটামিন C একত্রে রক্ত তৈরির প্রক্রিয়াকে উন্নত করে।

    কাঁঠাল গাছের বিভিন্ন অংশের ঐতিহ্যগত ব্যবহার

    গ্রামীণ চিকিৎসায়: কাঁঠাল গাছের পাতা ক্ষতস্থানে, চর্মরোগে ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

    লোকজ চিকিৎসায়: কাঁঠাল গাছের শিকড় ডায়রিয়া, জ্বর ইত্যাদিতে ব্যবহারের বর্ণনা রয়েছে।

    কিছু আয়ুর্বেদিক প্রস্তুতিতে: কাঁঠাল গাছের ছাল ত্বকের সমস্যা এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।

    সতর্কতা

    পরিমিত পরিমাণে কাঁঠাল খাওয়া উপকারী হলেও অতিরিক্ত খেলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁঠাল খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা, বদহজম, কফ বৃদ্ধি, হতে পারে। আবার যাদের কিডনির গুরুতর সমস্যা আছে তাদেরকে পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। তাই তাদেরকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া উচিত।

  • কাঁঠাল: এর পুষ্টিগুণ, কিভাবে উপকারী ?

    কাঁঠাল: পুষ্টিগুণ সম্পন্ন, গন্ধেই ক্ষুধা জাগে।

    আমাদের ভারতবর্ষে সর্বত্রই কাঁঠাল পাওয়া যায়। সব থেকে বেশি ভালো লাগে যখন কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল পেকে তার সুগন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এমনিতেই জিভে জল চলে আসে। কাঁঠাল পেকে গেলে তা সবুজ থেকে সোনালি-হলুদ রং ধারণ করে। পাকা সুগন্ধময়, নরম রসালো, মধুর মতো মিষ্টি মিশ্র স্বাদে ভরপুর এই ফলটি একসঙ্গে অনেকগুলি ফলের স্বাদের অনুভূতি দিয়ে থাকে।, বলা যায় যে কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়, এটি আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। কাঁচা অবস্থাতে কিংবা কাঁঠালের দানা দিয়ে বহুমুখী রান্না হয়ে থাকে। কাঁচা অবস্থাতে রান্না করলে এটি স্বাদ অনেকটা মাংসের মত হয়ে থাকে তাই একে “গাছের মাংস” বলা হয়। অনেক সময় একে “গাছ পাঁঠা” বা নিরামিষ মাংসও বলা হয়ে থাকে। উত্তর ভারতে কাঁচা কাঁঠালের তরকারি খুবই জনপ্রিয় আবার দক্ষিণ ভারতে কাঁঠালের চিপস বাস খুবই জনপ্রিয়। পাকা, কাঁচা উভয় অবস্থায় এবং কাঁঠালের দানা তে প্রচুর পুষ্টিকর উপাদান থাকে।

    আমাদের ভারতবর্ষে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠালের চাষ হয়ে থাকে এর সব থেকে উল্লেখযোগ্য স্থান হলো পশ্চিমঘাট পর্বতমালা অঞ্চল। এছাড়াও বেশ কিছু রাজ্যে প্রচুর পরিমাণে কাঁঠালের চাষ হয়ে থাকে যেমন তামিলনাড়ু, কেরালা, ওড়িশা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং উত্তর প্রদেশের কিছু অংশে । আদ্র ও উষ্ণ প্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে এর ফলন খুব ভালো হয়ে থাকে। কাঁঠাল ভারতের দুটি অঙ্গরাজ্যের অফিশিয়াল রাজ্য ফল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। 

    কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম: Artocarpus heterophyllus

    পাকা কাঁঠালের পুষ্টিগুণ 

    USDA) এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য পাকা কাঁঠালে যে পুষ্টি উপাদান রয়েছে এবং তার দৈনিক চাহিদার কতটুকু পূরণ করতে পারে নিম্নে  সাজানো হলো:

    • জল : প্রায় 72–94 গ্রাম
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 16–25 গ্রাম.(দৈনিক শর্করার চাহিদার প্রায় 8% থেকে 9% )
    • খাদ্য আঁশ (ফাইবার) : প্রায় 1.5–3.0 গ্রাম.(দৈনিক ফাইবারের চাহিদার প্রায় 6% পূরণ করে)
    • প্রোটিন : প্রায় 1.2–2.0 গ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 3% থেকে 4% পূরণ করে)
    • ফ্যাট : প্রায় 0.1–0.64 গ্রাম. (1% এরও কম)

    খনিজ উপাদান 

    • পটাশিয়াম : প্রায় 200–450 মিলিগ্রাম.(দৈনিক  চাহিদার প্রায় 10% থেকে 13%)
    • ফসফরাস : প্রায় 20–38 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 3% থেকে 5%)
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 25–37 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 7% থেকে 8%)
    • ক্যালসিয়াম : প্রায় 20–40 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 2% থেকে 3%)
    • সোডিয়াম : প্রায় 2–4 মিলিগ্রাম. (1% এর থেকেও কম)
    • আয়রন : প্রায় 0.2–0.23 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5% থেকে 2%)
    • জিঙ্ক : প্রায় 0.1–0.13 মিলিগ্রাম.(1% এর থেকেও কম)
    • কপার : প্রায় 0.04 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)
    • ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.043 মিলিগ্রাম সামান্য (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)

