Blog

  • টম্যাটো: এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

    টম্যাটো এমন একটি ফল যা সরাসরি এবং রান্না করে আমরা খেয়ে থাকি। তোরি তরকারিতে টম্যাটো ব্যবহার করলে স্বাদ আরো বেড়ে যায় এবং বিশেষ গুনে ভরিয়ে তোলে। অগ্নিমান্দ রোগে টমেটো খুবই উপকার করে। যাদের পেট ভার হয়ে থাকে, বায়ু বিকার হয়, তাদের ক্ষুধা বৃদ্ধির জন্য টম্যাটোর রস খুব উপকারী। শরীরে ক্ষত হলে নিয়মিতভাবে দু-তিন দিন টম্যাটোর রস খেলে উপকার হয়। পেটের অসুখের পক্ষে টোম্যাটোর রস অত্যন্ত উপকার করে থাকে। 

          টম্যাটোর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্যালাড এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। টম্যাটোর চাটনি বিশেষভাবে জনপ্রিয় যা আমাদের মুখের রুচিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। টম্যাটো তে সর্বাধিক মাত্রায় ভিটামিন থাকে। এর মধ্যে ভিটামিন A ভিটামিন B এবং ভিটামিন C প্রচুর পরিমাণে থাকে। এটি পুনর্শক্তিদাতা, পাঁচক এবং উত্তেজক। কাঁচা অথবা আধা পাকা টম্যাটো উদর বিকার, লিভার সম্বন্ধিত সমস্যা, এবং প্লীহা বিকারের জন্য খুবই উপকারী। কিন্তু অত্যাধিক ব্যবহার করলে কাম ইচ্ছা কমিয়ে দেয়। লাল পাকা টম্যাটো ক্ষুধামান্দ্য তে প্রয়োগ করলে এর দ্বারা ক্ষুধা বৃদ্ধি হয়ে থাকে। মধুমেহ অর্থাৎ ডায়াবেটিস রোগে খুব ভালো কাজ দেয়। টম্যাটো নিয়মিত খেলে দেহের মেদ কমে। রক্তাল্পতা রোগে টম্যাটো এর রস খেলে রক্ত বৃদ্ধি হয়।

        টমেটো ম্যালেরিয়া জ্বরে খুবই উপকার করে থাকে। রক্ত শোধন করতে টমেটো তুলনা করা যায় না। এটি মানবদেহে প্রচুর উপকার করে থাকে। এর মধ্যে বেশি পরিমাণে খনিজ লবণ থাকে তার ফলে এটি রক্তের ক্ষার নষ্ট করে দেয়। রোগ প্রতিরোধ করত এটি অত্যন্ত কার্যকরী। এতে দুধের দ্বিগুণ এবং ডিমের পাঁচ গুন আয়রন থাকে, অন্যান্য যাবতীয় ফলের মধ্যে এতে আয়রনের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। চুনেরও পরিমাণ বেশ ভালোই থাকে। যে সমস্ত রোগে টম্যাটো ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায় তা নিচে দেওয়া হল। 

    চোখ 

    বিভিন্ন প্রকার চক্ষু রোগে, দৃষ্টিহীনতায়, চোখ খারাপ হলে টম্যাটোর রস খেলে খুবই উপকার হয় যারা নিয়মিত টম্যাটোর রস খান তাদের চোখের রোগ হয় না দৃষ্টি শক্তি ভালো থাকে।

    লাল চাকতি 

    রক্ত দুষ্টির ফলে অনেক সময় ত্বকের উপর লাল দাগ পড়ে, মুখের রোগ হলে অথবা দাঁত মাজতে গিয়ে যদি রক্তপাত হয় তাহলে 20 মিলি টম্যাটোর রস প্রতিদিন তিন থেকে চার বার খেলে উপকার পাওয়া যায়। 

    দেহে কালো দাগ 

    শরীরে ত্বকের উপর কালো দাগ হলে টোম্যাটো এর রস পান করলে দাগ থাকে না। 

    শারীরিক শক্তি বৃদ্ধি 

    সকালে উঠে খালি পেটে যদি একটি পাকা টম্যাটো খাওয়া যায় দেহে শক্তি বৃদ্ধি পায়, পায়খানা পরিষ্কার হয়। যদি প্রতিদিন পাকা টমেটো খাওয়া যায় স্বাস্থ্য ভালো থাকে, এটি শিশু বৃদ্ধ যুবক-যুবতী সবার পক্ষেই উপকারী। যেসব শিশুদের বোতলে করে দুধ খাওয়ানো হয় তাদের কে দুধের সঙ্গে ১২৫ মিলি করে টমেটোর রস খাওয়ালে দেহ হৃষ্ট পুষ্ট হবে।

    দুর্বল শিশু

    যে সমস্ত শিশুরা দুর্বল তাদেরকে যদি নিয়মিত টম্যাটো এর রস খেতে দেওয়া হয় তাদের শরীর আরো পুষ্ট হবে শরীরের বিকাশ হবে। আবার শিশুদের দাঁত ওঠার সময় কোনরকম উপসর্গ দেখা দিলে টম্যাটো এর রস খাওয়ালে খুব সহজেই শিশু দেবে দাঁত ওঠে। দাঁত ওঠার সময় উপসর্গ দেখা দিলে টমেটোর রসের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে একটু একটু করে এক ঘন্টা পর পর খেতে দিতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সব উপসর্গ দূর না হয় ততক্ষণ।

    যকৃতের দোষে

    লিভার খারাপ হলে কিংবা ঠিকমতো কাজ না করলে টমেটো রস নিয়মিত খেতে দিলে তা দেহের ভিতর সব দূষিত পদার্থ নষ্ট করে দেয় যকৃত সবল করে তোলে।  

    রক্তাল্পতা 

    টম্যাটোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে খনিজ লবণ থাকে ফলে দেহের রক্ত বৃদ্ধিতে এবং রক্ত পরিষ্কার করতে টম্যাটোর রস খুবই উপকারী।

    প্রমেহ 

    টম্যাটো স্যালাড হিসাবে অথবা টোম্যাটোর রস দুই সপ্তাহ নিয়মিত খেলে প্রমেহ রোগ দূর হয়।

    অ্যাপেন্ডিক্স 

    অ্যাপেন্ডিক্স এর সমস্যায় পাকা টমেটো রান্না না করে সরাসরি খেলে খুবই উপকার দেয়।

    শিশুদের শুকনো রোগ 

    টম্যাটো এর রস শিশুদের খাদ্য হজম করতে সাহায্য করে। যার ফলে শিশুদের শরীর সুস্থ সবল থাকে।

  • জলপাই এবং জলপাই তেল এর পুষ্টিগুণ

    জলপাই পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান ফল। এটি শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, স্বাস্থ্যরক্ষাকারী একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জলপাই থেকে স্বাস্থ্যকর ভোজ্য তেল উৎপাদিত হয়। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এর অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে যে জলপাই ও জলপাই থেকে উৎপাদিত তেলে বিদ্যমান বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং বিশেষ জৈব যৌগ মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

    বর্তমান সময়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে জলপাইয়ের গুরুত্বও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।  বিশেষ করে ভারত এবং বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে “জলপাই”  আচার তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

    জলপাইয়ের পরিচয়

    জলপাই গাছ বহু বছর ধরে বেঁচে থাকতে পারে এবং প্রতি বছর ফল দেয়।  

    জলপাই ফল ছোটো অবস্থায় সবুজ থাকে এবং পরবর্তীতে পুরুষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে বেগুনি, লালচে বা কালো রঙ ধারণ করে। জলপাইয়ের বৈজ্ঞানিক নাম হল Elaeocarpus serratus। বর্তমানে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের অধিকাংশ জলপাই উৎপাদিত হয়। শীর্ষ উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পেন, ইতালি, তুরস্ক, গ্রিস, তিউনিসিয়া, মরক্কো, পর্তুগাল। 

         এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, চিলি ও দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে কমবেশি জলপাই চাষ হয়। 

    জলপাই এর মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদান থাকায় নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে জলপাই বা জলপাই তেল  হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষা, প্রদাহ হ্রাস, কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।USDA

    এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা জলপাই তে প্রায় ১১৫ থেকে ১৪৫ ক্যালোরি থাকে।  নিম্নে প্রতি ১০০ গ্রাম জলপাই এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হল।

