Blog

  • আমড়া: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ঘরোয়া প্রতিকার

    আমড়া আমাদের কাছে খুবই পরিচিত একটি ফল। আমরা একে অতটা গুরুত্ব না দিলেও এর বেশ গুরুত্ব রয়েছে। এটি টক, কষযুক্ত এবং হালকা মিষ্টি স্বাদের হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম (Spondias pinnata)।এটি কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতে খেতে খুব ভালো লাগে। এটি দিয়ে আচার, জেলি, চাটনি ইত্যাদি তৈরি হয়ে থাকে। এছাড়া তরকারি রান্না করা হয়ে থাকে।  এর ফল, পাতা, ছাল ও শিকড়—সবকিছুই লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

    এটি পাচনতন্ত্রকে সবল সতেজ করে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। পিত্ত বৃদ্ধি হলে লু লাগলে গ্রীষ্মের ক্লান্ত হয়ে পড়লে গা বমি বমি করা প্রভৃতি রোগ উপশম হয়।

     আমড়ার মধ্যে ভিটামিন C অনেক বেশি মাত্রায় থাকে। যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শরীরে কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, ত্বক সুন্দর রাখে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। অনেক ক্ষেত্রে আমড়ার ভিটামিন C এর পরিমাণ কমলা লেবুতে থাকা ভিটামিন C এর সমান বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে।

    আমড়ার মধ্যে ভিটামিন A থাকে যা চোখের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে, রাতকানা প্রতিরোধে সাহায্য করে, ত্বক সুস্থ রাখে।

    আমড়ার মধ্যে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ থাকে। যা বিভিন্নভাবে  আমাদেরকে উপকার করে থাকে।

       বিশেষ করে আয়রন, ক্যালসিয়ামআয়রন – রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক। ক্যালসিয়াম – হাড় ও দাঁত কে শক্তিশালী করে তোলে। 

       আরও কিছু খনিজ উপাদান থাকে । পটাশিয়াম – রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে সহায়ক। ফসফরাস – কোষের বৃদ্ধিতে ও শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে থাকে। ম্যাগনেসিয়াম – স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়ক। জিঙ্ক – রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কপার – রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। 

        আমড়ার মধ্যে কিছু রাসায়নিক উপাদান রয়েছে – ফ্ল্যাভোনয়েড, পলিফেনল, ট্যানিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ, ক্যারোটিনয়েড, জৈব অ্যাসিড ইত্যাদী। এগুলো শরীরকে ফ্রি-র‍্যাডিক্যালের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে থাকে।

    ত্বকের জন্য আমড়া

    আমড়ার মধ্যে থাকা ভিটামিন C কোলাজেন তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকরী। যা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, বলিরেখা কমাতে সহায়তা করে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে।

    চুলের জন্য আমড়া

    আমড়ার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান সমূহ — চুলের গোড়া শক্ত করে থাকে, চুল পড়া কমাতে সাহায্য করে, মাথার ত্বক ভালো রাখে। 

    আয়ুর্বেদে আমড়ার ব্যবহার

    অরুচি দূর করতে

    কাঁচা আমড়া সামান্য বিট লবণ, ভাজা জিরা গুঁড়ো সহযোগে খেলে অরুচি দূর হয়, ক্ষুধা বাড়ায়।

    বদহজমে

    পরিমিত পরিমাণে আমড়ার চাটনি খেলে তা খাবার হজমে সাহায্য করে।

    কোষ্ঠকাঠিন্যে

    একটি পাকা আমড়া নিয়মিত খেলে এর মধ্যে আঁশ সমৃদ্ধ হওয়ায় তা মল নরম করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। 

    রক্তশূন্যতায়

    আমড়ার রসের সঙ্গে গুড় খেলে আয়রন শোষণ বাড়ে এবং এটি রক্তশূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে।

    আতিরিক্ত গরমে

    গরমকালে আমড়ার শরবত উপকারী। এটি শরীরের অতিরিক্ত তাপ কমায়।

    বমিভাব কমাতে

    বমি বমি ভাব দেখা দিলে কিংবা বমি হলে আমড়া তা দূর করতে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থায় অনেক নারী টক স্বাদের কারণে আমড়া খেয়ে স্বস্তি পেয়ে থাকেন।

    মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে

    আমড়া চিবিয়ে খেলে মুখে লালা নিঃসরণ বাড়ে এবং মুখ পরিষ্কার থাকে। এবং এটি মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। 

    স্কার্ভি প্রতিরোধে

    ভিটামিন C এর অভাব দেখা দিলে স্কার্ভি হয় তাই নিয়মিত আমড়া খেলে এর ঝুঁকি কমে।

    সর্দি-কাশিতে

    আমড়ার রস মধু সহযোগে খেলে সর্দি-কাশির থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। 

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় 

    উচ্চ ভিটামিন C শরীরে ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে তোলে। ফলে বিভিন্ন রোগে লড়াই করার শক্তি বৃদ্ধি পায়।

    বিশেষ সতর্কতা 

    আমড়ার মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদান উপকারী হলেও অতিরিক্ত আমড়া খেলে শরীরের বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। পেট খালি থাকলে আমড়া খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত আমড়া খেলে যে সব সমস্যা হতে পারে — 

    অম্বল বা বুক জ্বালাপোড়া :— আমড়াতে প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে। অতিরিক্ত পরিমাণে আমড়া খেলে এই অ্যাসিড পাকস্থলীতে অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এতে বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর বা অম্বল হতে পারে।

    গ্যাস ও পেট ফাঁপা :— আমড়ার থাকা উচ্চ ফাইবার হজমে সহায়তা করলেও অতিরিক্ত আমড়া খেলে তা পেটের মধ্যে অম্লীয় উপাদান বাড়িয়ে তোলে এবং হজমে গোলমাল পাকায়। ফলে গ্যাসের সমস্যা হতে পারে এবং পেট ফাঁপা ও পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

    দাঁতের এনামেল ক্ষয় :– আমড়ার তীব্র টক ভাব বা অ্যাসিড থাকে। যা দাঁতের সুরক্ষাকবচ ‘এনামেল’ কে নরম করে দেয়। অতিরিক্ত আমড়া চিবিয়ে খেলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে গিয়ে দাঁত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই আমড়া খাওয়ার পরই শুধুমাত্র পরিষ্কার জল দিয়ে ভালো করে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। কিন্তু ব্রাশ করবেন না। খাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট পর ব্রাশ করুন।

    অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির রোগে:– যে সমস্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত গ্যাস্ট্রিক বা হাইপার-অ্যাসিডিটির সমস্যা হয়ে থাকে, তাদেরকে খালি পেটে বা অতিরিক্ত পরিমাণে টক আমড়া খাওয়া উচিত নয়। 

    পাকস্থলীর আলসার রোগে :– যে সমস্ত ব্যক্তিদের আলসার বা পেটে ঘা আছে আমড়ার মধ্যে থাকা অ্যাসিড সেই ক্ষতকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এতে পেটে প্রচন্ড ব্যথা বা তীব্র জ্বালাপোড়া হতে পারে।

    সংবেদনশীল দাঁতের সমস্যা:– যাদের দাঁত শিরশিরানীর সমস্যা আছে বা ঠান্ডা-গরম লাগলে দাঁতের সমস্যা হয়, তারা আমড়া খাওয়ার পর অবশ্যই ভালো করে কুলকুচি করে মুখ ধুইবেন এবং দাঁতের মাজন ব্যবহার না করে ব্রাশ করে নেবেন, নাইলে শিরশিরানি আরও বাড়বে।

    লবণ ও মরিচ ব্যবহারে সতর্কতা:–  আমড়া কাটার পর প্রচুর পরিমাণে লবণ ও কাসুন্দি বা মরিচ মিশিয়ে খেলে অতিরিক্ত লবণ উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

  • আমড়া: একটি পুষ্টিগুণে ভরা ফল, কেন উপকারী?

    আমড়া: একটি পুষ্টিগুণে ভরা ফল 

    আমড়া এমন একটি ফল যা ভারতবর্ষ সহ দক্ষিণ এশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমরা একে আমড়া নামে চিনি তবে এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে, এর বৈজ্ঞানিক নাম (Spondias pinnata)। এর মধ্যে একটি বড় আঁটি থাকে। এর টক, কষযুক্ত এবং হালকা মিষ্টি স্বাদ জিভে জল আনিয়ে দেয়। এই ফলটি কাঁচা খাওয়া যায়। আবার, পাকা আমড়ার সুগন্ধ ক্ষুধা বাড়িয়ে তোলে। আমড়ার আচার, চাটনি, ভর্তা, ডাল, মোরব্বা কিংবা সরাসরি লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া—সেই পুরনো দিন থেকে খুবই জনপ্রিয়। 

            আমড়া আহারে রুচি বাড়িয়ে তোলে। আমড়ার আচার ভালো রাখতে মাঝে মাঝে তাকে রোদে দিতে হয়। আমড়া গাছ ১৫–২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে। এর ফল, পাতা, ছাল ও শিকড়—সবকিছুই লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে এটি বর্ষাকালে প্রচুর পরিমাণে ফলে একটি জনপ্রিয় ফল।