    ভিটামিনসমূহ 

    • ভিটামিন C : প্রায় 13–15 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 15% থেকে 23%)
    • ভিটামিন A (বিটা-ক্যারোটিন) : 100–120 IU ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 4%)
    • ভিটামিন B6 : প্রায় 0.33 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদা 25%)
    • নিয়াসিন (B3) : প্রায় 0.92 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 6% থেকে 9%)
    • রিবোফ্লাভিন (B2) : প্রায় 0.06- 0.1 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5% থেকে 8%)
    • থায়ামিন (B1) : প্রায় 0.03- 0.07 মিলিগ্রাম.(দৈনিক চাহিদার প্রায় 4% থেকে 5% )
    • ফলেট (B9) : প্রায় 24 মাইক্রোগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার প্রায় 6%)
    • ভিটামিন E : মাত্র 0.34 মিলিগ্রাম.(1% এর ও কম)
    • ভিটামিন K : মাত্র 0.5 মাইক্রোগ্রাম. (1% এর ও কম)

    কাঁঠালের বিশেষ জৈব উপাদান

    কাঁঠালে ভিটামিন-খনিজ ছাড়াও, আরও কিছু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে:

    • ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট
    • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
    • পলিফেনল
    • ফ্ল্যাভোনয়েড
    • ক্যারোটিনয়েড
    • স্যাপোনিন
    • লিগন্যান
    • ট্যানিন

    এই সমস্ত উপাদান শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতি থেকে কোষকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

    আয়ুর্বেদে কাঁঠালের গুরুত্ব

    আয়ুর্বেদ মতে কাঁঠাল শরীরে বল বৃদ্ধি করে, ধাতু পুষ্ট করে, বীর্যবর্ধক, ওজন বৃদ্ধিতে সহায়ক,বাত ও পিত্ত প্রশমক, ক্লান্তি দূর করে, হৃদপিণ্ডকে শক্তিশালী করে, রক্ত পুষ্ট করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। আবার অতিরিক্ত সেবনে কফ বৃদ্ধি করতে পারে।

    উপসংহার:

    সর্বোপরি বলা যায়, কাঁঠাল শুধুমাত্র একটি সুগন্ধি রসালো ও সুস্বাদু গ্রীষ্মকালীন ফলই নয়, এটি একদিকে পুষ্টির ভাণ্ডার এবং প্রকৃতির দেওয়া এক অনন্য মহৌষধ। এর প্রতিটি কোয়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে ভিটামিন, খনিজ এবং শক্তিশালী সব ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট, যা আমাদের শরীরকে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষা দেয়। অন্যদিকে, প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বর্ণনা অনুযায়ী এর ‘বাত’ ও ‘পিত্ত’ প্রশমনকারী গুণ এটি কে ঔষধি গুণে ভরা ভেষজের তালিকাভূক্ত করেছে। কাঁচা অবস্থায় ‘এঁচোড়’, নিরামিষ রান্নায় মাংসের পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে। পাকা অবস্থায় মিশ্র স্বাদে ভরা মিষ্টি ফল এবং তার পুষ্টিকর বিচি অর্থাৎ দানা মানবদেহের জন্য পরম উপকারী।

  • কলা: আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যবহার।

    কলা একটি উৎকৃষ্ট ফল। পৃথিবীর সর্বত্রই সবথেকে বেশি খাওয়া হয়ে থাকা ফল হলো কলা। কলার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, শর্করা, নাইট্রোজেন, আয়োডিন, লবণ, কার্বোহাইড্রেট পদার্থ আছে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে যে পরিমাণ আয়োডিন প্রয়োজন হয় তা কলা থেকে খুব সহজেই পাওয়া যায়।

         কলার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট আর লবণ থাকে। তার ফলে বৃক্ক রোগে এটি অত্যন্ত উপকারী। স্বপ্নদোষ ও প্রমেহ রোগী কলা অসাধারণ উপকার করে।

        কলার মধ্যে বেশি পরিমাণে নাইট্রোজেন থাকায় এটি শরীরে মাংস বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে। এর ভেতরে সেবটোনিন নামক পদার্থ থাকে যা মানুষের মানসিক শান্তি কমাতে সহায়ক।  

         মাথার চুল কালো করতে কলার ভূমিকা ও অদ্বিতীয়। দুধ আর কলা একসঙ্গে যদি প্রতিদিন খাওয়া যায় মাথার চুল দীর্ঘদিন কালো থাকে। কলার মধ্যে যে সমস্ত পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে সেগুলি শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, খেলোয়াড় থেকে শুরু করে অসুস্থ ব্যক্তিদেরও পুষ্টি সাধনে সাহায্য করে থাকে। তাই এটি রোগ প্রতিরোধে ফলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থান দখল করে আছে।