    উপাদান পরিমাণ 

    • জল : প্রায় 75–81 গ্রাম 
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 4–8 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.4% )
    • খাদ্য আঁশ (ফাইবার) : প্রায় 3–4 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 12%  যা হজমে দারুণ উপকারী)
    • ফ্যাট : প্রায় 5–15.3 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 20% ) 
    • প্রোটিন : প্রায় 0.8–1.2 গ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)

    ভিটামিন পরিমাণ

    • ভিটামিন E : প্রায় 1.5–3.8 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 25% , ত্বক ও চুলের জন্য সেরা)
    • ভিটামিন A (বিটা-ক্যারোটিন থেকে) :  প্রায় 17–40 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় ৮%, চোখের জন্য উপকারী)
    • ভিটামিন K : প্রায় 1–2 মাইক্রোগ্রাম ( দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5% )
    • ভিটামিন C : প্রায় 0.5–1 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1% )
    • ভিটামিন B1 (থায়ামিন) : প্রায় 0.02– 0.03 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.5% )
    • ভিটামিন B2 (রিবোফ্লাভিন) : প্রায় 0.01–0.05 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় ৪%)
    • ভিটামিন B3 (নায়াসিন) : প্রায় 0.2–0.3 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5%)
    • ভিটামিন B-6 : 0.03 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
    • ভিটামিন B9 (ফোলেট) : প্রায় 3–5 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)

    খনিজ পরিমাণ

    • পটাশিয়াম : প্রায় 40–60 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)
    • ক্যালসিয়াম : প্রায় 40–55 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4%, হাড় মজবুত করে)
    • ফসফরাস : প্রায় 4–15 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.5%)
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 4–11 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 3%)
    • আয়রন (লোহ) : প্রায় 0.5–1.6 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 3%, রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে)
    • জিঙ্ক : প্রায় 0.04–0.2 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.5%)
    • কপার (তামা) : প্রায় 0.1–0.12 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 13%)
    • ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.02–0.05 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1%)

    অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট

    জলপাইয়ের সবচেয়ে মূল্যবান শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে নিম্নে সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

    ওলিওরোপেইন 

     কাঁচা জলপাইয়ের প্রধান তিক্ত স্বাদের কারণ হলো ওলিওরোপেইন। এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, ক্ষতিকর জীবাণুর বৃদ্ধি দমন করতে পারে এবং হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে।

    হাইড্রক্সিটাইরোসোল 

    হাইড্রক্সিটাইরোসোল বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে পরিচিত। এটি কোষের DNA সুরক্ষা করে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমায়, বার্ধক্যজনিত কোষ ক্ষয়  কমাতে সাহায্য করে।

    টাইরোসোল 

    টাইরোসোল প্রদাহ কমাতে এবং কোষকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

    স্কুয়ালিন 

    জলপাইয়ের মধ্যে অল্প পরিমাণে স্কুয়ালিন থাকে।

    এটি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে এবং কোষ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। এছাড়া এটি প্রসাধনী শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

    ফ্ল্যাভোনয়েড

    জলপাইয়ের মধ্যে Quercetin, Luteolin, Apigenin ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে, যা শরীরের প্রদাহ কমায় এবং কোষকে মুক্ত মৌলের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। 

    গুরুত্ব

    জলপাই থেকে উৎপাদিত অন্যতম মূল্যবান কৃষিপণ্য গুলি হলো জলপাই তেল, টেবিল অলিভ, আচার, প্রসাধনী, সাবান, ঔষধি উপাদান ইত্যাদি। 

    উপসংহার

    জলপাই এমন একটি ফল, যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং এর মধ্যে থাকা অসাধারণ পুষ্টিগুণের জন্য সারা বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। জলপাইয়ের মধ্যে থাকা প্রধান পুষ্টি উপাদান হলো স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি, বিশেষ করে ওলেইক অ্যাসিড। এছাড়া এতে যথেষ্ট পরিমাণে ভিটামিন E, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, খাদ্য আঁশ এবং ওলিওরোপেইন, হাইড্রক্সিটাইরোসোল ও বিভিন্ন ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খাদ্যাভ্যাসে জলপাইয়ের ব্যবহার করলে তা আমাদেরকে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং সামগ্রিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

  • চেরি ফল: ব্যবহারে রোগ প্রতিকার

    আয়ুর্বেদে চেরি ফলের বেশ গুরুত্ব রয়েছে। ওকে কেবলমাত্র একটি সুস্বাদু ফল নয়। এর মধ্যে রয়েছে শরীরকে রোগ মুক্ত রাখার শক্তিশালী বিশেষ  প্রাকৃতিক উপাদান। মিষ্টি চেরি সাধারণত সরাসরি তাজা ফল হিসেবে খাওয়া হয়ে থাকে আর টক চেরি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের সস, জুস, বেকিং এবং পেস্ট্রি তৈরিতে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

    চেরি ফলের আয়ুর্বেদিক গুণাগুণ

    চেরি ফল টক-মিষ্টি স্বাদ, শীতল গুণ এবং ত্রিদোষের মধ্যে বাত ও পিত্ত দোষকে শান্ত রেখে ত্রিদোষের ভারসাম্য বজায় রাখে। যার জন্য একে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবর্ধক ফল হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে অতিরিক্ত মাত্রায় এটি খেলে শরীরে কফ বাড়িয়ে দিতে পারে।

    রোগ নিরাময় এবং আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা 

    চেরি ফলে থাকা ‘অ্যান্থোসায়ানিন’, প্রাকৃতিক মেলাটোনিন এবং আরো কিছু বিশেষ জৈব যৌগ  একে অনেক জটিল রোগের প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে কার্যকর করে তোলে। চেরি ফল প্রধান যে সমস্ত রোগ নিরাময় করে নিচে দেওয়া হলো:

    বাত রক্ত (গেঁটে বাত বা ইউরিক অ্যাসিড) নিরাময়

    আয়ুর্বেদে গাউট ‘বা তরক্ত’ রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধি পেলে এবং বাত দোষের ভারসাম্যহীনতার জন্য ঘটে। 

       প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ১০ থেকে ১২টি তাজা চেরি খান অথবা চিনি বা মিষ্টি জাতীয় কিছু না মিশিয়ে আধা কাপ টক চেরির (Tart Cherry) রস পান করুন।

     এটি রক্তের মধ্যে থাকা অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড মূত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয় এবং জয়েন্টের ফোলা ভাব ও ব্যথা দ্রুত উপশম করতে সাহায্য করে। 

    অনিদ্রা এবং মানসিক মানসিক চাপ দূরীকরণ

    আয়ুর্বেদ অনুযায়ী, চেরিতে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক মেলাটোনিন হরমোন থাকে। যা মস্তিষ্কের বাত দেখা দিলে যে অনিদ্রা এবং অস্থিরতা দেখা দেয় তা দূর করে। 

     রাতে ঘুমাতে যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে আধা কাপ চেরির জুস পান করুন অথবা এক গ্লাস হালকা গরম দুধের সাথে ৫-৬টি মিষ্টি চেরি খান এতে স্নায়ুতন্ত্র শান্ত থাকে। গভীর এবং প্রাকৃতিক ঘুম আসে।

    অম্লপিত্ত (অ্যাসিডিটি) এবং হজমের সমস্যা

    টক-মিষ্টি চেরি খেলে তা পাচক রস এবং পিত্ত  নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে যা হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক।

     দুপুরের খাওয়ার আধ ঘণ্টা পর মিষ্টি চেরি ফল বা এর রস খেলে এতে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, হজম শক্তি বাড়ায় এবং পেটের জ্বালাপোড়া শান্ত করে।

    হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা

    চেরির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম এবং পলিফেনল থাকায় এটি হার্টের পেশিকে শক্তিশালী করে তোলে।

    এটি শরীরে পিত্ত বেড়ে গেলে পিত্তকে শান্ত করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ধমনিতে ব্লকেজ হলে বা চর্বি জমে গেলে তা দূর করতে সাহায্য করে। হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের খাদ্য তালিকায় চেরি ফল রাখলে এটি তাদের হার্টের সুরক্ষা করে।