    আমরা সাধারণত দুই ধরনের আমড়া দেখতে পাই দেশি এবং বিলাতি আমড়া। 

    দেশি আমড়া

    দেশি আমড়া সাধারণত বিলাতি আমড়া থেকে ছোট আকারের হয়ে থাকে। দেশি আমড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটু টক হয়ে থাকে তবে পাকার পরে তা টক ও হালকা মিষ্টি স্বাদের হয়ে থাকে। ফলে এটি পেকে গেলে অনেকের কাছে বিলাতি আমড়ার থেকেও খুবই সুস্বাদু হয়ে থাকে। এটি দিয়ে আচার, চাটনি বা তরকারি রান্না করে বেশি খাওয়া হয়।

    বিলাতি আমড়া

    বিলাতি আমড়া দেশি আমড়ার থেকে আকারে বড় হয়ে থাকে। এতে মিষ্টি স্বাদের তুলনায় টক স্বাদের ভাগ খুবই কম বলে এটি কাঁচা অবস্থাতে খেতে খুব ভালো লাগে। তাই এটি কাঁচা অবস্থাতেই বেশি খাওয়া হয়। এর থেকে সুস্বাদু আচার ও জেলি তৈরি করা যায়।

    উভয় আমড়া তে ভিটামিন সি, ফাইবার, ক্যালসিয়াম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রভৃতি পুষ্টিকর উপাদান প্রচুর মাত্রায় থাকে। তবে দেশি আমড়ায় অম্লতা বা টক ভাব বেশি থাকার কারণে এটি মুখে রুচি ফেরাতে এবং কফ দূর করতে বেশি সাহায্য করে থাকে।

    পুষ্টিবিদদের মতামত অনুযায়ী, একটি আমড়ার মধ্যে প্রায় তিনটি আপেলের সমপরিমাণ পুষ্টি থাকে। একটি গোটা আমরা দৈনিক ভিটামিন সি এর চাহিদার ১০০% পূরণ করতে পারে। বিশেষ করে আপেলের চেয়ে আমড়াতে যে সমস্ত পুষ্টিকর উপাদান এর পরিমাণ অনেক বেশি এগুলি হল প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং আয়রন  ইত্যাদি 

    আমড়ার পুষ্টিগুণ

    ১০০ গ্রাম আমড়া থেকে প্রায় ৬৬ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি বা এনার্জি পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য আমড়ায় আনুমানিক যে পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়,  ক্রমানুসারে নিচে দেওয়া হলো।

    উপাদান পরিমাণ

    • জল : প্রায় ৮০–৮৬ গ্রাম
    • শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট : প্রায় ১৫ গ্রাম
    • খাদ্যআঁশ : প্রায় ২–৫ গ্রাম
    • প্রোটিন বা আমিষ : প্রায় ০.৫–১.১ গ্রাম
    • চর্বি বা ফ্যাট : প্রায় ০.১–০.৫ গ্রাম
    • অন্যান্য খনিজ পদার্থ : প্রায় ০.৫–১ গ্রাম

    খনিজ পদার্থ

    • ক্যালসিয়াম : প্রায় ৫৫ মিলিগ্রাম (০.০৫৫ গ্রাম)
    • আয়রন বা লৌহ : প্রায় ৩.৯ মিলিগ্রাম (০.০০৩৯ গ্রাম)

    এছাড়াও আমড়ার মধ্যে পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, কপার খনিজ পদার্থ থাকে

    ভিটামিনসমূহ 

    • ভিটামিন C : ৯২ মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় ৩৯% – ৪৯%)
    • ভিটামিন B-1 (থায়ামিন): ০.২৮ মিলিগ্রাম
    • ভিটামিন A (ক্যারোটিন) : ৮০০ মাইক্রোগ্রাম বা ০.৮ মিলিগ্রাম
    • ভিটামিন B-2 ( রিবোফ্লাভিন ) : ০.০৪ মিলিগ্রাম

    এছাড়াও ভিটামিন B-3 (নিয়াসিন), ভিটামিন B9 (ফলেট) অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়।

    আমড়া খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা

    খালি পেটে আমরা খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত লবণ ও মরিচ গুঁড়ো আমড়া তে মিশানো উচিত নয়। আমড়া খাওয়ার পরে ব্রাশ করা উচিত নয়।

    অতিরিক্ত আমড়া খেলে গ্যাস, অম্বল, হতে পারে এবং দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে পারে। 

    যে সমস্ত রোগীদের সতর্ক থাকা উচিত 

    অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির রোগী, পাকস্থলীর আলসার রোগী, এবং যে সমস্ত ব্যক্তিদের দাঁত সংবেদনশীল তাদেরকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবে আমরা খাওয়া উচিত।

    উপসংহার

    টক, কষায় এবং মৃদু মিষ্টি স্বাদের সমষ্টি হল আমড়া। এটি শুধু মুখরোচক ফল নয়, এটি ভিটামিন C তে ভরপুর। এছাড়াও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন খনিজে সমৃদ্ধ পরিমাণে থাকায় এটি একটি পুষ্টির ভাণ্ডার। আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় ক্ষুধামন্দা, বদহজম, শরীরের অতিরিক্ত তাপ, সর্দি-কাশি, দুর্বলতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘদিন ধরে আমড়ার ব্যবহার হয়ে আসছে। পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত আমড়া খাওয়া শরীরের জন্য খুবই উপকারী।

  • আখ: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ঘরোয়া উপাচার

    আখ আখের রস খাইনি এমন কেউ হয়তো নেই। সংস্কৃতিকে ইক্ষু বলা হয়। হিন্দিতে বলা হয় গন্না। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল Saccharum officinarum। ভারতবর্ষে প্রচুর পরিমাণে আখ চাষ হয়ে থাকে। আখের রস একটি শীতল এবং পুনর্জীবন দায়ক ও স্ফূর্তিদায়ক রস। প্রতি ১০০ গ্রাম আখ থেকে প্রায় ৫৮ থেকে ৭৪ কিলোক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। আখের রসে সুক্রোজ, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শর্করা পাওয়া যায়। যা শরীরের মধ্যে তাৎক্ষণিক শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। আখে পাওয়া যায় ফ্ল্যাভোনয়েড, পলিফেনল, ফেনোলিক প্রভৃতি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এগুলি কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

    • আখে পটাশিয়াম থাকে যা হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমে সহায়ক এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
    • অখে ক্যালসিয়াম ও নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকে যা হার ও দাঁত মজবুত রাখে।
    • আখের মধ্যে থাকা ম্যাগনেসিয়াম পেশি ও স্নায়ুর কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।
    • আখের মধ্যে থাকা আয়রন রক্ত তৈরিতে সহায়ক।

    সর্বোপরি আখ হল তাৎক্ষণিক শক্তির উৎস।

    বিভিন্ন রোগে আখের উপকারিতা

    প্রচন্ড গরমে 

    গরমে অত্যন্ত শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়লে এক গ্লাস আখের রসেই সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়। 

           আবার ঘরোয়া উপায়ে এক গ্লাস আখের রস এর সঙ্গে অর্ধেক লেবু সামান্য আদা মিশিয়ে পান করলে ক্লান্তি দূর হয় সতেজতা আনে।

    পিত্ত রোগে 

    শরীরে পিত্ত বেড়ে গেলে, হাত-পা জ্বালা করে। এই অবস্থায় এবং পিত্তজনিত রোগে আখের রস নিয়মিত খেলে খুবই উপকার পাওয়া যায়। 

    লু লাগা 

    প্রচন্ড রৌদ্রতাপে লু লাগলে, শরীর খুব খারাপ হয়। এই অবস্থায় দুবেলা আখের রস খেলে উপকার পাওয়া যায়। রোগ উপশম হয়।

    লিভারের জন্য 

     আখের রস লিভারের জন্য বেশ উপকারী। প্রচলিত আয়ুর্বেদে আখের রসকে যকৃতের উপকারকারী বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

    প্রস্রাবে জ্বালা ও মূত্রনালীর স্বাস্থ্যে সহায়ক

    আখের রস পান করলে মূত্রের প্রবাহ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে বলে আয়ুর্বেদে উল্লেখ আছে। আখের রসের সঙ্গে সামান্য ধনিয়া ভিজানো জল একসঙ্গে মিশিয়ে পান করলে প্রস্তাবে জ্বালা দূর হয়।

    শুকনো কাশি 

    শুকনো কাশি হলে এক গ্লাস আখের রসের সঙ্গে 8 থেকে 10 টা তুলসী পাতা একসঙ্গে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

    হজমে সহায়ক

    আখের রস এর সঙ্গে সামান্য আদা একসঙ্গে মিশিয়ে পান করলে তা হজমতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে।

    কোষ্ঠকাঠিন্য

    সকালে যদি পরিমিত আখের রস খাওয়া যায়  মলত্যাগ সহজ হতে পারে।

    জন্ডিসে

    প্রাচীন আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে আখের রস যকৃত এর খুবই উপকারী করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

           তবে জন্ডিসের চিকিৎসায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

    সতর্কতা

    যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদেরকে আখের রস সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

    আখের রসের দোকানে সদ্য পিষে বার করা রস হলে তবেই গ্রহণ করবেন। 

    দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা আখের রস পান করা উচিত নয়।

    কিডনি বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরই নিয়মিত বেশি পরিমাণে আখের রস গ্রহণ করবেন।

  • আখ: প্রকৃতির দেওয়া এক মিষ্টি উপহার, এটি উপকারী কেন?