    কলা— ঘরোয়া চিকিৎসায় এর ব্যবহার

    মানসিক রোগ 

    মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতিদিন কলা খাওয়া উচিত। কারণ কলার মধ্যে সেবোটোনিন নামক পদার্থ রয়েছে তা মানসিক শান্তি বজায় রাখে। 

    দাস্ত রোগ 

    এই রোগে কলা খুব উপকার দেয়। একটি পাত্রে সামান্য গাওয়া ঘি গরম করুন তাতে দু-তিন টুকরো লবঙ্গ দিন। ধোনে, হলুদ, সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে দিন। পরিমাণ মতো জল দিন। 

          এবার অপর একটি পাত্রে কলার টুকরো রেখে গরম করুন। পরিমাণ মতো জল দিন। এবার ওই দুটি মিশ্রণকে একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণ দাস্ত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাওয়ালেন খুবই উপকার পাওয়া যায়। 

    দাদ ও একজিমা 

    এই জাতীয় চর্ম রোগ মানুষের মনকে অশান্ত করে তোলে। এই রোগে কলার ব্যবহার খুবই উপকারী হয়ে থাকে। আমরা সকলেই কলা খেয়ে তার খোসা ফেলে দিই কিন্তু কলার খোসা এই রোগে খুবই উপকার করে। আসুন জেনে নেওয়া যাক এর ব্যবহার—

           একটি তাজা কলার খোসা ছাড়িয়ে দেহের দাদ ও একজিমার ক্ষতস্থানে চামড়ায় বেঁধে রাখুন। এইভাবে তিন থেকে চার দিন ক্ষতস্থানের উপরে একইভাবে বাঁধলে ক্ষতস্থানের জীবাণু গুলি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসবে। তখন ওই স্থানে মলম লাগালে দ্রুত উপশম হয়ে থাকে। 

    সম্ভোগে দুর্বলতা 

    যে সমস্ত নরনারী সম্ভোগজনিত দুর্বলতা রয়েছে তারা  সম্ভোগের আগে দুই থেকে তিন টুকরো কলা খেয়ে হালকা ঈষদুষ্ণ দুধ খাবেন। এতে দেহে শক্তি আসবে, সম্ভোগে আনন্দ লাভ হবে।

    মধুমেহ 

    মধুমেহ রোগাক্রান্ত রোগীদের জন্য কলা অত্যন্ত উপকারী একটি ফল। প্রথমে একটি পাকা কলা নিন। কলা থেকে কলার ছাল ছাড়িয়ে একে চটকে একটি মন্ড তৈরি করুন। মন্ডের সঙ্গে পরিমাণ মতো আতপ চালের ভুষি মিশিয়ে নেবেন। ওই মিশ্রণটিকে একটি পাত্রতে করে নিয়ে দুই থেকে তিন দিন কোন গরম জায়গায় রেখে দিতে হবে। চতুর্থ দিনের মাথায় পাত্রটি কে এমনভাবে হালকা কাত করে রাখবেন যাতে করে কলার রস মিশ্রণ থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই রসের সেবনে মধুমেহ রোগের উপশম হয়ে থাকে। 

    শিশুদের পেটের কৃমি 

    অধিকাংশ শিশুই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই রোগে শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে যায়। শরীরে ঠিকমতো পুষ্টি লাভ হয় না, শরীর ক্রমশ রুগ্ন হয়ে যায়। এই রোগে কলা ব্যবহার করলে তা চমৎকারভাবে কৃমি ধ্বংস করে এবং এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 

         কলা ভালোভাবে পরিষ্কার জলে ধুয়ে নিয়ে কলার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে ওই ছাল রৌদ্রে ভালো করে শুকিয়ে হামান দিস্তায় বা মিকচার মেশিনে নিখুঁতভাবে গুঁড়ো করে নিতে হবে। এই পূর্ণ ২ গ্রাম পরিমাণে নিয়ে গরম জলে মিশিয়ে ভালো করে গুলে নিন। হালকা গরম জলে গোলা এই মিশ্রণ শিশুকে খাওয়ালে পেটের কৃমি মলের সঙ্গে বেরিয়ে যাবে। নতুন করে আর কৃমির জন্ম হবে না। 

    হৃদরোগ 

    বর্তমানে শুধু ভারতে নয় সমস্ত দেশেই কেউ না কেউ হৃৎপিণ্ড জনিত কোন না কোন রোগে ভুগছেন। এক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে কলা খেলে হৃদরোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 

           কলা কে যেকোনো তাপে ভালো করে গরম করে নিন তারপর খোসা ছাড়িয়ে ফেলে দিয়ে চলার সঙ্গে গোলমরিচের গুঁড়ো মিশিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে খাওয়ালে আক্রান্ত ব্যক্তি তাৎক্ষণিক চমৎকারভাবে আরাম পাবেন।

    শ্বেত প্রদর

    প্রায় অধিকাংশ স্ত্রীলোক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েন, চোখের কোন কালো হয়ে যায়, দেবী লাবণ্য থাকে না। 