    পেশির ক্লান্তি ও ব্যথা উপশম 

    অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম করার পর বা ব্যায়াম করার পরে শরীরে বাত ও কফের ভারসাম্যহীন হওয়ার কারণে পেশিতে ব্যথা হয়। ভারী কাজ বা ব্যায়াম করার পর টক চেরির রস পান করলে খুবই উপকার দেয়। এটি পেশির প্রদাহ বা ভেতরের ফোলা ভাব দূর করতে সাহায্য করে।

    ত্বকের যত্ন ও বার্ধক্য রোধ 

      চেরির ভেতরের অংশ ভালোভাবে পিষে নিয়ে মুখে ১৫ মিনিটের জন্য ফেসপ্যাকের মতো লাগিয়ে রাখুন। এতে চেরির মধ্যে থাকা ভিটামিন A, C এবং E রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে থাকে, যার ফলে মুখের ব্রণ ও কালো দাগ দূর হয়, ত্বকের উজ্জ্বলতা বজায় রাখে এবং প্রাকৃতিক টানটান ভাব আসে।

    সেবনের নিয়ম ও সতর্কতা

    চেরি থেকে সর্বোচ্চ উপকার পেতে এই মৌলিক নিয়মগুলো মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি

    সঠিক সময়: সকাল বা দুপুরবেলা চেরি খাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময়। অনিদ্রার সমস্যা না থাকলে  সন্ধ্যার পর চেরি খাওয়া এড়িয়ে চলাই ভালো।

    দুধের সাথে নিয়ম: আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে টক ফলের সাথে দুধ মেশানোকে ‘বিরুদ্ধ আহার’ বলা হয়। তাই কেবল মাত্র সম্পূর্ণ মিষ্টি চেরিই দুধের সাথে খাবেন, টক চেরি দুধের সাথে খাওয়া শরীরের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর ।

    পরিমিত মাত্রা: একজন সুস্থ মানুষের দিনে ৮০-১০০ গ্রাম চেরির রস বা ১০ থেকে ১৫টি চেরি  খাওয়া উচিত। অতিরিক্ত খেলে গ্যাসের সমস্যা বা কফ বৃদ্ধি পেতে পারে।

  • চেরি ফল এর পুষ্টিগুণ, কেন খাবেন

    টুকটুকে লাল কিংবা গাঢ় মেরুন, চকচকে আর রসাল  চেরি ফল মুখে দেওয়া মাত্রই যেন স্বাদের এক স্বর্গীয় অনুভূতি ঘটে! হালকা কামড় দেওয়ার সাথেই পাতলা চামড়াটা ফেটে গিয়ে মুখের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মিষ্টি-টক মিশ্রিত স্বাদের অমৃত রস।এই ফল মাংসল আর তুলতুলে হয়ে থাকে। এই ফলের প্রতিটি কণা  মনকে নিমেষেই চাঙ্গা করে তোলে। পায়েস, আইসক্রিম বা কেকের ওপর এই ফল এর ব্যবহার করা হয়। এর জুস বা জ্যামঅনেকেই খুব পছন্দ করে থাকেন। এই রাজকীয় ফলটি শুধু মাত্র দেখতেই সুন্দর নয়, এর গন্ধ এবং সুস্বাদু স্বাদ এতটাই লোভনীয় যে একবার খেলে বারবার খাওয়ার ইচ্ছে জাগে।

    চেরি ফলের পরিচয়

    চেরি ফল রোজাসি পরিবারের অন্তর্গত একটি ফল। এবং এটি বরই বা কুলের একটি দূরসম্পর্কীয় প্রজাতির ফল যার কারণে এর ভেতরের গঠন ও শক্ত আঁটি অনেকটা আমাদের চেনা কুলের মতোই। এটি সাধারণত ঠান্ডা অঞ্চলে বেশি জন্মায়। তুরস্ক, আমেরিকা, ইরান ও ইতালি বিশ্বের মধ্যে চেরি উৎপাদনে এগিয়ে।

    চেরির প্রধান দুই ধরন:

    Sweet Cherry – এটি মিষ্টি চেরি। তাই এটি সরাসরি খাওয়ার জন্য খুবই জনপ্রিয়

    Sour/Tart Cherry – এটি টক চেরি। এটি জুস, জ্যাম ও ঔষধি তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। 

    চেরির জনপ্রিয় প্রজাতি

    • Bing Cherry – এটি গাঢ় লাল, এর রস খুব মিষ্টি হয়ে থাকে। 
    • Rainier Cherry – এটি হলুদ-লাল মিশ্রিত রঙের, এটি অত্যন্ত রসালো হয়। 
    • Lambert Cherry – এটি বড় আকারের হয়।
    • Chelan Cherry –  এটি দ্রুত পেকে যায়।
    • Montmorency Cherry – এটি অত্যন্ত টক হয় তাই একে চেরির রাজা বলা হয়। 
    • Black Tartarian – এটি কালচে লাল মিশ্রিত রঙের এবং সুগন্ধি হয়। 
    • Stella Cherry – এটি অত্যন্ত ফলনশীল

    চেরি ফল এর পুষ্টিগুণ

    USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি 100 গ্রাম টাটকা চেরি ফলে প্রায় 63 ক্যালোরি থাকে।  নিম্নে প্রতি 100 গ্রাম চেরি ফল এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হল।

    প্রধান উপাদান 

    • জল :  প্রায় 83 গ্রাম 
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 16 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5.8%)
    • খাদ্য আঁশ : প্রায় 2.1 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7.5%)
    • প্রোটিন : প্রায় 1.1-1.06 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.1%)
    • চর্বি বা ফ্যাট : প্রায় 0.2 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.3%)

    খনিজ উপাদান 

    • পটাশিয়াম : প্রায় 222 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.7%)
    • ফসফরাস : প্রায় 21 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.7%)
    • ক্যালসিয়াম : প্রায় 13 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.0%)
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 11 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.6%)
    • লোহা বা আয়রন : প্রায় 0.36 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.0%)
    • দস্তা বা জিংক : প্রায় 0.07-0.10 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.9%)
    • তামা বা কপার : প্রায় 0.06 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 6.7%)
    • ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.07 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.2%)

    ভিটামিনসমূহ 

    • ভিটামিন C : প্রায় 7 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7.8%)
    • ভিটামিন B3 : প্রায় 0.154 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.0%)
    • ভিটামিন B5 : প্রায় 0.43 – 0.199 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.9%)
    • ভিটামিন B6 : প্রায় 0.049 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.9%)
    • ভিটামিন B2 : প্রায় 0.033 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.5%)
    • ভিটামিন B1 :  প্রায় 0.027 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.3%)
    • ফোলেট বা ভিটামিন B9 : 4 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.0%)
    • ভিটামিন A : 3 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.3%)
    • ভিটামিন K : 2.1 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.8%)

    চেরির ভেতরে থাকা বিশেষ জৈব উপাদান

    চেরি ফলের জাদু  শুধু খনিজ ও ভিটামিনে নয় এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু উদ্ভিদজাত উপাদান বা বায়োঅ্যাক্টিভ কম্পাউন্ডের।

    চেরি ফলের মধ্যে থাকা প্রধান বিশেষ জৈব উপাদানগুলো নিচে দেওয়া হলো:

    অ্যান্থোসায়ানিন 

    অ্যান্থোসায়ানিন চেরির মধ্যে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যা চেরির গাঢ় লাল টকটকে রঙের জন্য দায়ী। এটি খুবই শক্তিশালী একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা শরীরের ক্ষতিকর ‘ফ্রি র‌্যাডিক্যালস’ এর হাত থেকে কোষকে রক্ষা করে। এবং এটি প্রদাহ দূর করে থাকে। শরীরের যেকোনো ব্যথা ও ফোলা ভাব কমাতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী।

    মেলাটোনিন 

    চেরির মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবে সরাসরি ‘মেলাটোনিন’ হরমোন পাওয়া যায়। মেলাটোনিন চেরির মধ্যে থাকা একটি বিশেষ জৈব উপাদান। যা আমাদের ঘুমের চক্র বা বায়োলজিক্যাল ক্লক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। চেরি খেলে রক্তের মধ্যে মেলাটোনিন হরমোন এর মাত্রা বাড়ে, যা প্রাকৃতিকভাবে অনিদ্রা  দূর করতে সাহায্য করে।