    আখ — প্রকৃতির দেওয়া মিষ্টি রসে ভরা এক অপূর্ব উপহার

    সংস্কৃতে কে ইক্ষু বলা হয়। হিন্দিতে আখ গন্না নামে পরিচিত। আখ মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় বা উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ফসল।  বাজারে কিংবা গ্রামে যখনই আখের রসের দোকান দেখা যায় কিছুক্ষণের মধ্যে ভিড় পড়ে যায়। গরমের সকালে অথবা দুপুরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সদ্য পেষা আখের রসের গ্লাসে হালকা চুমুক দিলেই ক্ষণিকের মধ্যেই শরীর ও মন জুড়ে প্রশান্তি অনুভূত হয়, আখের রস সত্যিই একটি শীতল এবং পুনর জীবনদায়ক ও স্ফূর্তিদায়ক রস। লম্বা, সবুজ, বেগুনি বা হালকা হলুদ রঙের এই সরু কাণ্ডের মধ্যে লুকিয়ে থাকে মিষ্টি, স্নিগ্ধ ও সুগন্ধি রসভাণ্ডার। আজকে মিষ্টির পূর্বপুরুষ বললেও চলে কারণ আখ দিয়েই গুড়, চিনি ইত্যাদি তৈরি হয়ে থাকে। আখ শুধু গুড় ও চিনি তৈরির কাঁচামাল নয়; এটি আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    আখ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে পরিচিত হলেও এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল Saccharum officinarum। এটি ঘাস পরিবারের অন্তর্গত একটি বহুবর্ষজীবী সুমিষ্ট রসালো উদ্ভিদ যার মিষ্টতা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের হৃদয় জয় করেছে।

    আখের প্রধান অংশ হলো জল ও প্রাকৃতিক শর্করা( Carbohydrates)। আখ থেকে প্রায় ৫৮ থেকে ৭৪ কিলো ক্যালোরি ( Kcal ) শক্তি পাওয়া যায়। যা দীর্ঘ ক্লান্তি বা পরিশ্রমের পর অল্পক্ষণের মধ্যেই শরীরে শক্তির যোগান দেয়। এর প্রজাতি, মাটি ও আবহাওয়া অনুযায়ী এর মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদানের সামান্য তারতম্য হতে পারে। প্রতি ১০০ গ্রাম আখের পুষ্টিগুণ পরিমাণের ভিত্তিতে ক্রমানুসারে নিচে দেওয়া হল—

    প্রধান পুষ্টি উপাদান 

    ক্যালোরি (Energy): প্রায় 58 – 74 কিলোক্যালরি

    জল: প্রায় 70–75 গ্রাম

    প্রাকৃতিক শর্করা : প্রায় 9.8 – 13 গ্রাম

    কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 13–25 গ্রাম

    খাদ্য আঁশ বা ডায়েটারি ফাইবার : প্রায় 0.5–1 গ্রাম

    প্রোটিন: প্রায় 0.2–0.5 গ্রাম

    ফ্যাট: প্রায় 0.2 গ্রাম বা কম

    খনিজ উপাদান (Minerals)

    পটাসিয়াম : প্রায় 11 – 160 মিলিগ্রাম

    ক্যালসিয়াম : প্রায় 7 – 18 মিলিগ্রাম

    ফসফরাস : প্রায় 2 – 22 মিলিগ্রাম

    ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 3 – 12 মিলিগ্রাম

    আয়রন : প্রায় 0.1 – 0.4 মিলিগ্রাম

    সোডিয়াম : প্রায় 3 – 17 মিলিগ্রাম

    ভিটামিন (Vitamins)

    ভিটামিন সি : প্রায় 2 – 3 মিলিগ্রাম

    ভিটামিন B1 : অল্প

    ভিটামিন B2 : অল্প

    ভিটামিন B3 : অল্প

    ভিটামিন B6 : অল্প

    আখের সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান হলো সুক্রোজ, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শর্করা। এগুলো শরীরে মধ্যে অতি দ্রুত শক্তির জোগান দেয়। আখে পাওয়া যায় ফ্ল্যাভোনয়েড, পলিফেনল, ফেনোলিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

    উপসংহার

    আখ কে একটি মিষ্টি ফসল ছাড়াও; একে বলা যায় এটি শক্তি, প্রশান্তি, পুষ্টির এক অপূর্ব সমন্বয়। গরম দুপুরে কিংবা হালকা ঠান্ডায় ঠান্ডা আখের রসের গ্লাসে একটি চুমুক যেমন মুহূর্তে ক্লান্তি দূর করে দেয়, তেমনি এতে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা, খনিজ ও আয়ুর্বেদীয় গুণাবলি একে প্রকৃতির অন্যতম উপকারী উপহার করে তুলেছে।

  • আঙুর: রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ঘরোয়া উপাচার

    আঙ্গুর হল প্রকৃতির একটি আশ্চর্য ফল। এই ফল খুব তাড়াতাড়ি ও খুব সহজেই শরীরকে সুস্থ সবল ও শক্তিশালী করে করে তোলার শক্তি রাখে। মিষ্টিও টক রসে ভরা ছোট্ট একটি আঙুরের মধ্যে লুকিয়ে আছে জল, প্রাকৃতিক শক্তি, খনিজ, ভিটামিন ও অসংখ্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভাণ্ডার। তাই স্বাদ এবং স্বাস্থ্যের  উপহার হিসেবে আঙুর প্রাচীনকাল থেকে মানুষের প্রিয় ফলগুলোর একটি। 

    কালো ও বেগুনি আঙুরের খোসায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ সাধারণত সব থেকে বেশি এবং লাল আঙুরের খোসায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ মাঝারি। সাদা বা সবুজ আঙুরে তুলনায় একদমই কম। আঙুরের প্রায় ৭০–৮০ শতাংশ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তার খোসা ও বীজে কেন্দ্রীভূত থাকে। আঙুর প্রাচীনকাল থেকে খাদ্য, পানীয় এবং ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুকনো আঙুর অর্থাৎ কিশমিশে জলীয় অংশ কমে যাওয়ায় শক্তি (ক্যালরি) ও প্রাকৃতিক শর্করা অনেক বেশি ঘনীভূত হয়ে থাকে।

        আয়ুর্বেদে আঙুর দ্রাক্ষা নামেও পরিচিত। আয়ুর্বেদে বলা হয় “সঠিক পরিমাণে খাওয়া দ্রাক্ষা শরীরে পুষ্টি, স্নিগ্ধতা ও প্রশান্তি আনে”। তাই একে অনেক সময় “ফলের মধ্যে অমৃতসম” বলেও বর্ণনা করা হয়ে থাকে।

    বিশেষ করে আঙুর এর খোসা এবং এর দানাতে বিভিন্ন মূল্যবান উপাদানের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। যা কোষকে মুক্ত মৌলের (Free Radical) ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক দেশে আঙুর পাতা রান্নায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে । আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় অনেক সময় আঙুর এর পাতা দিয়ে প্রস্তুত করা নির্যাস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

    আয়ুর্বেদে দ্রাক্ষার বিভিন্ন রূপ

    আয়ুর্বেদে কেবল তাজা আঙুর নয় আঙুর এর আরও কয়েকটি রূপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে—

    দ্রাক্ষা (তাজা আঙুর): শরীর শীতল রাখার জন্য।

    শুষ্ক দ্রাক্ষা (কিশমিশ): দুর্বলতা ও কোষ্ঠকাঠিন্যে দূর করতে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত।

    দ্রাক্ষাসব: এটি এক ধরনের প্রাচীন আয়ুর্বেদীয় প্রস্তুতি, যা নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এর ব্যবহার করা হয়।

    বিভিন্ন রোগে আঙুরের উপকারিতা 

    শিশুদের দাঁত ওঠা 

    এসব শিশুদের দাঁত ওঠার সময় খুব কষ্ট পায়। তাদের নিয়মিতভাবে আঙ্গুরের রস খাওয়ালে সহজেই দাগ উঠবে।

    দাঁতের বেদনা 

     মাড়ি ফুলে গেলে, দাঁতের ব্যথা হলে, দাঁত নড়বড় হয়ে গেলে আঙুর চিবিয়ে খেলে খুব উপকার পাবেন। 

    দেহের উজ্জ্বলতা কম হলে 

    সারা বছরের মধ্যে যদি তিন মাস নিয়মিতভাবে আঙ্গুরের রস খাওয়া যায় তাহলে চেহারার উজ্জ্বলতা দেখা দেবে।

    বৃক্ক শুল( Kidney Stone)

    ২০ গ্রাম আঙ্গুরের পাতা নিয়ে জল দিয়ে পিষে ঠান্ডা জল সহ গুলে মিশ্রণ তৈরি করে নিয়ে কাপড়ে ছেঁকে রোগীকে খাওয়ালে রোগ উপশম হয়। 

    স্ত্রীরোগ 

    প্রায়ই স্ত্রী লোকদের শ্বেতপ্রদর হয়ে থাকে। ফলে হজমের সমস্যা দেখা দেয়, দেহটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে। মাথার যন্ত্রণা হয়, পেট ফুলে যায়, ঠিক নিয়মিত কষ্ট পরিষ্কার হয় না 

            এই অবস্থায় প্রত্যেকদিন সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিতভাবে এক চামচ আঙ্গুরের রস খেলে রোগ উপশম হয়। 

             গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে আঙ্গুরের রস অত্যন্ত উপকারী যদি কোন গর্ভবতী নারী নিয়মিতভাবে আঙুর খায়। তাহলে মূর্ছা, মাথা ঘোরা, দাঁতের ব্যথা, মাথার যন্ত্রণা প্রভৃতি উৎসর্গ দূর হবে এবং সেই সঙ্গে তার গর্ভস্থ সন্তানও ঠিকমতো বেড়ে উঠবে।