          দুই একটি গলা ছাড়িয়ে নিয়ে দুধের সঙ্গে চটকে মিশ্রণ তৈরি করে নিতে হবে। ওই মিশন কিছুদিন নিয়মিত খেলে রোগ উপশম হয়। 

    দুর্বলতা 

    নিয়মিত কলা খেলে দুর্বলতা দূর হয়। এছাড়া কলা দুধ ও মধু সহযোগী খেলে দুর্বলতা দূর হয়ে থাকে।

    কলা ছাড়াও এর ফুল (মোচা), থোড় (ভেতরের নরম কাণ্ড) এবং পাতাতেও অসাধারণ ওষধি গুণ রয়েছে। রোগ প্রতিরোধে কলার বিভিন্ন অংশের ব্যবহার ও কার্যকরী ঘরোয়া কিছু উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:

    কলার মোচা (কলার ফুল)

    কলার মোচায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং আয়রন থাকে যা ভিন্নভাবে আমাদেরকে উপকার করে থাকে।

    ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: 

    মোচার নির্যাস রক্তেতে শর্করার মাত্রা বা ব্লাড সুগার কমাতে সাহায্য করে। মোচা সেদ্ধ করে হালকা মশলা দিয়ে রান্না করে খেলে খুবই উপকার পাওয়া যায়।

    ঋতুস্রাবের ব্যথা (ঘরোয়া টোটকা): 

    পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ব্যথা হলে কলার মোচা এই সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে। কলার মোচা সেদ্ধ করে টক দইয়ের সাথে খেলে শরীরের মধ্যে প্রোজেস্টেরন হরমোন বাড়ে। এতে এই কষ্ট উপশম হয়ে থাকে।

    কলার থোড় বা মজ্জা

    থোড় বা কলার ভেতরের কাণ্ডতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম এবং ফাইবার থাকে, যা শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার করে থাকে।

    ডিটক্সিফিকেশন ও কিডনির পাথর

    থোড়ের রস হলো প্রাকৃতিক ডাইইউরেটিক, যা প্রস্রাবের বেগ বাড়াতে এবং কিডনি পরিষ্কার রাখতে সহায়ক। কিডনিতে পাথর পড়লে এটি কিডনির ছোট পাথর গলাতেও সাহায্য করে থাকে। 

    ওজন ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ : 

    ওজনের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা যাদের রয়েছে তাদের জন্য কলার থোর খুব উপকারী। থোড়ের মধ্যে থাকা হাই-ফাইবার ওজন কমাতে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে অত্যন্ত কার্যকরী।

    ডিটক্স ড্রিংক (ঘরোয়া টোটকা) : 

    কাঁচা থোড় ভালো করে পিষে থোড়ের রস ছেঁকে নিন।  ওই রসের সঙ্গে সামান্য লেবুর রস ও লবণ মিশিয়ে সকালে খালি পেটে খেলে তা পেট পরিষ্কার করে এবং শরীর ডিটক্স করে।

    কাঁচা কলা 

    পেটের গোলযোগ ও ডায়রিয়া: 

    ডায়রিয়া রোগে কাঁচা কলা চমৎকারভাবে উপকার করে থাকে। কাঁচা কলা সেদ্ধ করে নিয়ে ভাতের সাথে  খেলে ডায়রিয়া ও আমাশয় দ্রুত ভালো হয়। কাঁচা কলার ঝোল খেলে ও ডায়রিয়া ও আমাশয় ভালো হয়ে থাকে। এটি অন্ত্রের ভেতরের দেয়াল কে সুরক্ষিত রাখতে খুবই কার্যকরী।

  • কলা: এর পুষ্টি উপাদান, জনপ্রিয় কেন? কেন খাবেন?

    কলা: প্রকৃতির মিষ্টি ও শক্তির ভাণ্ডার

    আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোন সময় কলা খেয়েছি। গাছ থেকে সদ্য পাড়া সোনালি-হলুদ খোসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নরম, সুগন্ধি, মধুর স্বাদের এই ফলটি আমাদের সকলের কাছে খুব পছন্দের। কলা পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ফলগুলোর একটি। কলা শুধু স্বাদের জন্য পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ফল নয়, বরং এটি শক্তি, পুষ্টি এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যও প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি থেকে শুরু করে ক্রীড়াবিদ—সবার জন্যই কলা অত্যন্ত উপকারী খাদ্য। সহজপাচ্য, শক্তিদায়ক এবং অসংখ্য ভিটামিন-খনিজে সমৃদ্ধ এই ফলকে ক্ষুধার্ত অবস্থাতে খেলে অল্প সময়ের মধ্যেই শক্তি জোগায়, তাই আয়ুর্বেদে কলাকে শক্তিবর্ধক তৃপ্তিদায়ক এবং দেহ পুষ্টি কারক খাদ্য হিসাবে গণ্য করা হয়।

    জনপ্রিয় কলার জাত গুলি হল চাঁপা কলা, সাগর কলা, কাঁঠালি কলা, সবরি কলা, লাল কলা। এদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বিশেষ গুণাগুণ রয়েছে। তাই কলার বৈজ্ঞানিক নাম ও মূলত এর জাত এবং প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন হয়ে থাকে।  সামগ্রিকভাবে কলার গণ বা জেনাসকে Musa বলা হয়।