    কোয়ারসেটিন 

    চেরিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ফ্ল্যাভোনয়েড উপাদান থাকে। যা রক্তনালীকে শিথিল ও নমনীয় রেখে  রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক করে এবং উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এটি ফুসফুস ও হার্টের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী।

    হাইড্রোক্সিসিনামিক অ্যাসিড 

    চেরিতে থাকা পলিফেনলের একটি বড় অংশ হল হাইড্রোক্সিসিনামিক অ্যাসিড। এই বিশেষ অ্যাসিডের বিভিন্ন ডেরিভেটিভস, যেমন—নিওক্লোরোজেনিক অ্যাসিড এবং ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড। যেগুলি মূলত লিভার বা যকৃতের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এবং শরীরের ডিএনএ (DNA) ড্যামেজ প্রতিরোধ করে। 

    সায়ানিডিন 

    সায়ানিডিন হল চেরির মধ্যে থাকা অ্যান্থোসায়ানিনের মূল ভিত্তি। গবেষণায় দেখা গেছে এটি ক্যানসার কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দিতে সাহায্য করে। এটি মূত্রনালীকে উদ্দীপিত করে ইউরিক অ্যাসিড’ শরীর থেকে বের করে দেয় এতে গেঁটে বাতের তীব্র যন্ত্রণা দূর হয়।

  • কুল: কুলের দ্বারা আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া চিকিৎসা

    আয়ুর্বেদে কুল ‘বন্দরী’ বা ‘বদর’  নামে পরিচিত, যা সেই পুরনো কাল থেকেই রোগ প্রতিরোধ এবং শরীর সুস্থ সবল রাখার একটি মহৌষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মহর্ষি চরক এবং সুশ্রুত তাঁদের সংহিতায় কুলের ফল, পাতা, বীজ এবং ছালের বহুমুখী ঔষধি গুণের বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।

    পাকা কুল মিষ্টি ও অম্ল রসযুক্ত। কাঁচা কুল কিছুটা কষাটে ও অম্ল রসযুক্ত হয়। এর প্রকৃতি ঠান্ডা, হজমে ভারী এবং স্নিগ্ধ হয়ে থাকে।

    ত্রিদোষের উপর কুলের প্রভাব 

    বাত ও পিত্ত নাশক: 

    পাকা কুল এর মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদান শরীরে অতিরিক্ত ‘বাত’ এবং ‘পিত্ত’ দোষকে শান্ত করতে সাহায্য করে। এটি শরীরকে ঠান্ডা রাখে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কমাতে সাহায্য করে। 

    কফ বর্ধক: 

    অতিরিক্ত কাঁচা বা টক কুল খাওয়া উচিত নয়। এতে শরীরে ‘কফ’ বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই যাদের সহজে ঠান্ডা লাগে কিংবা যাদের কফজনিত রোগ আছে তাদেরকে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

    কুল দ্বারা বিভিন্ন রোগ প্রতিকার ও ঘরোয়া চিকিৎসা 

    অনিদ্রা ও মানসিক উৎকণ্ঠা 

    কুলের বীজ বা মজ্জা স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করতে সাহায্য করে। কুলের বীজ ভেঙে তার ভেতরের মজ্জা গুঁড়ো করে নিতে হবে। ১-২ গ্রাম মজ্জা গুঁড়ো ঈষদ উষ্ণ গরম দুধ কিংবা হালকা গরম জলের সঙ্গে মিশিয়ে রাতে ঘুমানোর আগে সেবন করলে অনিদ্রা দূর হয় এবং গভীর ঘুম আসে।

    লিভারের সুরক্ষা ও রক্ত পরিশোধন 

     আয়ুর্বেদ মতে কুল শরীরের ‘টক্সিন’ (আম) দূর করে রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। নিয়মিত পাকা বা শুকনো কুল খেলে রক্ত পরিষ্কার হয়, জন্ডিস রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে এছাড়া লিভারের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

    রক্তপিত্ত বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ 

      পিত্ত দোষের কারণে অনেক সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়ে বা নারীদের মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে কুল দারুণ ভাবে কাজ করে। পাকা কুলের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে তা শরীর ঠাণ্ডা করে এবং অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়।

    জ্বর ও দাহ 

     কুলের পাতায় প্রাকৃতিকভাবে জ্বর কমানোর উপাদান রয়েছে। কুলের কচি পাতা পিষে তার রস বের করে নিতে হবে। ১০ মিলি পরিমাণে রস এর সঙ্গে অল্প মিছরি মিশিয়ে সেবন করলে শরীরের ভেতরের জ্বালাপোড়া ও তীব্র তৃষ্ণা দূর হয়ে থাকে। আবার এই পাতা বেটে কপালে প্রলেপ দিলে তা জ্বরের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।

    হজম ও অরুচি 

     কুলের মধ্যে থাকা উপাদান মুখের স্বাদ ফেরাতে এবং পরিপাক ক্ষমতা সচল করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শুকনো কুল, গোলমরিচ, বিট লবণ এবং সামান্য জিরে একসাথে খেলে বা চাটনি বানিয়ে খেলে মুখের অরুচি দূর হয় এবং আমাশয় ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে আসে।

    স্থূলতা বা ওজন কমানো  

    কুলের বীজ গুঁড়ো করে হালকা গরম জলে মিশিয়ে খেলে এর মধ্যে থাকা উপাদান মেদ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এক গ্লাস জলে কুলের পাতা সারারাত  ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে সেই জল খেলে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে।

    ক্ষত নিরাময় ও ত্বকের রোগ 

     কুলের ছাল ও পাতায় উচ্চ মাত্রায় কষায় রস থাকায় এটি দ্রুত চামড়া ও ক্ষত শুকাতে সাহায্য করে।চিকিৎসা: পুরোনো ক্ষত বা চর্মরোগে কুলের পাতা এবং ছাল খুবই উপকারী। কুলের পাতার পেস্ট তৈরি করে কিংবা কুলের ছালের ক্বাথ দ্বারা পুরোনো ক্ষতস্থান, চর্ম রোগের স্থান ধুয়ে দিলে দ্রুত নিরাময় হয়।

    আয়ুর্বেদিক সতর্কতা 

      কাঁচা বা অত্যন্ত টক কুল অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয় এতে হজমের সমস্যা হয় এবং এটি কফ বাড়িয়ে দিতে পারে। এর বীর্য অত্যন্ত শীতল হওয়ার তীব্র ঠাণ্ডা বা সর্দি-কাশি দেখা দিলে কুল খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো। শুকনো কুলে শর্করার পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে, তাই ডায়াবেটিস রোগীদের অতিরিক্ত কুল খাওয়া উচিত নয়। খেতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া উচিত।

  • কুল এর পুষ্টিগুণ, কেন এটি অত্যন্ত উপকারী?

    কুল এর পুষ্টিগুণ, কেন এটি অত্যন্ত ভালো? 

    শীতের কুয়াশা ভেজা সকালে, কুল গাছের পাশে থেকে হেঁটে যাওয়ার সময় লোভ সামলানো মুশকিল। অনেক সময় দেখা যায় গাছের গোড়ায় ছোট থেকে বড় সবাইকে। গাছকে ধরে একটু নাড়া দিলেই গাছ থেকে টপটপ করে পড়তে থাকে শীতের কুয়াশায় ভেজা পাকা টকমিষ্টি কুল। চারিদিক একটা টক ঝাঁক যুক্ত অপূর্ব সুগন্ধে ভরে যায়। কিংবা  হাটের এক কোণে বাঁশের ঝুড়িতে সাজিয়ে রাখা সবুজ, হলুদ, লালচে সুগন্ধে ভরা কুল দেখলেই জিভে জল এসে যায়। এটি কাঁচা অবস্থায় সবুজ টক ঝাঁঝ যুক্ত হয়, এবং পেকে যাওয়ার পরে হলুদ, লালবর্ণ ও টক-মিষ্টি মেশানো কোমল মোলায়েম শাঁসযুক্ত হয়ে থাকে। একটি কামড় মারলেই এর অপূর্ব সুস্বাদু স্বাদ যেন মনে হয় এক ফলের মধ্যে তিন ঋতুর আনন্দ সমাহিত।

    গ্রামের ঘরের উঠোনে, পথের ধারে, কিংবা মাঠে চাষের জমির ধারে কাঁটায় ভরা গাছে ঝুলে থাকা কুল কে শুধু ফল বলবো না, এটি হল আমাদের শৈশবের এক আবেগ। এর আচার-চাটনির অমলিন স্মৃতিকে ভোলা যায় না। আর আয়ুর্বেদের ভাষায় এটি হলো এক শক্তিশালী ঔষধি ফল।