    কোষ্ঠকাঠিন্য

    রাতের বেলা কিছু কিশমিশ জলের মধ্যে ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই জল ও কিশমিশ সহ খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। এটি প্রচলন রয়েছে।

    গলা শুকিয়ে যাওয়া ও কণ্ঠের কর্কশতা

    যাদের গলা শুকিয়ে যায় ও কন্ঠের কর্কশতা দেখা দিলে তাদেরকে দ্রাক্ষার রস বা ভেজানো কিশমিশ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

    অতিরিক্ত তৃষ্ণা ও শরীরের জ্বালা

    অতিরিক্ত তৃষ্ণা পেলে কিংবা শরীর জ্বালা করলে দ্রাক্ষা শীতল প্রকৃতির হওয়ায় দ্রাক্ষার শরবত খেলে খুব ভালো উপকার দেয়।

    দুর্বলতা ও অবসাদ

    আঙুরের রস ও দুধের সংমিশ্রণ কিছু আয়ুর্বেদীয় পদ্ধতিতে শক্তিবর্ধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

    অম্লতা বা হালকা পেটের জ্বালা

    অম্লতা বা হালকা পেটের জ্বালার ক্ষেত্রে মিষ্টি আঙুর পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে তা অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়।

    শুকনো কাশি

    কিশমিশ সেদ্ধ জল বা আঙ্গুরের রস কে উষ্ণ গরম করে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়।

    হৃদরোগে

    আঙ্গুরের মধ্যে থাকা পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তনালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। হলে হৃদপিণ্ডের দুর্বলতা দূর হয়।

    হজমে সহায়ক

    রাতে ১৫–২০টি কিশমিশ জলে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে কিশমিশ ও সেই জল খান। এছাড়া তাজা আঙুর খোসা ও দানা শুদ্ধ খেলে এর মধ্যে থাকা ফাইবার ও প্রাকৃতিক জলীয় খাদ্য হজমের জন্য খুব উপকারী।

    ত্বকের জন্য

    আঙ্গুরের মধ্যে ভিটামিন C ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রচুর মাথায় থাকায়  ত্বকের স্বাভাবিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

    চোখের জন্য

     আঙ্গুরের মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান চোখের কোষকে অক্সিডেটিভ চাপ থেকে রক্ষা করতে  ভূমিকা রাখতে পারে।

    আঙুরের ফেস প্যাক

    আঙুরের রস, মধু ও সামান্য দই মিশিয়ে সেই মিশ্রণ ত্বকে ব্যবহার খুব উপকার দেয়।

  • আঙুর: রস, রূপ, পুষ্টির অমূল্য উপহার, কিভাবে উপকারী?

    একটি টসটসে আঙুর মুখে দেওয়ার পরে অনুভব হয় মসৃণ পাতলা খোসার মৃদু টান, তারপর হালকা চাপে রসের বিস্ফোরণ। মিষ্টি ও হালকা টক স্বাদের সেই মিষ্টি ছোঁয়া মুহূর্তেই জিভ ভিজিয়ে দেয়। প্রচন্ড গরমের ক্লান্ত দুপুরে হোক বা শীতের শীতল অলস বিকেলে, মুঠো ভরা কিছু ঠান্ডা আঙুর যেন প্রকৃতির তৈরি ছোট্ট মধুর ভাণ্ডার। শুধু স্বাদের নয়, প্রাচীনকাল থেকেই আয়ুর্বেদেও আঙুরকে শক্তিবর্ধক ও রোগ প্রতিরোধে উপকারী ফল হিসেবে মূল্য দেওয়া হয়েছে।

    আঙ্গুর আমাদের কাছে পরিচিত এবং অত্যন্ত পছন্দকর একটি ফল। আঙ্গুরের একটি বৈজ্ঞানিক নাম ও রয়েছে। আঙুরের বৈজ্ঞানিক নাম হলো Vitis vinifera।

    কালো, লাল, সবুজ—এই তিনটি রঙের আঙুর আমরা বাজারে দেখে থাকি। পুষ্টিগুণে ক্যালোরি, ফাইবার বা ভিটামিনের দিক থেকে খুব বেশি পার্থক্য থাকেনা, তবে রঙের ভিত্তিতে এদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টের মাত্রায় পার্থক্য থাকে। রঙের গাঢ়ত্ব অনুসারে পুষ্টির তারতম্য নিচে আলোচনা করা হলো :

    কালো আঙুর (Black Grapes) —

     অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের রাজা- কালো বা গাঢ় বেগুনি রঙের আঙুরকে পুষ্টিগুণের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করা হয়। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর মাত্রা সর্বোচ্চ পরিমাণে থাকে। অ্যান্থোসায়ানিন (Anthocyanin) এবং রেসভেরাট্রল (Resveratrol) থাকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে। এই কারণেই এর রঙ কালো হয়ে থাকে।

    উপকারিতা: মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধতে, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধতে এবং ক্যানসার প্রতিরোধ করতে সবচেয়ে কার্যকরী। রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে এবং ত্বককে বার্ধক্যের হাত থেকে রক্ষা করতে , হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে সব চেয়ে বেশি সাহায্য করে।

    লাল আঙুর (Red Grapes) — 

    লাল আঙুর পুষ্টির দিক থেকে কালো আঙুরের খুব কাছাকাছি এবং সবুজ আঙুরের থেকে এগিয়ে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্থোসায়ানিন (Anthocyanin) এবং রেসভেরাট্রল (Resveratrol) থাকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকলেও কালো আঙ্গুরের চেয়ে একটু কম। এতে কোয়ারসেটিন থাকে।

    উপকারিতা: লাল আঙুর হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে  অত্যন্ত উপকারী। এটি ধমনীকে নমনীয় করে তোলে, রক্তচাপ কমায় এবং রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (LDL) এর মাত্রা কমাতে সহায়ক।

    সবুজ আঙুর (Green Grapes) — 

    ওয়ান ও এনার্জির উৎস সবুজ আঙুর খেতে টক-মিষ্টি মিশ্রিত স্বাদের হয়ে থাকে এবং এতে গাঢ় রঙের পিগমেন্টগুলো থাকে না। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মাঝারি পরিমানে থাকে। এতে রেসভেরাট্রল বা অ্যান্থোসায়ানিনের পরিমাণ একদমই কম বা থাকে না বললেই চলে। গাঢ় রঙের পিগমেন্টগুলো না থাকার কারণে এর রং সবুজ। তবে এতে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে এবং পটাশিয়াম ভালো পরিমাণে থাকে।

    উপকারিতা: সবুজ আঙুরে জলের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে দারুণ ভূমিকা পালন করে। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে দারুণ সাহায্য করে এবং পরিপাকতন্ত্রের জন্য বেশ উপকারী।

    সারকথা: যদি সর্বোচ্চ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বার্ধক্যরোধী উপকারিতা চান, তবে কালো ও লাল আঙুর সবচেয়ে ভালো। আর যদি গরমে শরীরকে সতেজ ও হাইড্রেটেড রাখতে চান, তবে সবুজ আঙুর দারুন ভূমিকা পালন করে।

    বিভিন্ন গবেষণাতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা আঙ্গুরে  সব থেকে বেশি পরিমাণে জল থাকে (প্রায় 80-81%) থেকে। প্রতি ১০০ গ্রাম আঙ্গুরে যে সমস্ত মূল পুষ্টি উপাদান, খনিজ এবং ভিটামিনগুলি থাকে পরিমাণগত ভাবে ক্রমানুসারে নিচে দেওয়া হলো :

    উপাদানের আনুমানিক পরিমাণ

    • জল (Water ): প্রায় ৮০–৮১ গ্রাম
    • কার্বোহাইড্রেট (Carbohydrates): প্রায় ১৮–১৯ গ্রাম
    • প্রাকৃতিক শর্করা (Natural sugars): প্রায় ১৫–১৬ গ্রাম
    • খাদ্য আঁশ (Fiber): প্রায় ০.৮–১ গ্রাম
    • প্রোটিন (Protein): প্রায় ০.৬–০.৮ গ্রাম
    • ফ্যাট (Fat): প্রায় ০.১–০.২ গ্রাম

    খনিজ পদার্থ (Minerals)

    খনিজ এর আনুমানিক পরিমাণ

    • পটাশিয়াম (Potassium): প্রায় ১৯০–২০০ মিলিগ্রাম
    • ফসফরাস (Phosphorus): প্রায় ২০ মিলিগ্রাম
    • ক্যালসিয়াম (Calcium): প্রায় ১০ মিলিগ্রাম
    • ম্যাগনেসিয়াম (Magnesium): প্রায় ৭ মিলিগ্রাম
    • সোডিয়াম (Sodium): প্রায় ২–৩ মিলিগ্রাম
    • আয়রন (Iron): প্রায় ০.৩–০.৪ মিলিগ্রাম
    • জিঙ্ক (Zinc): প্রায় ০.০৭ মিলিগ্রাম
    • ম্যাঙ্গানিজ (Manganese): প্রায় ০.০৭ মিলিগ্রাম
    • কপার (Copper): প্রায় ০.১ মিলিগ্রাম

    ভিটামিন (Vitamins)