    কলা এমন একটি ফল যা  প্রাতঃরাশ, শরবত, স্মুদি, পায়েস, হালুয়া, কেক কিংবা সরাসরি ফল হিসেবে খাওয়া যায়। তাই সবভাবেই এটি সমান জনপ্রিয়।

    প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কলা 89 কি.ক্যালরি শক্তি প্রদান করে। কলায় থাকা পুষ্টি উপাদান সমূহ এবং সেগুলি মানুষের দৈনিক পুষ্টির চাহিদার কত শতাংশ পূরণ করতে পারে,  নিম্নে দেওয়া হল হলো—

    প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কলার পুষ্টিগুণ

    • জল : প্রায় 74–75 গ্রাম
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 22–23 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 8% পূরণ করে)
    • প্রাকৃতিক চিনি : 12.23 গ্রাম (গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ) যা শরীরকে দ্রুত শক্তি দেয়
    • খাদ্যআঁশ (ফাইবার) : প্রায় 2.5–3 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 10% পূরণ করে)
    • প্রোটিন : প্রায় 1.1 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার 2%)
    • ফ্যাট : প্রায় 0.33 গ্রাম 

    খনিজ পদার্থ (Minerals)

     খনিজ পদার্থের মধ্যে পটাশিয়াম কলার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ খনিজ।

    • পটাশিয়াম : প্রায় 358 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 8%)
    • ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.27 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 12%)
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 27 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 7%)
    • ফসফরাস : প্রায় 22 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার 3%)
    • ক্যালসিয়াম : প্রায় 5 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার 0.5%)
    • সোডিয়াম : প্রায় 1 মিলিগ্রাম.(অতি অল্প পরিমাণ)
    • লৌহ  : প্রায় 0.26 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার 1.5%)
    • জিঙ্ক : প্রায় 0.15 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার 1.5%)
    • তামা : প্রায় 0.078 মিলিগ্রাম. (দৈনিক চাহিদার 3%)
    • সেলেনিয়াম : অতি অল্প পরিমাণে

    ভিটামিনসমূহ 

    ভিটামিন B6 কলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভিটামিন। এটি স্নায়ু ও মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    • ভিটামিন C : 8.7 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 10%)
    • ভিটামিন B6 : 0.367 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 28%)
    • ভিটামিন B5 (প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড) : 0.334 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 7%)
    • ভিটামিন B3 (নায়াসিন) : 0.665 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 4%)
    • ভিটামিন B2 (রাইবোফ্লাভিন) : 0.073 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 5%)
    • ভিটামিন B1 (থায়ামিন) : 0.031 মিলি গ্রাম (দৈনিক চাহিদা 3%)
    • ভিটামিন B9 (ফলেট) : 20.0 মাইক্রগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 5%)
    • ভিটামিন E : সামান্য (দৈনিক চাহিদার 1%)
    • ভিটামিন A : সামান্য (1% এর থেকেও কম)
    • ভিটামিন K : সামান্য (1% এর থেকেও কম)

    কলার বিশেষ জৈব সক্রিয় উপাদান

    ডোপামিন— এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

    ক্যাটেচিন— এটি হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক।

    ট্রিপটোফ্যান— এটি সেরোটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে। 

    রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ— এটি বিশেষত কাঁচা কলায় বেশি থাকে। 

    পেকটিন— এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে উপকারী।

    বহুমুখী রান্নায় কলা

    কলা গাছের প্রায় প্রতিটি অংশই খাওয়া যায় এবং বহুমুখী রান্নায় কলা (কাঁচাকলা ও পাকা কলা), মোচা (কলার ফুল কে মোচা বলা হয়) এবং থোড় (কলার কাণ্ড কে থোর বলে) দিয়ে চমৎকার সব ঐতিহ্যবাহী তরকারি ও খাদ্যবস্তু তৈরি করা হয়। 

    কলা (কাঁচাকলা ও পাকা কলা) দিয়ে তৈরি কিছু খাবার হলো — কাঁচাকলার শুক্তো, কাঁচাকলার কোফতা কারি, কাঁচাকলা ও আলু দিয়ে মাছের পাতলা ঝোল, কাঁচাকলার খোসা বাটা, পাকা কলার বড়া বা মালপোয়া, ইত্যাদি।

    কলার ফুল (মোচা) দিয়ে তৈরি খাবার 

    কলার ফুল বা মোচা কাটার প্রক্রিয়াটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। এর তৈরি তরকারি অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর হয়। যেমন — মোচার ঘণ্ট, চিংড়ি দিয়ে মোচার ঘণ্ট, মোচার চপ বা কাটলেট, মোচার বড়া ইত্যাদি। 