    আমরা একে ফুল নামে চিনি তবে এর একটি বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। কুলের বৈজ্ঞানিক নাম হল Ziziphus mauritiana। এটি Rhamnaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

    কুলের উৎপত্তি ও পরিচয়

    কুলের জন্ম দক্ষিণ এশিয়ায় হয়ে থাকলেও বর্তমানে এটি ভারত, বাংলাদেশ, চীন, পাকিস্তান, আফ্রিকা সহ মধ্যপ্রাচ্যে এর চাষ ব্যাপকভাবে হয়ে থাকে।

    কুলের বৈশিষ্ট্য:

    এই গাছ কাঁটাযুক্ত হয়। উচ্চতায় ৫–১২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই গাছ খরা সহনশীল, প্রচন্ড খরাতেও এই গাছ ফলন দিয়ে থাকে। কোনরকম যত্ন ছাড়াও এই গাছ খুবই দীর্ঘজীবী হয়।

    কুলের স্বাদ 

    কুলের স্বাদ নির্ভর করে এর প্রজাতির উপর, মাটির গুণের উপর, আবহাওয়ার উপর এবং কুল পাকার উপরে।

    কুলের প্রজাতি 

    আপেল কুল 

    এই প্রজাতির কুল সবচেয়ে জনপ্রিয়। এটি আকারে বড়, গোলাকার, মচমচে হয়ে থাকে। এর স্বাদ মিষ্টি ও হালকা টক হয়ে থাকে।

    নারকেলি কুল

    এই প্রজাতির কুল নারকেলের মতো শক্ত শাঁস যুক্ত হয়ে থাকে। এটি খুব মিষ্টি। এটিকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

    বাউ কুল

    এই প্রজাতির কুল ছোট আকারের হয়ে থাকে। এটি তীব্র গন্ধযুক্ত এবং অতুলনীয় স্বাদের হয়ে থাকে।

    বন কুল

    এই প্রজাতির কুল প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। আকারে ছোট হলেও এটি ঔষধি গুণে সমৃদ্ধ হয়ে থাকে।

    থাই কুল

    এই প্রজাতির কুল বড় আকৃতির হয়। এটি অত্যন্ত রসালো। বাজারে এই কুল এর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হয়ে থাকে। 

    কাশ্মীরি কুল

    স্কুলের এই প্রজাতি টি ঠান্ডা অঞ্চলের প্রজাতি। এটি খুবই সুস্বাদু 

    বোম্বাই কুল

    এই প্রজাতির কুল বড় এবং শক্ত হয়ে থাকে। এটি বাণিজ্যিকভাবে খুবই জনপ্রিয়।

    গোলা কুল

    এই প্রজাতি টি গোল প্রকৃতির হয়ে থাকে। এটি রসে ভরপুর হয়।

    দেশি কুল

    দেশি কুল ছোট হলেও অন্যান্য স্কুলের তুলনায় স্বাদের রাজা। তাই এই কুল অত্যন্ত জনপ্রিয়।

    কুল এর পুষ্টিগুণ

    USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা কূলে প্রায় 79 ক্যালোরি থাকে।  নিম্নে প্রতি ১০০ গ্রাম কুল এর মধ্যে থাকা পুষ্টিগুণ এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হল। 

    উপাদান পরিমাণ

    • জল : প্রায় 77.86 গ্রাম
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 20.23 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7%)
    • খাদ্য আঁশ : প্রায় 1.2-2.6 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5%)
    • প্রোটিন : প্রায় 1.2 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.5%)
    • ফ্যাট : প্রায় 0.2 গ্রাম (একদম সামান্য)

    ভিটামিন পরিমাণ

    • ভিটামিন C : প্রায় 69 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 77%)
    • ভিটামিন B3 (নিয়াসিন) : প্রায় 0.9 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5.6%)
    • ভিটামিন B6 : প্রায় 0.08 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.8%)
    • ভিটামিন B2 : প্রায় 0.04-0.06 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.6%)
    • ভিটামিন B1 : প্রায় 0.02 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.7%)
    • ভিটামিন A : খুবই অল্প পরিমাণ

    খনিজ পরিমাণ

    • পটাশিয়াম : প্রায় 250 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 5.3%)
    • ফসফরাস : প্রায় 23 মিলিগ্রাম  (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
    • ক্যালসিয়াম : প্রায় 21 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2%)
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 10 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.4%)
    • সোডিয়াম : প্রায় 3 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.1%)
    • আয়রন : প্রায় 0.48 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.7%)
    • জিঙ্ক : প্রায় 0.05 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 0.5%)
    • কপার : প্রায় 0.09- 0.07 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 10.2%)
    • ম্যাঙ্গানিজ : প্রায় 0.08 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 3.7%)

    কুলের মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ফাইটোকেমিক্যাল যা কুলকে বিশেষ করে তোলে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো

    ট্রাইটারপেনিক অ্যাসিড

    এটি কুলের মধ্যে থাকা অন্যতম প্রধান শক্তিশালী উপাদান। বেটুলিনিক অ্যাসিড ও ওলেনোলিক অ্যাসিড যা বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কাজ করে। কুলের এই যৌগগুলো শরীরে ক্যানসার কোষের বৃদ্ধিতে বাধা দিতে দারুণ কার্যকর। এটি প্রাকৃতিকভাবে শরীরের প্রদাহ  দূর করতে এবং লিভার বা যকৃৎ সুরক্ষিত রাখতে দারুণ কাজ করে।

    স্যাপোনিন 

    স্কুলের মধ্যে স্যাপোনিন থাকে যা রাতে ভালো ঘুমের জন্য বা দুশ্চিন্তা কমাতে দারুন ভাবে কাজ করে।  কুলের বীজে এবং মাংসে প্রচুর জুজুবোসাইড থাকে যা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে রাখে।

    ফ্ল্যাভোনয়েডস 

    কুলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েডস থাকে যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।সোয়ার্টিশিন, রুটিন  এবং ক্যারেটিন এই সমস্ত উপাদানগুলো শরীরে ফ্রি র‍্যাডিক্যালের মত ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। এটি রক্তনালীকে শিথিল করতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়। 

    পলিস্যাকারাইড 

    কুলের মধ্যে থাকা পলিস্যাকারাইড বা জটিল শর্করা শরীরের একদম ভেতর থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে। এটি শরীরের শ্বেত রক্তকণিকাকে উদ্দীপিত করতে সাহায্য করে, যার ফলে আমাদের শরীর যেকোনো ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণকে খুব সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে। 

    ফেনোলিক অ্যাসিড 

    কুলের মধ্যে থাকা ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড এবং ক্যাফেইক অ্যাসিড বিপাক প্রক্রিয়া সচল রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করে। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খুবই সহায়ক। এছাড়া এটি লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে দেয় না।

    উপসংহার

    পরিশেষে বলা যায় যে কুল শুধু ফল নয়— এটি শীতের পরিচিত গন্ধ, গ্রামের মাটি, শৈশবের হাসি আর পুষ্টিকর সুস্বাদু স্বাদের প্রকৃতির এক আশীর্বাদ। কাঁচা কিংবা পাকা যে কোন অবস্থায় এটি খেলে যেমন জিভে জল আসে, তেমনি শরীরকে দিয়ে থাকে ভিটামিন, খনিজ, শক্তি আর সুস্থতার অমূল্য উপহার।

    এই ছোট্ট কুলের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সুস্বাস্থ্যের রহস্য তাই এটিকে অবহেলা করা একদমই উচিত নয়। তাই আমাদের খাদ্য তালিকায় কুলকে রাখা খুবই বুদ্ধিমানের হবে।