    • ভিটামিন C: ৩.২ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ৪%)
    • ভিটামিন K: ১৪.৬ মাইক্রোগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১২ থেকে ১৪%)
    • ভিটামিন B6: ০.০৮৬ মিলিগ্রাম ( দৈহিক চাহিদার প্রায় ৭%)
    • থায়ামিন (B1): ০.০৬৯ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ৬%)
    • রিবোফ্লাভিন (B2): ০.০৭ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ৬%)
    • নিয়াসিন (B3): ০.১৮৮ মিলিগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১%)
    • ফোলেট (B9): ২ মাইক্রোগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১ পার্সেন্ট)
    • ভিটামিন E: ০.১৯ মিলিগ্রাম  (পরিমাণ খুবই অল্প দৈহিক চাহিদার প্রায় 1%)
    • ভিটামিন A :৩ মাইক্রোগ্রাম (দৈহিক চাহিদার প্রায় ১% এর থেকেও কম। বিটা-ক্যারোটিন আকারে খুবই অল্প পরিমাণে)

    আঙুরের বিশেষ জৈব উপাদান

    আঙুরের প্রকৃত শক্তি শুধু ভিটামিন নয়, এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টেও আছে।

    রেসভেরাট্রল (Resveratrol)

    বিশেষ করে কালো, হালকা বেগুনি ও লাল আঙুরের খোসার মধ্যে থাকে। এটি কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

    ফ্ল্যাভোনয়েড

    আঙ্গুরের মধ্যে কুয়ারসেটিন, ক্যাটেচিন, অ্যান্থোসায়ানিন ইত্যাদি ফ্ল্যাভোনয়েড গুলি রয়েছে। এগুলো শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

    ট্যানিন

    হজমশক্তি উন্নত করতে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতায় অবদান রাখে।

    জৈব অ্যাসিড

    আঙ্গুর এর মধ্যে টারটারিক অ্যাসিড, ম্যালিক অ্যাসিড, সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে। এগুলি আঙুরের স্বাদে এবং হজমে ভূমিকা রাখে।

    আঙুর খাওয়ার সময় সতর্ক থাকবেন করা ?

    • Type 2 Diabetes আক্রান্ত ব্যক্তিদের আঙুর খাওয়ার সময় পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে খাওয়া উচিত।
    • কিডনির কিছু রোগে পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে। তাই অতিরিক্ত আঙুর খেলে সমস্যা হতে পারে 
    • আঙুর ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া উচিত, কারণ আঙ্গুরের খোসায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকতে পারে যা খালি চোখে দেখা যায় না।
    • ছোট শিশুদের গোটা আঙুর খাওয়ালে শ্বাসরোধের ঝুঁকির থাকতে পারে। শ্বাসরোধের ঝুঁকি এড়াতে আঙুর কেটে দেওয়া ভালো।

    আঙুর খাওয়ার সেরা উপায়

    • ভালোভাবে ধুয়ে খোসা না ছাড়িয়ে দানা না ফেলে সরাসরি খাওয়া।
    • ফলের সালাদের মধ্যে আঙুর রাখতে অনেকেই খুব পছন্দ করেন।
    • দই বা ওটসের সঙ্গে আঙুর খাওয়া বেশ প্রচলিত।
    • ঠান্ডা করে ফ্রিজে রেখে আঙুর খাওয়া অনেকে পছন্দ করেন। 
    • অনেকেই আঙ্গুরের তাজা রস বের করে খেতে পছন্দ করেন।
    • কিশমিশ আকারে আঙুর খাওয়া বেশ প্রচলিত ।

    একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সাধারণভাবে প্রতিদিন প্রায় ১৫০–২০০ গ্রাম আঙুর অথবা ১ কাপ আঙুর এর রস পরিমিত পরিমাণ হিসেবে ধরা হয়। তবে শারীরিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও বয়স অনুযায়ী এটি আলাদা হতে পারে।

    উপসংহার

    আঙুর এমন একটি ফল যাকে দেখলে মনে হবে যেন সবুজ, লাল বা বেগুনি রঙের ছোট ছোট রত্ন। গাছে পাকা প্রতিটি আঙুর এর ভেতরে জমা থাকে মিষ্টি ও টক স্বাদের মিশ্রিত রস যা মুখে দিলেই ক্ষণিকের মধ্যে শরীর ও মন সতেজ হয়ে ওঠে। এছাড়া এর মধ্যে রয়েছে অগণিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং হাজার বছরের ভেষজ ইতিহাস।

  • আনারস: রস, সুবাস ও পুষ্টির ভাণ্ডার এবং কেন উপকারী?

    আনারস: রস, সুবাস ও পুষ্টির ভাণ্ডার। আনারস ফলটি আমাদের সকলের কাছেই খুবই পরিচিত এবং খুব প্রিয়। কিছুটা অতীতে গিয়ে দেখলেই মনে পড়ে সেই সময় যখন আমরা আনারস খাচ্ছিলাম । গ্রীষ্মের দুপুরে একটি পাকা আনারস কেটে তার সোনালি-হলুদ রসালো মিষ্টি ও হালকা টক স্বাদের অপূর্ব মেলবন্ধনে ভরা শাঁস মুখে দিতেই মনমাতানো সুগন্ধ আর রসের ঝর্ণাধারা। মনে পড়লেই মুহূর্তেই জিভে জল এনে দেয়। আনারস শুধু যে একটা সুস্বাদু ফল তা নয়, এটি প্রকৃতির দেওয়া এক অসাধারণ পুষ্টি-ভাণ্ডার, যা আমাদের শরীরকে সতেজ রাখার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে আমাদের স্বাস্থ্যের উপকার প্রদান করে ।

    আনারসের পরিচয়

    আমরা সকলে আনারসকে আনারস নামে চিনলেও এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। আনারসের বৈজ্ঞানিক নাম হল Ananas comosus। এটি উষ্ণ ও আদ্রতা যুক্ত আবহাওয়া অঞ্চলে ভালো জন্মায়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ও আনারস চাষ বিপুল পরিমাণে হয়ে থাকে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কেরালায় আনারসের চাষ খুব ভালো হয়।

    (USDA) এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা আনারসে সব থেকে বেশি পরিমাণে জল থাকে (প্রায় ৮৬%) এবং এর থেকে প্রায় ৫০ কিলো ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম আনারসে যে সমস্ত মূল পুষ্টি উপাদান, খনিজ এবং ভিটামিনগুলি থাকে পরিমাণগত ভাবে ক্রমানুসারে নিচে দেওয়া হলো :

    মূল পুষ্টি উপাদান ( Macronutrients ) — গ্রাম ( g ) এককে

    ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট বা প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে জলীয় অংশের পর কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ সবথেকে বেশি।

    • জল ( Water ) : প্রায় 86.00 গ্রাম ( আনারসের সিংহভাগই হলো জল )।
    • কার্বোহাইড্রেট ( Carbohydrates ) : প্রায় 13.1 গ্রাম ( এর মধ্যে প্রায় 9.8 গ্রামই প্রাকৃতিক চিনি বা সুগার যেমন— ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ ও গ্লুকোজ )।
    • খাদ্য আঁশ ( Dietary Fiber ) : 1.40 গ্রাম ( হজমশক্তি বাড়াতে ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সহায়তা করে )।
    • প্রোটিন ( Protein ) : 0.54 গ্রাম ( খুবই সামান্য পরিমাণে থাকে )।
    • চর্বি বা ফ্যাট ( Total Fat ) : 0.12 গ্রাম ( ফ্যাটের পরিমাণ প্রায় নেই বললেই চলে।, তাই ওজন বাড়ে না)।

    খনিজ উপাদান ( Minerals ) — মিলি গ্রাম (mg) এককে

    আনারসে ভরপুর মাত্রায় খনিজ উপাদান রয়েছে। তার মধ্যে পটাশিয়ামের মাত্রা সবচেয়ে বেশি, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে থাকে।

    • পটাশিয়াম ( Potassium ) : প্রায় 109 – 115 মিলি গ্রাম (হৃদযন্ত্র সুস্থ সবল রাখতে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে)।
    • ক্যালসিয়াম ( Calcium ) : প্রায় 13 -18 মিলি গ্রাম (যা হাড় ও দাঁতকে মজবুত করে তোলে )।
    • ম্যাগনেসিয়াম ( Magnesium ) : প্রায় 12 গ্রাম (মাংসপেশি ও স্নায়ু কে সচল রাখে )।
    • ফসফরাস ( Phosphorus ) : প্রায় 8 মিলি গ্রাম (কোষের শক্তি উৎপাদন করতে সাহায্য করে )।
    • ম্যাঙ্গানিজ (Manganese ) : 0.927 মিলি গ্রাম (মানুষের দৈনিক প্রয়োজনীয় ম্যাঙ্গানিজের প্রায় 44% পর্যন্ত পূরণ করে ও হাড়ের গঠনে এটি অত্যন্ত জরুরি )।
    • আয়রন বা লৌহ ( Iron ): প্রায় 0.28 মিলি গ্রাম (রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া এর মত রোগ দূর করতে সাহায্য করে )।
    • জিংক ( Zinc ) : প্রায় 0.10 মিলি গ্রাম ( রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে )।
    • কপার বা তামা (Copper) : প্রায় 0.18 মিলি গ্রাম ( যা দৈনিক চাহিদার প্রায় 20% )।
    • সোডিয়াম ( Sodium ) : প্রায় 1 মিলি গ্রাম ( এর পরিমাণ অত্যন্ত কম)।

    ভিটামিন সমূহ ( Vitamins ) — মিলি গ্রাম ( mg ) ও মাইক্রো গ্রাম ( µg ) এককে

    আনারসের মধ্যে যে সমস্ত ভিটামিন রয়েছে তার মধ্যে ভিটামিন সি সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে, যা মানুষের দৈনিক চাহিদার অর্ধেকের ও বেশি।