    কলার থোড় (অভ্যন্তরীণ কাণ্ড) দিয়ে তৈরি খাবার 

    কলা গাছের ভেতরে থাকা নরম সাদা কাণ্ড কে থোড় বলা হয়। যা ফাইবার বা আঁশে ভরপুর এবং কোষ্ঠকাঠিন্য ও রক্তচাপের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কলার থোড় দিয়ে তৈরি খাবার গুলি হল থোড়ের ছেঁচকি বা ঘণ্ট, থোড় ভাজা, থোড়ের কোফতা কারি, থোড়ের রায়তা, ইত্যাদি। 

    উপসংহার

    কলাকে শুধু একটি ফল বললে চলে না; এটি শক্তি, পুষ্টি ও স্বাদ এর এক সমন্বয়। পাকা কলার মিষ্টি সুগন্ধ, কাঁচা কলা দিয়ে বহুমুখী রান্না, কলার ফুলের এবং থোড়ের খাদ্যগুণ—সব মিলিয়ে কলাগাছের প্রায় প্রতিটি অংশই মানব শরীরকে উপকার করে থাকে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে একে বলবর্ধক, পুষ্টিবর্ধক ও দেহপোষক খাদ্য হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়।  সুষম খাদ্য হিসেবে কলা কে দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত করলে এটি শরীরের শক্তি, পুষ্টি এবং তৃপ্তির এক অপূর্ব উৎস।।

  • আতা (শরিফা বা সীতাফল): রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ঘরোয়া উপাচার

    আতা একটি অত্যন্ত সুস্বাদু, মিষ্টি ও পুষ্টিতে ভরপুর ফল।এটি সাধারণত গ্রীষ্মকালে হয়ে থাকে। এটি আমাদের দেশে অত্যন্ত পরিচিত এবং পছন্দ কর একটি ফল। এর চমৎকার পুষ্টিগুণের জন্য এটি স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। আতা ফল ছাড়াও এর দানা, পাতা এবং ছাল আমাদের শরীরের স্বাস্থ্য সমস্যায় ও রোগ প্রতিরোধে  ঘরোয়া উপাচার হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

    আতা ফল এবং এর বিভিন্ন অংশের ঘরোয়া উপাচার

    আতা গাছের ফল, পাতা, বীজ এবং ছাল সবকিছুই বিভিন্ন উপায়ে ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যবহার করা

     উকুন ও খুশকি দূর করতে : 

    আতার বীজ পরিষ্কার করে ধুয়ে, শুকিয়ে ভালো করে গুঁড়ো করে নিন। এই গুঁড়োর সাথে সামান্য নারকেল তেল (অভাবে জল) মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন।  

    ব্যবহার: পেস্টটি মাথায় চুলের গোড়ায় ভালো করে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট  রাখার পর ধুয়ে ফেলুন। এটি মাথার উকুন ও খুশকি দ্রুত দূর করতে খুবই কার্যকরী। 

    সতর্কতা:– আতার বীজ খুবই বিষাক্ত। তাই এটি ব্যবহারের সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন পেস্টটি যেন কোনোভাবেই চোখে না লাগে। চোখে লাগলে তীব্র জ্বালাপোড়া হতে পারে।

    ফোড়া পাকাতে ও ঘা শুকাতে : 

    আতা গাছের টাটকা পাতা পরিষ্কার করে ধুয়ে বেটে নিন।

    ব্যবহার: ফোড়া বা কোনো ঘা তাড়াতাড়ি পাকাতে কিংবা ভেতরের জমে থাকা পুঁজ বের করতে এই পাতার বাটা সামান্য লবণের সঙ্গে মিশিয়ে ফোড়া বা কোনো ঘা এর স্থানে প্রলেপ হিসেবে লাগান। এতে ব্যথা ও যন্ত্রণা কমে এবং দ্রুত উপশম হয়।

    আমাশয় ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে : 

    আতা গাছের ছাল অথবা কাঁচা আতা ফল পরিষ্কার করে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে নিন।

    ব্যবহার: এই গুঁড়ো সামান্য হালকা গরম জলের সাথে মিশিয়ে খেলে তা পেটের পুরনো আমাশয় এবং ডায়রিয়ার সমস্যা দূর করে। আতার ছাল পেটের ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে।

    রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করতে : 

    শরীরে রক্তের ঘাটতি দেখা দিলে বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ হ্রাস পেলে নিয়মিত পাকা আতা ফল খাওয়া খুবই উপকারী। এতে থাকা আয়রন রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি করে ক্লান্তি ও দুর্বলতা দূর করে। রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দূর করতে সাহায্য করে।

    বাতের ব্যথা বা জয়েন্টের উপশম : 

    পরিষ্কার আতা পাতা বেটে পেস্ট তৈরি করে নিয়ে তা হালকা গরম করে নিন।

    ব্যবহার: বাতের ব্যথা বা হাড়ের জয়েন্টের ব্যথার জায়গাতে এই হালকা গরম গরম পাতার পেস্ট এর প্রলেপ দিলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং ব্যথার তীব্রতা কমে আসে।

    গর্ভবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায়:

    আতা ফল গর্ভবতী নারীদের জন্য খুবই উপকারী বলে বিবেচিত হয়। এটি গর্ভাবস্থায় গর্ভপাতের ঝুঁকি কমাতে, ভ্রূণের বিকাশে, প্রসবকালীন ব্যথা কমাতে, এবং প্রসবের পর মায়ের স্তনদুগ্ধ বাড়াতে সাহায্য করে।

    দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে: 

    আতা ফলের মধ্যে  লুটেইন (Lutein) নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। এটি বয়সকালীন চোখের সমস্যা এবং ছানি পড়া প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে: 

    আতার  মধ্যে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে।

    ওজন বৃদ্ধিতে সহায়ক:

    যাদের ওজন কম, তারা যদি  ১টি পাকা আতার শাঁস ১ গ্লাস দুধ এর সঙ্গে মিশিয়ে শরবত তৈরি করে পান করে শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পায় ও ওজন বেড়ে।

    ত্বকের পরিচর্যায়

    ফেসপ্যাক:  আতার শাঁস এর সাথে কাঁচা দুধ ও মধু মিশিয়ে মুখে ১৫ মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বক কোমল হয় ও উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়।

    আতার মধ্যে থাকা মূল্যবান পাঁচটি উপাদান সমূহ

    আতার সমস্ত উপাদানসমূহের মধ্যে প্রধান ৫টি উপাদান আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  বাড়াতে এবং রোগমুক্ত রাখতে সরাসরি কাজ করে থাকে, তা নিচে দেওয়া হলো:

    ভিটামিন C (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড)— ভিটামিন সি প্রাথমিক ভাবেই আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এটি রক্তে শ্বেত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে থাকে। যা আমাদের শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর যেকোনো ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। বাইরের ক্ষতিকর জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করে। এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।

    ভিটামিন B6 (পাইরিডক্সিন)— ভিটামিন বি৬ রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার রাসায়নিক সমতা বজায় রাখে। শরীরে সংক্রমণ বা রোগজীবাণু প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ‘অ্যান্টিবডি’ তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। আমাদের ইমিউন সিস্টেমের প্রধান যোদ্ধা ‘টি-সেল’ এর কার্যক্ষমতা সচল রাখতে এই ভিটামিন অত্যন্ত অপরিহার্য।

    পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম — এই দুটি খনিজ উপাদান হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে এবং সামগ্র শরীরের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক রেখে পরোক্ষভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ এবং মানসিক চাপ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম স্নায়ুকে শান্ত করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে  মানসিক চাপ কমায়।  

    খাদ্য আঁশ (ফাইবার)— আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রায় ৬০ – ৭০% নির্ভর করে আমাদের অন্ত্র বা পেটের স্বাস্থ্যের ওপর। আতার ফাইবার অন্ত্রের মধ্যে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে। উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো  কে শক্তিশালী করে তোলে। ফলে ক্ষতিকর জীবাণু পেটে সংক্রমণ ছড়াতে পারে না।

    ফাইটোকেমিক্যালস (অ্যাসিটোজেনিন ও লুটেইন)— আতায় থাকা কিছু বিশেষ উদ্ভিজ্জ উপাদান সরাসরি রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে। এই উদ্ভিজ্জ উপাদান গুলি ‘অ্যাসিটোজেনিন’ শরীরে ক্ষতিকর ফ্রি-র‌্যাডিক্যাল দূর করে শরীরকে ক্যান্সার প্রতিরোধী করে এবং লিভার বা ফুসফুসের কোষের অস্বাভাবিক ক্ষতি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

  • আতা (শরিফা বা সীতাফল) — প্রকৃতিক পুষ্টিগুণ, উপকারী কেন?

    আতা (শরিফা বা সীতাফল) — প্রকৃতির মিষ্টি উপহার 

    আমাদের কাছে আতা ফল খুবই পরিচিত একটি ফল। হিন্দিতে এটি সীতাফল বা শরিফা নামে পরিচিত। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এটি এমন একটি সুস্বাদু ফল যাকে দেখা মাত্রই জিভে জল এসে যায়। এটি সবুজ খসখসে খোলস যুক্ত হয়ে থাকে, আর এই খোলসের ভিতরে থাকে দুধের সরের মতো নরম, সুগন্ধি ও মধুর স্বাদের শাঁস যা খুবই সুস্বাদু। এই ফলের বীজ এবং মাঝের শিরাটি বিষাক্ত। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এ এর দ্বারা সুপ তৈরি করা হয়। আমেরিকাতেও এর মিষ্টি স্বাদের সুপ তৈরি করা হয়। আতা গাছের কাঠ থেকে কর্ক তৈরি করা হয়। এর দ্বারা জলীয় তৈরি করা হয়। এই ফল ক্লান্তি নাশক এবং তাপ অপহারক। আতা শক্তি ও ক্যালোরির সেরা উৎসগুলির একটি। পাকা আতার সুগন্ধ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পাকা আতার সুগন্ধ নাকে এলে এর লোভ থেকে বাঁচা সহজ নয়। এর মিষ্টি সুস্বাদু স্বাদ, মাখনের মতো নরম গঠন এবং এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ একে ফলের জগতে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