  • জাম: রস, রং, পুষ্টি গুণে ভরা এক অনন্য ফল

    জাম আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এবং পছন্দ করে একটি ফল। ঠিক বর্ষার শুরুতেই গাঢ় বেগুনি-কালো রঙের ছোট ছোট জামে গাছ ভরে যায়, যেন সবুজের মাঝে বেগুনি কালো ছোঁয়া। অপূর্ব এক সৌন্দর্য। সঙ্গে মিষ্টি-টক সুগন্ধে আশেপাশে চারিদিকে ভরে যায়। জাম খাওয়ার অনুভূতি খুবই অতুলনীয়। জাম মুখে পড়ে হালকা চাপ দিলেই  মুখে ছড়িয়ে পড়ে কষ-মেশানো টক-মিষ্টি রস, জিভে হালকা ঝাঁঝ অনুভূতি হয়, আর ঠোঁট, মুখ ও জিভ বেগুনি রঙে রঙে যায়।
    তাই যারা কোন সময় জাম খেয়েছেন জাম দেখলে তাদের জিভে জল আসতে বাধ্য। জামের পরিচয় শুধু স্বাদের জন্য নয়—এটি একটি প্রাকৃতিক “ঔষধি ফল”।

    আয়ুর্বেদে একে রাজফল বলা হয়, কারণ এর ফল, বীজ, পাতা, ছাল—সবই বিভিন্নভাবে আমাদেরকে উপকার করে থাকে।

    জামের পুষ্টিগুণ 

    জামে জলীয় অংশ সব থেকে বেশি, তাই এটি  হাইড্রেশন দেয় ও শরীর ঠান্ডা রাখে। USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম টাটকা জামে  প্রায় যে পরিমাণ পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় এবং তা দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারে তালিকা দেয়া হলো। 

    উপাদান পরিমাণ

    • জল : প্রায় 83.13–90 গ্রাম 
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 14–19 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4.6% )
    • প্রাকৃতিক শর্করা : প্রায় 6–15 গ্রাম 
    • খাদ্য আঁশ (Fiber) : প্রায় 0.90–3.5 গ্রাম (দৈনিক আঁশের চাহিদার প্রায় 3.6%)
    • প্রোটিন : প্রায় 0.70–0.7 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 1.2%)
    • খনিজ লবণ (Minerals) : প্রায় 0.40–1  গ্রাম 
    • ফ্যাট/চর্বি : প্রায় 0.23-0.3 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.3%)

    খনিজ পদার্থ 

    • পটাশিয়াম : প্রায় 55-79 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.2% )
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 35 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 8.7% )
    • ফসফরাস :  15–16 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 2.1% )
    • ক্যালসিয়াম :  8–15 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.5%)
    • আয়রন : প্রায় 1– 1.41 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 7.8%)
    • সোডিয়াম :  প্রায় 26.2 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.1% )

    কপার : প্রায় 0.23 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 11.5%)

    ভিটামিনসমূহ

    • ভিটামিন C :  প্রায় 14.3-40 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 24%)
    • ভিটামিন B3/নিয়াসিন : প্রায় 0.26 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 1.6% )
    • ভিটামিন B1/থায়ামিন : প্রায় 0.006 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.5%)
    • ভিটামিন B2/রিবোফ্লাভিন : প্রায় 0.006 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.4%)
    • ভিটামিন A : প্রায় ৪৮ µg মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার মাত্র 0.3%)

    জামের বিশেষ বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান

    অ্যান্থোসায়ানিন 

    জামে সায়ানিডিন ডিগ্লুকোসাইড এবং ডেলফিনিডিন নামক অ্যান্থোসায়ানিন থাকে। যা জামের গাঢ় বেগুনি বা কালো রঙের জন্য দায়ী। এটি শরীরের ‘ফ্রি রেডিক্যাল’ বা ক্ষতিকর অণু গুলিকে ধ্বংস করে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করে।

    জাম্বোলিন এবং জাম্বোসিন 

    এই দুটি হল বিশেষ অ্যালকালয়েড এবং গ্লুকোসাইড উপাদান। এই দুটি সাধারণত জামের বীজে পাওয়া যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাম্বোলিন রক্তে থাকা শ্বেতসার বা স্টার্চ কে চিনিতে রূপান্তরিত হতে বাধা দেয়। ফলে খাবার খাওয়ার পর রক্তে হঠাৎ  ব্লাড সুগার বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।

    পলিফেনল এবং ফ্ল্যাভোনয়েড 

    জামে পলিফেনলিক যৌগ প্রচুর পরিমাণে থাকে, যার মধ্যে মাইরিসেটিন এবং কোয়ারসেটিন অন্যতম। মাইরিসেটিন সরাসরি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা  বাড়িয়ে দেয়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়া এগুলি শরীরে অভ্যন্তরীণ প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে থাকে।

    হাইড্রোলাইজেবল ট্যানিন 

    জাম খাওয়ার সময় যে কষকষে ভাব অনুভূতি হয়, তা এই ট্যানিনের কারণে ঘটে। জামে গ্যালিক অ্যাসিড এবং এলাজিক অ্যাসিড নামক ট্যানিন থাকে। এলাজিক অ্যাসিড এবং গ্যালিক অ্যাসিড শক্তিশালী অ্যান্টি-ক্যান্সার ও অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান হিসেবে কাজ করে এছাড়া এগুলি লিভারকে ক্ষতিকর টক্সিন এর হাত থেকে রক্ষা করে এবং পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ রোধ করতে সাহায্য করে। 

    জৈব অ্যাসিড 

    জামের মধ্যে ম্যালিক অ্যাসিড, অক্সালিক অ্যাসিড এবং সাইট্রিক অ্যাসিড ইত্যাদি প্রাকৃতিক অ্যাসিড থাকে। যা জামের টক-মিষ্টি স্বাদের মূল কারণ। এই অ্যাসিডগুলো শরীরের হজম রস বা পরিপাক এনজাইমগুলোকে উদ্দীপিত করে ফলে বিপাক ক্রিয়া উন্নত হয় এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমে। 

    আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে জামের গুরুত্ব 

     আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্রে জামকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘মহৌষধি’ ফল হিসেবে মানা হয়। প্রাচীনকাল থেকেই জাম, জামের পাতা, ছাল এবং বীজ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদ মতে, জাম হলো ‘কফ’ ও ‘পিত্ত’ নাশক, এবং রক্তশোধক। তবে এটি সামান্য ‘বাত’ বর্ধক।

    উপসংহার :

       বলা যায় যে, জাম শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালের একটি পুষ্টিকর, আকর্ষণীয় ও জিভে জল আনা সুস্বাদু ফলই নয়, বরং এটি মানবদেহের উপকারকারী প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। এর মিষ্টি-অম্ল-কষাটে শাঁস থেকে শুরু করে এর পাতা, ছাল এবং বীজ এর প্রত্যেকটি অংশে লুকিয়ে রয়েছে বিপুল পুষ্টি ও ঔষধি গুণাগুণ। এটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে, রক্তস্বল্পতা দূর করতে, হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা এবং লিভারকে সুস্থ রাখতে চমৎকারভাবে ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে থাকা ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তাই জাম কে আমাদের দৈনিক খাদ্য তালিকায় রাখলে সুস্থ দীর্ঘায়ু জীবন লাভ করা যায়।

  • জাম এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ঘরোয়া আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা

    জামের অনেক প্রকার প্রজাতি পাওয়া যায়। জাম আমাদের কাছে খুবই পছন্দ করে একটি ফল। এটি গ্রীষ্ম প্রধান একটি ফল। জাম পাচক এবং অগ্নাশয়ের যথেষ্ট উপকার করে। যকৃত, প্লীহা ও আমাশয় রোগে জাম বিশেষ ভাবে উপকার করে থাকে। নিয়মিত জাম খেলে চুলের অকাল পাক্কতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এই ফল খালি পেটে খেলে পেট ব্যথা করে। আবার অন্যদিকে এই ফল খালি পেটে খেলে মূত্রের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে শরীরের দূষিত পদার্থ সমূহ মূত্রের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। অন্ডকোষের দুর্বলতা ও শুক্রমেহু রোগীর ক্ষেত্রে এই ফলটি বিশেষ উপযোগী। যারা বহুমূত্র রোগী তাদের জাম খাওয়া বিশেষ করে দরকার। জাম পিত্তকে শান্ত করে। জাম সেবন করলে মানুষের বীর্য ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। আবার এই ফলকে আমরা আমের শোধক বলতেও পারি। আম খাওয়ার পর যদি কয়েকটি জাম খাওয়া যায় তবে অতি শীঘ্রই আম হজম হয়। 