    • ভিটামিন C ( Vitamin C ): প্রায় 47.8 মিলি গ্রাম (এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ত্বক ভালো রাখে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে )।
    • ভিটামিন B-3 / নিয়াসিন (Niacin): প্রায় 0.489 মিলি গ্রাম (হজম প্রক্রিয়াতে সাহায্য করে)।
    • ভিটামিন B-5 / প্যান্টোথেনিক ( pantothenic ) অ্যাসিড : প্রায় 0.205 মিলি গ্রাম ( লিভারে ফ্যাট বা লিপিড বিপাকে অংশ নেয় )।
    • ভিটামিন B-1 / থায়ামিন ( Thiamin ) : প্রায় 0.079 গ্রাম ( কার্বোহাইড্রেট থেকে শক্তিতে রূপান্তর করে )।
    • ভিটামিন B-6 / পাইরিডক্সিন(Pyridoxine) : প্রায় 0.110 মিলি গ্রাম ( মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য বজায় রেখে এবং স্নায়ুকোষের সুরক্ষা প্রদান করে)।
    • ভিটামিন B-2 / রিবোফ্লাভিন (Riboflavin) : প্রায় 0.025 মিলি গ্রাম (ত্বক ও চোখের জন্য খুবই উপকারী)।
    • ভিটামিন B-9 / ফোলেট ( Folate ) : প্রায় 18 মাইক্র গ্রাম ( µg ) (নতুন কোষ তৈরিতে এবং রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে)।
    • ভিটামিন A ( Vitamin A / RAE ) : প্রায় 3.00 মাইক্রো গ্রাম ( µg ) (চোখের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে)।

    এছাড়াও ভিটামিন K এবং ভিটামিন E এর মাত্রা অত্যন্ত সামান্য ।

    আনারসের সমস্ত উপাদানের মধ্যে একটি মূল্যবান উপাদান হলো ব্রোমেলিন। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি বিভিন্নভাবে শরীরকে সুস্থ সবল রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

    আনারস খাওয়ার সতর্কতা

    আনারস বিভিন্নভাবে আমাদেরকে উপকার করলেও এটি বেশি মাত্রায় খেলে আমাদের ক্ষতিও হতে পারে।

    অতিরিক্ত আনারস খেলে অম্বল বা পেটের ব্যাথা হতে পারে।

    অনেকেরই আনারসের এলার্জি থেকে থাকে তাই যাদের আনারসে অ্যালার্জি আছে তারা আনারস এড়িয়ে চলুন।

    ডায়াবেটিস রোগীরা বেশি পরিমাণে আনারস খেলে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই পরিমিত পরিমাণে খাবেন।

    গর্ভাবস্থার সময় স্বাভাবিক পরিমাণে আনারস নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয় তাই খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

    যারা রক্ত পাতলা করার ঔষধ সেবন করছেন তারা কম মাত্রায় আনারস সেবন করবেন । অতিরিক্ত আনারস সেবনে রক্ত আরো পাতলা হয়ে গিয়ে রক্তপাত ঘটতে পারে। তাই আগে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে আনারস সেবন করবেন।

    উপসংহার

    আনারস, রসে ভরা এমন একটি ফল, যার প্রতিটি কামড়ে এক অত্যন্ত রসালো মিষ্টি স্বাদ এবং মনভোলানো হালকা সুবাস এবং অসংখ্য পুষ্টিগুণ পেয়ে থাকি। ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, ফাইবার ছাড়াও ব্রোমেলিনের মত মূল্যবান উপাদানের উপস্থিতি আনারসকে শুধু মাত্র সুস্বাদু ফল নয়, এটিকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যে পরিণত করেছে যাও অত্যন্ত কার্যকর। প্রতিদিন পরিমাণ মতো আনারস খেলে শরীর তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়, আর মনটা এক অনন্য সতেজতায় ভরে ওঠে।🍍

  • আমলকী: এর আয়ুর্বেদিক ব্যবহার।

    আমলকি আমাদের প্রত্যেকের কাছে খুবই পরিচিত একটি ফল । ট্রেন থেকে শুরু করে বাসে বিভিন্ন জায়গায় আমলকি বিক্রি হয়ে থাকে । কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা যে আমলকি কেন এত বিখ্যাত।

    একটি আমলকিতে একটি কমলা লেবুর চেয়েও অত্যন্ত বেশি মাত্রায় ভিটামিন C থাকতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো আমলকির মধ্যে থাকা ভিটামিন C রান্না করার পর বা শুকানোর পরও তুলনামূলক ভাবে অনেকটা কার্যকর হয়ে থাকে, কারণ এর মধ্যে থাকা ট্যানিন ভিটামিন C-কে রক্ষা করতে করে থাকে।

    আয়ুর্বেদের বিখ্যাত ত্রিফলার তিনটি উপাদানের একটি হলো আমলকি।

    টাটকা আমলকি শরীরকে শান্তি প্রদান করে থাকে অত্যন্ত পরিশ্রমে ক্লান্তি দূর করে। অনেকে আমলকি মধুর সঙ্গে খায়। এটি অনেকের কাছে আমলা বলেও পরিচিত।

    প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা আমলকির মধ্যে প্রায় ২০০ থেকে ৯০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়া যায়। পরিমাণের ভিত্তিতে এতটা বেশি মাত্রায় ভিটামিন সি আর অন্য কোন ফলে পাওয়া যায় না। এটি দামেও সস্তা এবং স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী, যারা ভিটামিন সি এর অভাবে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তাদের জন্য আমলকি হল অমৃত ফল।

    যাদের খেতে ভালো লাগে না কিংবা কম খিদে পায়, আমলকি তাদের ক্ষুধা বৃদ্ধি করে। হৃদপিন্ডের সমস্ত রোগের জন্য এটি খুবই উপকারী। আমলকি মানসিক চিন্তা দূর করতে সাহায্য করে।

    পৌরুষ শক্তির অভাব দেখা দিলে ও দৃষ্টিশক্তি হীন হলে নিয়মিত আমলকির ব্যবহার করবেন। রাত্রিবেলা আমলকি জলে ভিজিয়ে রাখবেন পরদিন সকালে সেই জল দিয়ে চোখে ঝাপটা দিন। আমলকি মানুষের পাচনতন্ত্র মাংস পেশি ও স্নায়ু মন্ডলীর উপর ভালো প্রভাব ফেলে ।

    আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ঘরোয়া ভাবে আমলকির দ্বারা উপাচার।

    চোখের জ্যোতি ও চুলের উপকার

    আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আমলকিতে একটি অমৃত ফলের তুল্য বলে মনে করা হয়। একে তুলসির সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। আমলকি ও তুলসী একত্রে মিশ্রণ তৈরি করে ব্যবহার করলেন সেটি মানবদেহের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।

    একটি আমলকি শুকানোর পর ভিতরের বীজ অর্থাৎ দানা বাদ দিয়ে টুকরো করে কেটে চূর্ণ তৈরি করে কাপড় ছেঁকে নিন। এর সঙ্গে ছয় থেকে আটটি তুলসী পাতা দিয়ে পিশিয়ে নিন, এই মিশ্রণ অল্প জলের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়মিতভাবে সেবন করলে চোখের সমস্যার মত শারীরিক দুর্বলতা থাকে না।

    যারা মাথায় চুল ওঠার সমস্যায় ভুগছেন , মাথায় খুশকি দেখা দিলে, চুল পাতলা হয়ে গেলে, এমন অবস্থায় আমলকী ও তুলসী পাতার মিশ্রণ চুলে লাগাবেন দুই থেকে তিন দিন অন্তর। নিয়মিতভাবে এটি চুলে লাগালে চুল তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পায় । চুলের গোড়া শক্ত হয়, খুশকি আর থাকে না।

    অসময়ে চুলপাকা

    বার্ধক্য জনিত কারণ ছাড়া যদি চুলের রং সাদা হতে থাকে তাহলে রাত্রে আমলকি জলে ভিজিয়ে রেখে পরের দিন সকালে সেই জলে চুল ধুলে চুল রেশমের মতো কোমল এবং সুন্দর কালো হয়ে উঠবে ।

    ঘরোয়া হেয়ার প্যাক

    ২ চামচ আমলকি রস অন্যথা গুঁড়ো ২ চামচ দই এর সঙ্গে একত্র মিশিয়ে সেই মিশ্রণ ৩০ মিনিট মাথায় লাগিয়ে রাখার পর ধুয়ে ফেলুন।

    দাঁতের রোগ

    আমলকি কেটে তার ভেতরের বীজ অর্থাৎ দানা ফেলে দিয়ে শুকনো করে চূর্ণ তৈরি করবেন, প্রতিদিন রাত্রে গরম জলের সঙ্গে কিংবা গরম দুধের সঙ্গে এক চা চামচ এই চূর্ণ মিশিয়ে খেলে পেটের রোগ এবং দাঁতের রোগ দূর হয়।।

    শ্বেতপ্রদর রোগ

    নিয়মিতভাবে একমাস যাবত জলের সঙ্গে এক চা চামচ পরিমাণ আমলকির চূর্ণ খেলে শ্বেতপ্রদর এর পরিমাণ কমে যায় এবং রোগ দূর হয়।