    আতা আমাদের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত হলেও এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Annona squamosa। এটি উষ্ণমণ্ডলীয় আবহাওয়া অঞ্চলে প্রচুর জন্মায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশে সেই পুরনো শতাব্দি থেকে খাদ্য ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে আতা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

    USDA এবং পুষ্টি বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আতার প্রধান পুষ্টি উপাদানগুলো– ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট, খনিজ, ভিটামিন ইত্যাদি এবং এগুলি দৈনিক চাহিদার কতটুকু পূরণ করতে পারে ক্রমানুসারে নিম্নে দেওয়া হলো:

    উপাদান পরিমাণ

    • জল : প্রায় ৭১.৫–৭৫ গ্রাম
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় ২৩–২৫.২ গ্রাম (৯% থেকে ১৯% পূরণ করে)
    • প্রাকৃতিক চিনি : প্রায় ১৮–২০ গ্রাম (২১% পূরণ করে)
    • খাদ্য আঁশ (ফাইবার) : প্রায় ২.৪–৫ গ্রাম (৯% পূরণ করে)
    • প্রোটিন : প্রায় ১.৫–২.৫ গ্রাম (৩% থেকে ৪% পূরণ করে)
    • ফ্যাট : প্রায় ০.৪–০.৭ গ্রাম (১% পূরণ করে) 

    খনিজ পদার্থ 

    • পটাশিয়াম : প্রায় ২৪০–৩৮২ মিলিগ্রাম (৮% পূরণ করে)
    • ক্যালসিয়াম : প্রায় ২০–৩০ মিলিগ্রাম (২% পূরণ করে)
    • ফসফরাস : প্রায় ২০–২৫ মিলিগ্রাম. (২% পূরণ করে)
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় ১৮–২২ মিলিগ্রাম (৪% থেকে ৫% পূরণ করে)
    • আয়রন : প্রায় ০.৫–১.০ মিলিগ্রাম. (৪% পূরণ করে)
    • সোডিয়াম : প্রায় ৪–১০ মিলিগ্রাম. (অতি সামান্য)

    ভিটামিন সমূহ

    • ভিটামিন C : প্রায় ১৫–২০ মিলিগ্রাম (২১% পূরণ করে)
    • ভিটামিন B6 : প্রায় ০.১৫–০.২৫ মিলিগ্রাম (১৩% থেকে ১৫% পূরণ করে)
    • ভিটামিন B3 : প্রায় ০.৯ মিলিগ্রাম (৬% পূরণ করে)
    • ভিটামিন B1 : প্রায় ০.০৮–০.১২ মিলিগ্রাম. (৯% পূরণ করে)
    • ভিটামিন B2 : প্রায় ০.০৫–০.১১ মিলিগ্রাম (৮% পূরণ করে)
    • ভিটামিন B9 : প্রায় ১৪ মাইক্রোগ্রাম (৪% পূরণ করে)
    • ভিটামিন A : প্রায় ২ মাইক্রোগ্রাম  (খুবই সামান্য পরিমাণ)

    আতার মাঝের শিরাটি এবং বীজ খাওয়া উচিত নয় কেন?

    কারণ :

    আতার বীজে বিষাক্ত উপাদান থাকে। ফলে বমি, পেটব্যথা, স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে।

    আতার বীজ বা বীজের গুড়ো চোখে গেলে মারাত্মক জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।

    আতার মাঝের শিরাটি বিষাক্ত তাই এটিও কোন প্রকারে খাওয়া উচিত নয়। 

    এছাড়া আতা গাছের পাতাও খুবই বিষাক্ত হয়ে থাকে। 

    আতা খাওয়ার সময় সতর্ক থাকবেন কারা?

    ডায়াবেটিস রোগীদের অতিরিক্ত আতা খাওয়া ঠিক নয়। আতায় প্রাকৃতিক চিনি থাকে। তাই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে খাওয়া উচিত।

    অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত আঠা খেলে ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যা হতে পারে। কারণ আতাতে ক্যালোরির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাই সীমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো।

    কিডনি রোগীরা পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রিত খাদ্য খেয়ে থাকলে আতা খাওয়ার ইচ্ছা হলে আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

    উপসংহার

    আতা শুধু যে একটি সুগন্ধি সুস্বাদু ফল তা নয়, এটি হলো শক্তি, ভিটামিন, খনিজ, আঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সমৃদ্ধ পুষ্টির ভাণ্ডার। এর সুগন্ধি, মিষ্টি, মাখনের মতো নরম শাঁস শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবার মন জয় করে নেয়। আয়ুর্বেদে এটি শক্তি দায়ক, পুষ্টিকর ও দেহপোষক ফলের মধ্যে একটি। তবে এর বীজ কখনো খাওয়া উচিত নয় এবং এতে মিষ্টি থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের কে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। সঠিকভাবে পরিমিত পরিমাণে আতা খেলে, আতার মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদান শরীরকে বিভিন্নভাবে উপকার করে।।

    ribhat