          এই গাছের ছাল, ফল ও ফলের বীজ সবকিছুই ভেষজ ঔষধ হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। এই গাছের ছাল অত্যাধিক স্তম্ভক। গলার ক্ষতে, ব্রংকাইটিস,  হাঁপানি, ব্রণ, সেপটিক ও কলেরা রোগের পক্ষেও এই ফল খুবই উপকারী। রক্ত শোধনের ক্ষেত্রে এটি আশ্চর্যজনকভাবে উপকার করে থাকে। 

          ছাগলের দুধের সঙ্গে জাম গাছের ছালের টাটকা রস মিশিয়ে খেলে অতিসার রোগে উপকার হয়। জামের বীজ অর্থাৎ দানা ডায়াবেটিস রোগী উপকার করে। জামের রস পান করলে হাত পায়ের জ্বালা কমে। পাশ্চাত্য দেশের ডাক্তাররা জাম থেকে ডায়াবেটিস রোগের ঔষধ প্রস্তুত করেছেন ।।

    মধুমেহ (ডায়াবেটিস) 

    এই রোগে আক্রান্ত হলে জাম গাছের সবুজ কচি পাতা বেটে তা জলে মিশিয়ে দিনে দুইবার করে পান করলে এই রোগের প্রকোপ কমে যাবে।

    ঘামাচি 

    গরমকালে আমাদের অনেকের গায়ে ঘামাচিতে ভরে যায়, খুবই অস্বস্তি হয়। এই রোগ নিরাময়ে জামের বীজ অত্যন্ত উপকারী। প্রথমে জামের বীজ গুলি শুকনো করে গুড়ো করে নিতে হবে। এই বীজ গুড়োর সঙ্গে সোডা মিশিয়ে সেই মিশ্রণ ঘামাচির উপরে লাগালে উপকার পাওয়া যায়। 

    ম্যালেরিয়া 

    এই রোগ আমাদের দেশে ব্যাপক পরিমাণে হয়ে থাকে। এই রোগে জাম গাছের ছাল অত্যন্ত উপকারী । প্রথমে জাম গাছের উপরের ছালের অংশটিকে ভালো করে টুকরো টুকরো করে কাটতে হবে। এই টুকরো অংশগুলির সঙ্গে গুড় মেশাতে হবে। এই মিশ্রণ ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কে খাওয়াতে হবে। অথবা আরও একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপাচার করা যেতে পারে 

         জাম গাছের ছাল ভালো করে গুড়ো করে কিংবা বেটে জলের সঙ্গে মিশিয়ে হালকা গরম করে সেবন করতে হবে। এতে প্রথমে জ্বর বাড়তে পারে। কিন্তু এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ধীরে ধীরে ম্যালেরিয়া রোগ দূর হয়ে যাবে। 

    স্বপ্নদোষ ও শীঘ্রপতন 

    যে সকল যুবকের প্রস্রাব ঠিকমতো পরিষ্কার হয় না বা গতি কমে গেছে রাতে নিদ্রায় বিভিন্ন স্বপ্ন দেখে কিংবা যৌবনে পদার্পণে স্বপ্নদোষের জন্য বীর্য নষ্ট হচ্ছে অথবা কুচিন্তায়, অশ্লীল চিত্র বা নারীর সংস্পর্শে বীর্যহীনতায় ভুগছে তাদের কাছে এই ফলের প্রয়োজনীয়তা বেশি। জামের বীজ চূর্ণ করে ৩ গ্রাম পরিমাণে জলের সঙ্গে মিশিয়ে সকাল ও সন্ধ্যায় খেতে হবে। যে সকল যুবকের বীর্য তরল হয়ে গেছে, লিঙ্গের দৃঢ়তা ও উত্তেজনা ঠিকমতো হয় না তাদের ক্ষেত্রে জামের বীজ চূর্ণ ও দুধ ভালো করে মিশিয়ে প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর  আগে পান করতে হবে। এতে যারা বীর্যহীনতায় দীর্ঘদিন ভুগছেন, তারা পুনরায় হারানো বল, বীর্য ফিরে পাবেন। বীর্য ঘন হবে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। 

    প্রদর রোগ 

    জাম গাছের ছাল কেটে টুকরো করে শুকনো করে তারপর তার গুঁড়ো করে অথবা হালকা জলে পিষে ১০ গ্রাম পরিমাণ গরুর দুধের সঙ্গে খাওয়ালে প্রদর রোগে অত্যন্ত উপকার হয়ে থাকে। 

    জুতো পড়ার জন্য পায়ে ঘা 

    অনেক সময় নতুন জুতো পড়লে পায়ে ফুচকা হয় এবং তা থেকে খাওয়া হয় তার ফলে হাঁটাচলাতে খুব কষ্ট হয়। এই অবস্থায় জামের বীজ ভালো করে পিষে ওই ক্ষতস্থানে লাগালে কত ভালো হয়।।

  • খেজুর: মরুভূমির মিষ্টি আশীর্বাদ এবং পুষ্টিগুনে ভরপুর ফল। 

    খেজুর: মরুভূমির মিষ্টি আশীর্বাদ এবং পুষ্টিগুনে ভরপুর ফল। 

    খেজুর এমন একটি ফল আমরা খুবই সহজেই পেয়ে থাকি। আমাদের ভারতবর্ষে প্রায় সর্বত্র জায়গাতেই কমবেশি খেজুর উৎপাদন হয়ে থাকে। বল্ক, আরব, মিশর, প্রভৃতি পশ্চিমী অঞ্চলে আকারে বড় খেজুর উৎপাদন হয়ে থাকে যা বিশ্বে দারুণভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এটিকে মরুভূমির সোনালি মধু বললেও চলে কারণ মরুভূমির প্রচন্ড গরমে যেখানে জলের অভাবে অন্য কোন গাছ জন্মায় না সেখানে এমন একটি ফলের গাছ জন্মায়। খেজুর পেতে যাওয়ার পরে হালকা শুকিয়ে যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত জমিয়ে রেখে খাওয়া যায়। এটি একটি ছোট্ট বাদামি ফল, বাইরে সামান্য কুঁচকানো, কিন্তু এর ভেতরে যেন জমে থাকে গাঢ় মধুর রস, ক্যারামেলের নরম কোমলতা এবং প্রকৃতির শক্তি। খেজুর হলো প্রকৃতির দেওয়া এক জাদুকরি উপহার। একটি কামড়ে মুখে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয় মুগ্ধ করা স্বর্গীয় স্বাদ। এটি মোলায়েম মিষ্টি, মুহূর্তেই শরীরের শক্তি জাগায়, আর মনে দেয় তৃপ্তি। শুধু মাত্র স্বাদেই নয়, খেজুর হল “প্রাকৃতিক এনার্জি প্যাকেট”

    আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে খেজুর সুপারফুডের মর্যাদা পেয়েছে। USDA এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা ও শুকনো খেজুরে থাকা উপাদান এর পরিমাণ এবং উপাদানগুলি দৈনিক চাহিদার কতটা পূরণ করতে পারে সাজানো হলো :

    • জলীয় অংশ : প্রায় 15-21 গ্রাম 
    • কার্বোহাইড্রেট : প্রায় 75–80 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 25%)
    • মোট চিনি : প্রায় 63 গ্রাম 
    • খাদ্যআঁশ (ফাইবার): প্রায় 7-8 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 27%)
    • প্রোটিন : প্রায় 2-2.5 গ্রাম (দৈনিক চাহিদার প্রায় 4%)
    • ফ্যাট বা চর্বি (অল্প পরিমাণ) : মাত্র 0.2-0.5 গ্রাম 

    খনিজ পদার্থ 

    • পটাশিয়াম : প্রায় 657 – 864 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 20%)
    • ম্যাগনেসিয়াম : প্রায় 43 – 90 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 14%)
    • ক্যালসিয়াম : প্রায় 39-68 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 6%)
    • ফসফরাস : প্রায় 62 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 6%)
    • আয়রন ( লোহা ) : প্রায় 0.9 – 1.5 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 5%)
    • জিঙ্ক : প্রায় 0.44 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 4%)
    • কপার: প্রায় 0.36 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 18% যা অত্যন্ত সমৃদ্ধ)
    • ম্যাঙ্গানিজ: প্রায় 0.30 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 15%)
    • সেলেনিয়াম: প্রায় 0.7 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 1%) 