    সহজ প্রসব

    প্রসবকালীন অধিকাংশ নারী খুব কষ্ট পেয়ে থাকেন এবং অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন এই অবস্থায় আমলকী ম্যাজিক এর মত কাজ করে। ২৫ গ্রাম জলের সঙ্গে ১০ গ্রাম টাটকা আমলকি অথবা পরিবর্তে শুকনো আমলকি মিশিয়ে ফুটিয়ে নিন এবার ওতে ৮০ মিলি জল মিশিয়ে ছেঁকে নিয়ে খাইয়ে দিন। এতে প্রসব যন্ত্রণা লাঘব হয়। সহজে প্রসব হয়, তেমন কোন কষ্ট হয় না।

    ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

    আমলকি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। ঘরোয়া উপায়ে ২০-৩০ মি.লি. আমলকির রস এবং ১ চা চামচ করলার বা উচ্ছের রস একসাথে মিশিয়ে সকালে খাওয়া হয়। ( চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয় )।

    হৃদরোগ

    প্রতিদিন টাটকা আমলকি চিবিয়ে খেলে তা হৃদপিন্ড এর শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এতে হৃদপিন্ডের রোগ দমন থাকে। কারণ আমলকি কোলেস্টেরলের পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

    ১৯৮৮ সালের ৭ ই এপ্রিল মুম্বাইতে অনুষ্ঠিত এক অধিবেশনে বিহারের খ্যাতিমান ডাক্তার মোহন মিত্র যে গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছিলেন তার দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে আমলকি কোলেস্টেরল এর বিনাশক রূপে কাজ করে।

    যদি প্রতিদিন 50 গ্রাম মাত্রায় টাটকা আমলকি খাওয়া যায় তাহলে এক মাস পরে দেখা যাবে যে কোলেস্টেরলের পরিমাণ ৩১% ভাগ কমে গেছে।

    আধকপালি

    এটি মাথার একটি রোগ, অনেক সময় দেখা যায় মাথার অর্ধেক অংশ অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। এরূপ অবস্থায় যদি আমলকি খাওয়া যায় তাতে উপকার পাবেন।

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

    নিয়মিত আমলকি খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়ে। এতে সর্দি-কাশি, ভাইরাস সংক্রমণ, ইত্যাদি রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

    হজমশক্তি উন্নত

    আমলকি গ্যাস, অম্বল, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রভৃতি রোগ থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে এছাড়া ক্ষুধা বাড়ায়।ঘরোয়া উপায়ে এক চামচ আমলকি গুঁড়ো ঈষদ উষ্ণ অর্থাৎ একদম হালকা গরম জলে মিশিয়ে রাতে পান করুন।

    ত্বকের সৌন্দর্য

    আমলকি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, এবং বার্ধক্যের লক্ষণ ধীর করতে সহায়ক।

    সর্দি-কাশি

    সর্দি কিংবা কাশিতে আমলকির দুই চামচ রসের সঙ্গে এক চামচ মধু মিশিয়ে দিনে দুইবার খেলে উপকার পাওয়া যায়।

    গলা ব্যথা

    শুকনো আমলকি সিদ্ধ করে সেই জল দিয়ে গার্গল করলে উপকার পাওয়া যায়।

    এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ, অম্ল রোগ, সেপটিক জ্বর, পিত্তশুল, অনিদ্রা, বমি, শুষ্ক কাশি, প্রস্রাব বা প্রোস্টেট গ্রন্থি সম্পর্কিত বিকার প্রভৃতি রোগে আমলকির রস নিয়মিত পান করলে জাদু মন্ত্রের মতোই কাজ দেয়।

    সতর্কতা:- কারা কেনো আমলকি খাবেন না?

    যারা রক্ত পাতলা করার জন্য ওষুধ খাচ্ছেন তারা আমলকি খেলে রক্ত আরো পাতলা হয়ে গিয়ে রক্ত স্রাব ঘটতে পারে। যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা খুব কম অর্থাৎ যাদের লো সুগার রয়েছে তারা আমলকি খেলে তাদের সুগার আরো কমে যেতে পারে এতে মাথা ঘোরা দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাদের কিডনি দুর্বল কিংবা কিডনির বিশেষ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, তারা যদি আমলকি সেবন করে, তবে তার কিডনিতে স্টোন করার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অস্ত্রপাচার এর আগে কিংবা পরে আমলকি খেলে তা রক্তস্রাব ঘটাতে পারে।

  • আমলকি: প্রকৃতির অমৃত ফল, কেন উপকারী।

    আমলকি ফলটি আমাদের সকলের কাছেই খুবই পরিচিত। যখনই সকালের শিশিরভেজা সবুজ আমলকি গাছের আমলকির দিকে তাকাই মনে হয় যেন এটি প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরি করা এক  অনন্য স্বাস্থ্যভাণ্ডার। হালকা টক, সামান্য তেতো, আবার শেষে মিষ্টি স্বাদের এই ফলটি। আমলকির কথা ভাবলে কিংবা চোখের সামনে দেখলেই  তা জিভে জলই আনে, আমাদের শরীরের প্রায় প্রত্যেকটি অঙ্গের জন্য আমলকি আশীর্বাদস্বরূপ।

    জানেন কি প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আমলকিকে “রসায়ন” বা পুনর্যৌবনদায়ক ফল ও বলা হয়। সেই প্রাচীন কাল থেকে এটি খাদ্য, ওষুধ ও সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

    আমরা আমলকিকে আমলকি নামে চিনলেও এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল ( Phyllanthus emblica )। এটি ভারতীয়দের কাছে এক অন্যতম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এবং ঔষধীয় ফল।।

    আয়ুর্বেদের বিখ্যাত ত্রিফলা কথাটি আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন। ত্রিফলার তিনটি উপাদানের একটি হলো আমলকি।

    ত্রিফলা গঠিত :

    1. আমলকি (Amalaki)
    2. হরিতকি (Haritaki )
    3. বহেড়া (Bibhitaki )

    আয়ুর্বেদ মতে আমলকি—

    পিত্ত কে প্রশমিত করে

    রক্ত বিশুদ্ধ করে তোলে

    দীর্ঘায়ু বৃদ্ধি করে

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে

    দেহকে সতেজ করে রাখে

    ইত্যাদি

    জাত, পরিপক্কতা, মাটি ও আবহাওয়া এবং গবেষণাগার নতুন প্রজাতির আবিষ্কার এর কারণে আমলকিতে থাকা পুষ্টিগুণ সামান্য কম-বেশি হয়ে থাকে তবুও আনুমানিকভাবে প্রতি 100 গ্রাম তাজা আমলকিতে থাকা মূল পুষ্টি উপাদানগুলো পরিমাণের দিক থেকে ক্রমানুসারে সাজানো হলো:

    • জল ( Water ) : প্রায় 81.2 থেকে 88 গ্রাম
    • শর্করা ( Carbohydrates ) : প্রায় 10 থেকে 16 গ্রাম
    • খাদ্য আঁশ ( Fiber ) : প্রায় 3.4 থেকে 5 গ্রাম
    • প্রোটিন ( Protein ) : প্রায় 0.5 থেকে 1 গ্রাম
    • ফ্যাট ( Fat ) : প্রায় 0.1 থেকে 0.6 গ্রাম

    খনিজ পদার্থ এর পরিমাণ

    • পটাশিয়াম ( Potassium ) : প্রায় 0.19-0.22 গ্রাম (১৯০-২২০ মিলিগ্রাম)
    • ক্যালসিয়াম ( Calcium ) : প্রায় 0.025- 0.05 গ্রাম ( 25- 50 মিলিগ্রাম )
    • ফসফরাস ( Phosphorus ) : প্রায় 0.015- 0.03 গ্রাম ( 15-30 মিলিগ্রাম )
    • ম্যাগনেসিয়াম ( Magnesium ) : প্রায় 0.008-0.012 গ্রাম ( ৮-১২ মিলিগ্রাম )
    • আয়রন ( Iron ) : প্রায় 0.001 গ্রাম ( 1.2 মিলিগ্রাম )

    ভিটামিন এর পরিমাণ 

    • ভিটামিন C (Vitamin C): প্রায় 0.2 থেকে 0.9 গ্রাম ( 200–900 মিলিগ্রাম)।
    • ভিটামিন B3 (Niacin) : 0.3 মিলিগ্রাম (mg)।
    • ভিটামিন E : 0.17-0.37 মিলিগ্রাম (mg)।
    • ভিটামিন A : 290 IU (প্রায় 0.09 মিলিগ্রাম)।
    • ভিটামিন B2 (Riboflavin) : 0.08 মিলিগ্রাম (mg)।
    • ভিটামিন B1 (Thiamine) : 0.03 মিলিগ্রাম (mg)।
    • ভিটামিন B5 (Pantothenic Acid) : অত্যন্ত সামান্য পরিমাণ।
    • ভিটামিন B9 (Folate) : অত্যন্ত সামান্য পরিমাণ।

    আমলকি এর মধ্যে সবথেকে বেশি ভিটামিন সি থাকলেও আমলকির আসল শক্তি হল এর মধ্যে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো।

    প্রধান উপাদান

    • গ্যালিক অ্যাসিড
    • অ্যামিনো অ্যাসিড
    • এলাজিক অ্যাসিড
    • ট্যানিন
    • এমব্লিকানিন A
    • এমব্লিকানিন B
    • পলিফেনোল
    • পেকটিন
    • ফ্ল্যাভোনোয়েড

    এই সমস্ত আন্টি-অক্সিডেন্ট  শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে ।

    আমলকি খাওয়ার কিছু সুস্বাদু উপায়

    কাঁচা আমলকি খাওয়া সবচেয়ে পুষ্টিকর।

    সকালে খালি পেটে আমলকির রস জনপ্রিয়।

    টক মিষ্টি স্বাদের আমলকির আচার খুব জনপ্রিয়।

    শিশু ও বয়স্কদের কাছে আমলকির মোরব্বা সমান জনপ্রিয়।

    ভ্রমণের সময় আমলকির ক্যান্ডি চমৎকারী এক সঙ্গী ।

    ভাত, রুটি কিংবা খিচুড়ির সঙ্গে আমলকির চাটনি অসাধারণ খেতে লাগে।

    সতর্কবার্তা : কারা আমলকি খাবেন না? 

    যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাচ্ছেন তাদের পক্ষে আমলকি সেবন করা ক্ষতিকারক

    যাদের রক্তে শর্করা খুব কম, বা কমে যাওয়ার প্রবণতা আছে তাদের পক্ষে আমলকি সেবন করা ঠিক নয়।

    কিডনিতে পাথর হওয়া বা ক্রনিক কিডনি ডিজিজের মত বিশেষ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আমলকি ক্ষতিকারক

    অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে আমলকি খাওয়া ঠিক নয় এতে রক্তস্রাব ঘটতে পারে।

    এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

    প্রতিদিন কতটুকু আমলকি খাবেন?

    সাধারণত —

     1-2 টি তাজা আমলকি খাওয়া আমাদের পক্ষে ঠিকঠাক। অথবা 20-30 মিলিলিটার আমলকির রস অথবা 3-5 গ্রাম আমলকি গুঁড়ো আমাদের শরীরকে সুস্থ সবল রাখতে যথেষ্ট।

    এই পরিমাণে আমলকি খাওয়া আমাদের পক্ষে উপকারী বলে মনে করা হয় ।

    উপসংহার

    আমলকি এমন একটি ফল যার মধ্যে পুষ্টি, স্বাদ ও ঐতিহ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ রয়েছে। টক স্বাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে বিপুল ভিটামিন C, শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, খনিজ পদার্থ এবং প্রাচীন আয়ুর্বেদিক জ্ঞান। নিয়মিত পরিমাণ মতো আমলকি খাদ্যতালিকায় রাখলে হজমশক্তি, ত্বক, চুল, হৃদ্‌স্বাস্থ্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সামগ্রিক সুস্থতায় চমৎকার ভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।

  • আপেল: রোগ প্রতিরোধে আপেলের ভূমিকা

    আপেল আমাদের সবার কাছেই পরিচিত হলেও আপেলের পুষ্টিগুণ কিভাবে আমাদেরকে রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে আমরা তা জানি না। পৃথিবীর প্রায় অনেক দেশেই আপেল চাষ করা হয়ে থাকে তার মধ্যে ভারত বর্ষ অন্যতম একটি দেশ। ফলে ভারতীয়রা অসুস্থতার সময়কালে প্রায়শই আপেল খেয়ে থাকেন।

    আপেলের সর্বোচ্চ উপাদান হল জল। এছাড়াও রয়েছে  কার্বোহাইড্রেট , সুগার বা শর্করা, ফাইবার বা আঁশ। প্রোটিন, ফ্যাট এর মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম।

    আপেলের মধ্যে সবথেকে বেশি মাত্রায় রয়েছে ভিটামিন C এছাড়াও রয়েছে ভিটামিন E, B3, B2, B1 ।  ভিটামিন K, ভিটামিন বি9 ভিটামিন A মাত্রা তুলনামূলকভাবে  কম ।

    এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খনিজ রয়েছে যেমন পটাশিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম। আয়রন, জিংক থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।

    আপেলকে কাঁচা ও খাওয়া যায়, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তাদের দুর্বলতা নাশের জন্য আপেল খুবই উপকারী। অতএব বলা যায় আপেল বা আপেলের রস দুর্বলতা দূর করে। বলা যায় এটি অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল। এটি খেলে ক্ষুধা বৃদ্ধি পায় কোষ্ঠকাঠিন্য নাশ হয়। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় আপেল খোসা শুদ্ধ চিবিয়ে খেলে দেহের ক্ষয় দূর হয় এবং দেহ পুষ্ট হয়। 

    আপেলের খোসাতে প্রচুর ভিটামিন থাকে, ফলে খোসা না ছাড়িয়ে ভিতরের বীজ অর্থাৎ দানা ফেলে দিয়ে খাওয়া উচিত।  বয়স্ক এবং দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আপেলের খোসা ছাড়িয়ে, সেই খোসা বা ছাল সেদ্ধ করে তার জল খাওয়া খুবই উপকারী। এই জলের সঙ্গে পাতিলেবুর রস দিয়ে খেলে কিংবা মধু মিশিয়ে খেলেও খুবই উপকার পাওয়া যায়।। 

    আমাশয় এবং পেটের বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে, টাইফয়েড ইত্যাদিতে আপেলের খোসা সিদ্ধ করে সেই জলের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে খুবই উপকার পাওয়া যায়। একটা প্রচলিত কথা আছে যে প্রত্যেকদিন একটি করে আপেল খেলে রোগ দূরে থাকে। অর্থাৎ প্রতিদিন আপেল খেলে রোগব্যাধি আমাদের থেকে দূরে থাকবে। এটি রক্তাল্পতা, প্রবল জ্বর, দুর্বলতা, মানসিক নিরাশা, আন্থাইটিস প্রভৃতি রোগের থেকে বাঁচতে উপকার করে।

    আপেলের খোসা ফেলা উচিত নয় কেন?

    আমরা অনেকেই আপেলের খোসা ফেলে দিই কিন্তু আপেলের এই খোসা আমাদের পক্ষে খুবই উপকারী। কারণ আপেলের খোসাতেই থাকে একাধিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রচুর আঁশ, ফ্ল্যাভোনয়েড, কোয়ারসেটিন। তাই আপেলকে ভালোভাবে ধুয়ে ফোশাসহ খাওয়াই ভালো। আপেল খাওয়ার সব থেকে ভালো সময় সকালবেলা, দুপুরের আগে হালকা খাবার হিসাবে , ব্যায়ামের আগে কিংবা পরে।

    রোগ প্রতিকারের আপিলের গুরুত্ব

    মোটা হতে হলে 

    একটি আপেল কেটে তিন চার ভাগ করে সেই আপেলের টুকরোকে একটি প্লেটে সাজিয়ে রেখে সেই প্লেট সারারাত এমন স্থানে রাখতে হবে যাতে তার উপরে চাঁদের আলো পড়ে। তবে কাজটি সাবধানতার সঙ্গে করবেন যাতে কোনরকম কীট পতঙ্গ থেকে শুরু করে পশুপাখি কেউ এই আপেলে বিষক্রিয়া না ঘটায়। পরে সকালবেলা হাতমুখ ধুয়ে সেই আপেলের টুকরো গুলিকে খেলে এবং এরূপ কার্য কয়েকদিন যাবত করলে দুর্বল শরীরে শক্তি ফিরে আসবে এবং স্বাস্থ্য ভালো হবে। 

    আন্ত্রিক ক্ষত 

    যদি আমাশয় বা আন্তরিক ক্ষত হয়ে থাকে নিয়মিতভাবে আপেলের রস খেলে খুব উপকার হয়। 

    আপেলের চা 

    আপেলের খোসা দিয়ে অত্যন্ত সুস্বাদু এবং সুগন্ধিত চা তৈরি করা যায় এই চা সাধারণত চা বা কফির মত ক্ষতিকারক নয়। বিশেষ করে বয়স্ক এবং দুর্বল মানুষের জন্য এইটা খুবই প্রভাবকারী। মনে করলে এই চায়ের সঙ্গে পাতিলেবুর রস মিশিয়ে খেতে পারেন। 

    হৃদরোগ প্রতিরোধে

    আপেলের মধ্যে পেকটিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে, রক্তনালী সুস্থ রাখে, হৃদ যন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

    উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে

    আপেলের মধ্যে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ কমায়, রক্ত সঞ্চালন আরো উন্নত করে। 

    ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে

    যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে তারা যদি আপেল না খেয়ে আপেল এর ছাল খেলে তাদের পক্ষে খুবই উপকারী। এটি রক্তে শর্করা কমাতে সাহায্য করে। ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা কমায়।

    ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক

    আপেলের খোসায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা কোষের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে, ফ্রি রেডিক্যালের প্রভাব থেকে কিছুটা রক্ষা করে।

    হজমশক্তি উন্নত করে

    আপেলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পেকটিন থাকায় এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া দেরকে পুষ্টি দেয়, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় এবং হজম প্রক্রিয়া কে সহজ করে তোলে।

    ওজন নিয়ন্ত্রণে

    আপেলের আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।

    রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

    আপেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে তোলে সর্দি কাশি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।

    মস্তিষ্কের সুস্থতায়

    আপেলের মধ্যে কোয়ারসেটিন থাকায় তা মস্তিষ্কের কোষ কে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। স্মৃতিশক্তি ও মানসিক কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।

    হাড় মজবুত রাখতে

    আপেলে প্রচুর পরিমাণে খনিজ উপাদান থাকায় তা হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং হাড় এর ক্ষয় কমায়।

    ত্বক ও চুলের সৌন্দর্যে

    নিয়মিত আপেল খেলে ত্বক উজ্জ্বল হয় শরীরে কোলাজেন উৎপাদন করতে সাহায্য করে চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। তাই সকাল বেলা খোসা সহ একটি আপেল খাওয়া খুবই উপকারী।

    দুর্বলতা দূর করতে

    আপেল খেজুর ও মধু একত্রে ছেলে তা দুর্বলতা দূর করতে সাহায্য করে।