    ভিটামিনসমূহ

    • ভিটামিন B3 ( নিয়াসিন ) : প্রায় 1.6 মিলিগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 10%)
    • ভিটামিন B5 ( প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড ) : প্রায় 0.8 মিলিগ্রাম
      (দৈনিক চাহিদার 12%)
    • ভিটামিন B6 ( পাইরিডক্সিন ) : প্রায় 0.2 মিলিগ্রাম
      (দৈনিক চাহিদার 12%)
    • ভিটামিন B2 ( রিবোফ্লাভিন ) : প্রায় 0.06 মিলিগ্রাম
      (দৈনিক চাহিদার 5%)
    • ভিটামিন B1 ( থায়ামিন ) : প্রায় 0.05 মিলিগ্রাম
      (দৈনিক চাহিদার 4% )
    • ভিটামিন A : প্রায় 10 মাইক্রোগ্রাম (দৈনিক চাহিদার 3%)
    • ভিটামিন K : প্রায় 2.7 মাইক্রোগ্রাম
      (দৈনিক চাহিদার 3%)
    • ভিটামিন B9 : প্রায় 1.5 মাইক্রোগ্রাম
      (দৈনিক চাহিদার 5%)
    • ভিটামিন C: অত্যন্ত সামান্য
    খেজুরের মধ্যে থাকা মূল রাসায়নিক উপাদান গুলি হলো
    • গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ প্রভৃতি ন্যাচারাল সুগার বা প্রাকৃতিক চিনি থাকে। এগুলো দ্রুত শক্তির জোগান দেয়।
    • খেজুরে ফ্লাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড, ফেনোলিক অ্যাসিড নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। যা শরীরের কোষকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। 

    উপসংহার: 

    এটি প্রকৃতির এক অমৃত ফল। বলা যায় যে খেজুর কেবলমাত্র একটি সুস্বাদু এবং মিষ্টি ফলই নয়, এটি একদিকে শক্তি, পুষ্টি এবং রোগ নিরাময়ের এক অনন্য ভাণ্ডার। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানের তথ্য থেকে শুরু করে প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সবখানেই খেজুরের ঔষধি গুণ এবং শারীরিক উপকারিতার বর্ণনা পাওয়া যায়। আয়ুর্বেদের ভাষায় এটি একটি অনন্য “ওজঃবর্ধক ” খাদ্য। এটি ফ্যাট ও কোলেস্টেরলমুক্ত। এই ফলটি কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম ও ফাইবারের চমৎকার উৎস। অন্যদিকে এটি শরীরের বাত ও পিত্ত দোষ নাশ করে। জীবনী শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। কৃত্রিম চিনি বা ক্ষতিকর এনার্জি ড্রিংকসের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে যদি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাত্র ৪ থেকে ৫ টি খেজুর অন্তর্ভুক্ত করা যায় আমরা খুব সহজেই দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা লাভ করতে ও শরীরে কর্মক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে পারি। 

  • খেজুর: খেজুরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।

    এটি একটি অত্যন্ত সস্তা ফল। এটি সুমধুর স্বাদে এবং পুষ্টিকর উপাদানে ভরা।

    খেজুরের নামের পার্থক্য 

     খেজুর কে সংস্কৃতে খর্জুর বলা হয়। হিন্দিতে এবং বাংলাতে একে খেজুর বলা হয়ে থাকে। মালায়ালাম বাসিরা একে বলে ইয়োপালস। ফরাসিতে একে খুরম বলে। ইংরেজিতে এর নাম ডেট পাম্ । ল্যাটিনে বলা হয় পেনিস সিলকোস্টাম। প্রত্যেকেই খেজুর খেতে  পছন্দ করেন। 

          টাটকা খেজুর পোষক ও হালকা বিরোচক হয়ে থাকে। এর মধ্যে ভিটামিন এ, ভিটামিন বি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, ফসফরাস প্রভৃতি প্রচুর পরিমাণে থাকে। 

         দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে এটি খুবই পুষ্টিকর বলবর্ধক এবং টনিকের মতো কাজ করে থাকে। সেই জন্য তীব্রজর বসন্ত প্রভৃতি রোগে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলে  দুধের সঙ্গে খেজুর খেতে দিলে তাড়াতাড়ি সাস্থ লাভ হয়। খেজুর সর্দি, কাশি, জ্বর, হাঁপানি, কণ্ঠনালী সোথ, বুকের কষ্ট, লিভার সম্বন্ধিত কষ্টে দারুণ ভাবে উপকার করে থাকে। খেজুর দ্বারা প্রস্তুত করা সিরাপ অতিসার, শুকনো রোগ, ডায়াবেটিস রোগেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 

         আমাদের দেশে যে খেজুর পাওয়া যায় সেগুলি আকারে ছোট হয়ে থাকে। পাহাড়ি অঞ্চলে সিন্ধু অঞ্চলে ও পশ্চিমী অঞ্চলগুলিতে এর উৎপাদন খুব ভালো হয়।  বল্ক, আরব, মিশর, প্রভৃতি পশ্চিমী অঞ্চলে আকারে বড় খেজুর উৎপাদন হয়ে থাকে। 

    রোগ প্রতিরোধে উপকারিতা 

         যাদের শরীর দুর্বল, রোগা ও অসুস্থ তাদেরকে যদি হজম শক্তি অনুযায়ী পরিমাণ মতো খেজুর খেতে দেওয়া হয় ভালো উপকার পেয়ে থাকে। যদি নিয়মিত খেজুর খাওয়া হয় তাহলে দুই মাসের মধ্যেই শরীর সুস্থ সবল এবং স্বাস্থ্যজ্জ্বল হয়ে উঠবে। রক্তাল্পতা ও ধাতু দুর্বলতা দূর করতে এই ফল দুধের সঙ্গে খেলে খুবই উপকারী। এর মধ্যে থাকা পুষ্টিকর উপাদান ত্বকের লাবণ্যতা ফিরিয়ে আনে, মাথার চুলের গোড়া শক্ত করতে এবং চুল বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া পিত্তবিকার, চর্মরোগ ও বাত আরোগ্য করতেও খেজুর অত্যন্ত উপকারী হয়ে থাকে। এবং এটি যৌনশক্তি ও বলবীর্য বৃদ্ধি করে।  

                 তবে বেশি পরিমাণে খেলে শরীরের ক্ষতি ও হয়ে থাকে। এজন্য একবারে তিন-চারটির বেশি খেজুর খাওয়া উচিত নয়। এটি শরীরের পক্ষে গরম হয়ে থাকে। একটি খেজুর নিয়ে দু টুকরো করে কেটে নিন। ভেতরের বীজ ফেলে দিয়ে ভালোভাবে চিবিয়ে খান। তার সঙ্গে একটু করে দুধ খেতে থাকুন তা না হলে খেজুরের টুকরো খাবার পর দুধ খেয়ে গরম জল দিয়ে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে শুয়ে পড়ুন এইভাবে ৪/৫ দিন খেলে গলার সর্দি খুসখুসে কাশি থাকবে না। সকালে জল খাবারের সঙ্গে একটি খেজুর খেয়ে ঈষদ উষ্ণ দুধ খান এতেও সর্দি কাশিতে উপকার পাবেন।

        যদি সর্দি কাশিতে খুবই কষ্ট পেয়ে থাকেন তাহলে চার্জে খেজুর নিয়ে ভেতরের দানা বের করে দিন। এরপর এক কাপ দুধে কয়েকটা গোলমরিচ দিয়ে তার মধ্যে বীজহীন খেজুরের টুকরো দিয়ে গরম করুন। ভালোভাবে গরম হয়ে গেলে ওর মধ্যে অল্প ঘি দিন। এবার খেজুরের টুকরো গুলি চিবিয়ে খান সেইসঙ্গে অল্প অল্প করে দুধ খান। এতে সর্দি-কাশি সর্দিতে নাক বন্ধ হয়ে আসা উপশম হয়ে থাকে ।  

         যদি শীতকালে দুটি শুকনো খেজুর দুধের সঙ্গে খাওয়া যায় স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এই ফল আমাশয় ফুসফুস সংক্রান্ত রোগ ও যৌন রোগে খুবই উপকার করে থাকে। এছাড়া শীতকালে শোবার আগে খেজুরের সঙ্গে ঈষদষ্ণ দুধ পান করলে  স্বপ্নদোষ, শীঘ্রপতন, প্রভৃতি রোগে উপকার পাওয়া যায়।